October 24, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

প্রতীকের দেশী বিদেশী আদিবাসী

চয়ন খায়রুল হাবিব : প্রতীক জিনিসটা আমরা অনবরত ব্যবহার করি। বহু যুগের বহু কোটি মূর্ত, বিমূর্ত প্রতীক মিলিয়ে মানুষের বিশ্বায়িত-সত্তা। বিশ্বায়িত-সত্তা বলে নিজেকে ফাপরে ফেললাম না কি? বিশ্বায়িত এখানে বিশ্বজনীন বা  কূপমণ্ডূকতার বাইরের অর্থে! এই বৃহৎ সত্তার মধ্যে অপেক্ষাকৃত ছোট বিভাগকে বলা যেতে পারে জাতিক সত্তা। ধারাবাহিক বহু কোটি লোক, পরম্পরায় মিলে এক-একটা কৌমে বাধা পড়ে। কৌম-সদস্যদের চেহারার একটা বিশেষত্ব আছে, এদের মনের গড়নটাও কিছু বিশেষ ধরনের। এই বিশেষত্বের লক্ষণ অনুসারে কৌমের লোক পরস্পরকে বিশেষ আত্মীয় বলে অনুভব করে।

মার্কিন কালো নাগরিক এমেরিকাতে যেই অধিকার ভোগ করে, আফ্রিকাতে তার কিয়দংশও ভোগ করে না। অথচ আফ্রিকার কালোদের প্রতীকের ভাণ্ডার নিশ্চিত এমেরিকান কালোদের চেয়ে বেশি। প্রতীকের ভাণ্ডার থাকা এক ব্যাপার আর তার বিবর্তিত ডাইনামিসম আরেক ব্যাপার। জ্যাজ, ব্লুস, হিপ হপ, রেগে সবই এসেছে কালোদের হাত ধরে আফ্রিকার বাইরে থেকে। প্রতীক বিবর্তনের আদিবাসী ধাপগুলোতেই কি মারণযজ্ঞের সূত্রচিহ্ন লুকায় থাকে? কুর্দিদের উপর যুগে যুগে হত্যাযজ্ঞ চালানো তুর্কি, ইরাকি, ইরানিদের ইতিহাসের একেক ধাপে একেক রকম অজুহাত। জমির দখল নেয়া একটা বড় ব্যাপার দেশী, বিদেশী, আদিবাসী প্রতীকের আত্মসাতে, অবমাননায়। চিনাদের হাতে তিব্বত দখলও একটা বড় দৃষ্টান্ত। আবার তিব্বতিদের হাতে বৌদ্ধিক প্রতীকগুলোর অবস্থাও সামন্তবাদী এক জগদ্দলে পরিণত। তাহলে কি বিদেশী আগ্রাসন ছাড়া প্রতীকের বিবর্তন সম্ভব না?

কপোত-কপোতির ভিসা পাস্পোর্ট

আগ্রাসনে প্রতীকের বিনাশ ঘটে; আবার বিবর্তনও ঘটে। প্রতীক হচ্ছে প্রবাল দ্বিপের মত। কয়েক বর্গ ইঞ্চি প্রতীক তৈরি হতে লেগে যায় কোটি, কোটি বছর। রোমানি জিপসিদের কথা বারবার মনে পড়ে। এরা এনার্কিস্ট! এন্টি স্টেইট! কোনরকম লিখিত স্বরলিপি ছাড়া রোমানিরা পৃথিবীকে গিটার, ফ্ল্যামেঙ্কো দিয়েছে। প্রতীকের সুরক্ষায় যাদের নিয়োজিত থাকবার কথা তারা যখন একপেশে এবং অতি-প্রতীকবাদী হয়ে পড়ে তখনই বিপদ ঘটে অন্যান্যদের! হিটলারের স্বস্তিকা, ভ্যাটিকানের ক্রস, ইসলামের চাঁদতারা, ইহুদীবাদের ডেভিড তারকা, লাল ঝাণ্ডার কাস্তে হাতুড়ি সমস্ত প্রতীককে ব্যবহার করা হয়েছে ব্যক্তির এবং কৌমের বিনাশে! কখন প্রতীক মিথে পরিণত হয়? শান্তির প্রতীক সাদা কপোত! সেটা কি দেশী,বিদেশী, আদিবাসী, জাতিক না কি আন্তর্জাতিক?

জাতি, উপজাতি মহাভারতের আমল থেকেই ছিল চতুর্বর্ণাশ্রম শাসনের স্বার্থে! প্রিমিটিভ, এবরোজিনিস এগুলোর যোগ উপনিবেশিক আমলে! আদিবাসী বা ইন্ডিজিনিয়াস টার্মগুলো আসছে যাযকিয় আশ্রমগুলো থেকে! বিভিন্ন ধর্মের বাতাবরণে যাজকেরা ঠিক করেছিল যে তারা যা জানে তা অন্যের জানার চেয়ে ভালো! এখন কোনো প্রথার ভিতর সতীদাহ জাতীয় ঘটনা থাকলে তাকে হিনপ্রথা হিসাবে দেখানো সহজ! আর্যরা তাদের আগ্রাসনের সময় যখন মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা ধ্বংশ করেছিল তখন পরাজিতদের হীন, দস্যু, দাশ, পাখি, রাক্ষস অভিধা দিয়েছে; মন্ত্রকে বেধেছে এমনভাবে যে তা সবার পক্ষে শেখা কঠিন! ঘোষিত হীনদের ভেতর বুদ্ধিমানেরা যাতে মন্ত্র শিখে শাসনের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয় তার জন্য মন্ত্র উচ্চারণ আর মন্দিরে প্রবেশের উপর জারি করেছে নিষেধাজ্ঞা। তবে পরাজিত দ্রাবিড়দের অনেক’কেই যে আর্যরা উপরের শ্রেণিতে উঠে আসতে দিয়েছে তার প্রমাণ ব্রাহ্মণ’দের ভেতর বিভিন্ন ধাচের চেহারা, চুলের রঙের উচ্চতার বিবর্তন; ইন্দিরা, মমতা পার্থক্য!

ইশারার পাতন ও  সঙ্কেতের সাধন

মন্ত্র শিখে ঘোষিত নিচু জাতের মানুষ যাতে শাসন ক্ষমতার ভাগীদার না হতে পারে তা নিশ্চিত করতে বৈদিকদের যেরকম বর্ণাশ্রম; বাংলাদেশের NGO দের প্রায়োগিক সামাজিক কৌশলও কি সেরকম নয়? NGO মুল স্লোগান, ‘দারিদ্র বিমোচন’! অথচ ব্যক্তিমালিকি বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল তৈরিতেই এদের উদ্যমের ব্যয়, যেখানে প্রবেশাধিকার শুধুমাত্র তাদের যারা ইতিমধ্যেই শাসন কাঠামোর অংশ। ভাষা প্রথমে আরম্ভ হয় নানারকম প্রতীকের সংঘাতে। হাজার বছর আগে সেই সংঘাতের কারণ ছিল জৈব অস্তিত্ব রক্ষার প্রাথমিক হিসাব! সেই হিসাব থেকেইতো এসেছে ইশারা, ইশারা থেকে সঙ্কেত, সঙ্কেত থেকে ভাষা! প্রতীক তৈরির, নবায়নের, বিবর্তনের শক্তি আছে বলেই ভাষা গড়ে তোলা মানুষের পক্ষে সহজ হয়েছে।

জৈব অস্তিত্ব রক্ষার প্রাথমিক ইতিহাসে যেমন, তেমনি পরেও মূর্ত প্রতীকের চেয়ে বিমূর্ত প্রতীকের সংখ্যা অনেক বেশি! বিমূর্ত শব্দগুলোকে ভর করে মানুষ চলে গেছে সেখানে, যেখানে তার ইন্দ্রিয়শক্তি পৌছাতে পারে নাই! আমাদের আশপাশের প্রতীকগুলোর শিকড় জানতে হলে, আমাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ও জানা দরকার। প্রাচীন বাংলার নিষাদরা অস্ট্রিক-দ্রাবিড় আর কিরাত’রা ছিলো মংগোলয়েড! বাংলার দেশজ মুসলমানরা এবং কথিত তফসিলভুক্তরা অস্ট্রিক-দ্রাবিড়! উচ্চবর্ণের হিন্দুদের ভেতর আল্পিয় রক্তস্রোত পাওয়া যাবে। নর্ডিক আর্য রক্তস্রোত বাংলাদেশে নাই বললেই চলে! কিন্তু আবার এই নর্ডিক শাখার বৈদিক আর্যদের শাস্ত্র, সমাজ, সংস্কৃতি চতুর্বর্ণাশ্রম, জৈন এবং বৌদ্ধিক বাহনে চড়ে দুই হাজার বছরেরও বেশি রাড় বাংলার আদিবাসীদের মন-মনন, যাপন, জীবিকা নিয়ন্ত্রণ করেছে! যারা প্রতিরোধ করেছে তাদেরকে হতে হয়েছে গনহত্যার শিকার এবং বাস্তুচ্যুত!

হাটবাজারে সুর, অসুরের বিবাদ ভঞ্জন

বৈদিক আর্যরা সুরে’র এবং ইরানি আর্যরা ছিলো অসুরের পূজারী। চারণভূমির দখলের পাশাপাশি এই দুই আর্যশাখার ভিতর প্রতীক নিয়েও বিরোধ বাধে। একসময়ে উভয়ের আরধ্য ছিলো অসুর বা ‘আহোর’! পরে ইরানিরা আহুরামাজদা এবং ভারতিয় বৈদিকেরা ‘দেইবো’, ‘দেইব’ বা ‘দেব’ পূজারী হয়। এদের কাছে পরাজিতদের প্রতীকগুলো বিজেতার শাসন প্রয়োজন অনুযায়ী কখনো গৃহীত, কখনও বা নিগৃহীত হয়। ইরানি ‘আহুরামাজদা’ পূজারীদের কালক্রমে মুসলিম বিজেতারা ‘হারামজাদা’ বলা শুরু করেছিল কি? বংগোপসাগরবর্তি বিভিন্ন ভাষাভাষি আদিবাসীদের শব্দগুলোর সাথে মুল সমাজের লেনদেন চলতে থাকে কখনও জয় পরাজয়ের ঐতিহাসিক হিসাবে, কখনো বা নিছক প্রাকৃতিকভাবেই।

পাণ্ডুরাজার ঢিবি, ওয়ারী বটেশ্বওয়ার আমাদের বলে যে রাড়বাংলাতে বৈদিক এবং বৌদ্ধিক সময়ের অনেক আগে থেকেই নগর সভ্যতা ছিল। মহেঞ্জোদারো, হরপ্পার মত এসব সভ্যতারও অবসান ঘটে বৈদিকদের হাতেই! ক্রিট দ্বীপের প্রচলিত মুদ্রা পাওয়া গেছে পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে! মসলা, তুলা, তাতে বোনা কাপড়, হাতির দাঁত, তামা, আখের গুড় ছিলো প্রধান পণ্যসামগ্রী। রাড়বাংলার এখোগুড় রোম সাম্রাজ্যেও রপ্তানি হতো! গুড় তৈরির এলাকা বলেই হয়ত এর নাম হয় ‘গৌড়’! আল্পিয় কথনে বনিক’কে বলা হয় ‘হিট্টি’। প্রাচীন বাংলায়ও বনিকদের বলা হত ‘হট্টি’ বা হাটি! বর্ধমান জেলাতে এখনো ‘হাটি’ জাতি আছে। এই হিট্টি বা হট্টি কি আমাদের সেই চিরপরিচিত ‘হাটের’ মুলে আছে, যার থেকে অনেক পরে আমরা পেলাম ‘হাটবাজার’!

শিকড়ের সন্ধানে বাকড়ের ঝাড়-ফুঁক

যারা ব্যবসায়, যাপনে আগ্রাসনের সাথে খাপ খাওয়াতে পারেনি তাদের শব্দগুলোর, প্রতীকগুলোর কি হলো? আগে বলেছি, প্রাচীন বাংলার নিষাদরা অস্ট্রিক-দ্রাবিড় এবং কিরাতরা মংগোল! কোল, ভিল, মুন্ডা, সাওতাল, কোরোয়া, জুয়াং, কোরবু প্রায়-বিশুদ্ধ অস্ট্রীক এবং এরা বাংগালির সবচেয়ে ঘনিষ্ট জ্ঞাতি। মুন্ডা বা মুন্ডারি ভাষাই আদি-অস্ট্রিক-ভাষার বিবর্তিত রূপ! অস্ট্রেলিয়ার আদি-অধিবাসীদের সাথে মিল থেকে অস্ট্রিক নামের উদ্ভব! দ্রাবিড়েরা কোথাও, কোথাও ভেড্ডিড নামেও পরিচিত! মংগোলয়েড’রা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে লেপচা, ভুটিয়া, চাকমা, গারো, হাজং, মুরং, মেচ, খাসিয়া, মঘ, ত্রিপুরা, মিজো, মর্মা বিভিন্ন নামে পরিচিত। শিব-বিষ্ণু-ব্রক্ষা, মূর্তি পূজা, জন্মান্তরবাদ, অবতারবাদ, নবিবাদ, গুরুবাদ, কায়াসাধন, মন্ত্রশক্তি, যাদুবিশ্বাস, শবরোতসব, নবান্ন, পৌষপার্বণ, বৈশাখী, চড়ক, গাজন, শুভাশুভের প্রতীক চাল, খই, কলা, নারকেল, পান-সুপারি, হলুদ, দূর্বা, দই, মাছ, ঘট, আলপনা, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, শুকনা গোবরের জ্বালানি, মনসা, বাসুলী, শীতলা, ঠাকুর, জাঙ্গুলী ইত্যকার লোকায়ত দেবতা, তিথি, নক্ষত্র, লগ্ন এসেছে অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, মংগোলয়েড জনগোষ্ঠী থেকে!

শুধু বাংগালির নয়, ভারতিয় সমস্ত জনগোষ্ঠীর প্রতীকের শিকড় লুকানো আদিবাসীদের যাপিত সংস্কৃতির পরতে, পরতে! আরন্যক কোল, সাওতাল, ওরাও, রাজবংশি, গারো, হাজং, খাসিয়া, মনিপুরি, লুসাই, নাগা, মিজো, খুমি, কুকি, কোচ যেসব নিয়ম, নিতি মেনে চলে তাই ভারতিয় বিভিন্ন মূলধারাতে রূপান্তরিত হয়েছে প্রথাসিধ্ব আচারে/ তুক-তাক-দারু-টোনা, ঝাড়-ফুক, বান-উচাটন, মাদুলি,কবচ, বশিকরন সবই জনজীবনে মিশে গেছে বিভিন্ন নামে! কেউ বলে ধুপকাঠি, কেউ বলে আগরবাতি! কেউ বলে মাদুলি, কেউ বলে তাবিজ!

হাজার বছর ধরে চলে আসা নিত্যনৈমিত্তিকতায় আমরা যেসব প্রতীক অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও মংগোলিয়দের থেকে নিয়ে আত্মস্থ করেছি, তার দিকে একবার তড়িত চোখ ফেরানো যাকঃ হাতিয়ারের মধ্যে লাঙ্গল, যোয়াল, ফাল, ইষ, দা, দড়ি, মই, কোদাল, বর্শা,বাটুল, ঝুড়ি, চুপড়ি, চেঙ্গাড়ি, ডিঙ্গি, ডোঙ্গা; তৈজসের মধ্যে হাড়ি, সরা, পাতিল, ঝিনুক, ডাবা, নারকেলের মালা, মাচা, নল, পেটি, ঘটি, চাটাই, চাটি, ঝাটা, বাখারি; নেশার মধ্যে গাজা, ভাং, ধেনো মদ, ধানকাট্টি, দোচোয়ানি, চরস, সিদ্ধি; ফলমুলের মধ্যে ধান, বেগুন, ঝিঙ্গা, কলা, তাম্বুল, গুবাক, গেন্ডারি, জাম্বুরা, শিমুল, তেতুল; মাছের মধ্যে পুটি, টেংরা, শিং, গজার, কই, মাগুর, টাকি, পাঙ্গাস; ধানের মধ্যে জিজিরা, ককচি, করা, তৃতিয়া, বাদল শুকই, লেম্বরু, গেলং, মাইদল; খাবারের মধ্যে গুড়, ভাত, মাড়, খই, চিড়া, মুড়ি, চচ্চড়ি, ভর্তা, আচার…এর সবই এসেছে অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, মংগোলিয় কৌমগুলার ব্যবহার্য শব্দ থেকে! যাদের থেকে প্রতীক নিলাম সেই আদি কৌমগুলার প্রতি তথাকথিত মূলধারার আচরণ কি ছিলো? বৌদ্ধিক মতবাদ গ্রহন করতে না চাওয়াতে কোল, ভিল, মুন্ডা, কুকি, লেপচা, ভুটিয়াদের সেই ঐতিহাসিক প্রদোষকালে জঙ্গলে পালিয়ে যেতে হয়! অষ্টম শতকের ‘আর্যমঞ্জুশ্রীকল্প’ পলাতকদের ভাষাকে বলছে ‘অসুরভাষা’ বা ‘বায়ংশির বুলি’!

প্রদোষে প্রাকৃতজন

ব্রাক্ষণ্যবাদ, বর্ণাশ্রমের পীড়ন থেকে মুক্তির জন্য আদি কৌমগুলো বৌদ্ধ ও জৈনমত গ্রহন করলেও, এই দুই ধর্মের অনুশাসন নৈমিত্তিক স্বাভাবিকতার পরিপন্থী হওয়াতে উৎসাহতে ভাটা পড়তেও সময় লাগে নাই! গৌতমের বেদদ্রোহিতা এতই তীব্র ছিলো যে ও নির্বাণের সময় অনুসারীদের সংস্কৃত চর্চা করতে নিষেধ করে! বুদ্ধ অনুসারীদের পালি চর্চাকে কেন্দ্র করে ভারতের অন্যান্য আদিভাষাভাষি প্রতীকেরও বিবর্তন ঘটে! বুদ্ধ অনুসারীদের অনেকে বুদ্ধের দর্শনে স্বমত যোগ করে তাতে স্থানীয় সহজিয়া নাথপন্থী আবহ নিয়ে আসে! এদের ভেতর হাড়িফা স্বমত প্রচার করে কুমিল্লার ময়নামতিতে, গোরক্ষনাথ নেপালে। ধারনা করা হয় নেপালি গোর্খা সম্প্রদায়ের নাম গোরক্ষনাথের প্রভাবের স্মারক! বৌদ্ধিক সহজিয়া মতবাদের অনুসারী সিদ্ধাদের হাতে করে যে চর্যার সূত্রপাত তাতে আমরা বংগ, বংগাল শব্দগুলোর পাশে সে-সময়ের কৌমগুলোর আনুষাঙ্গিক প্রতীকগুলোর সন্ধান পাই! অশোকের মৃত্যুর পর শঙ্করাচার্য প্রমুখের নেতৃত্বে ব্রাক্ষণ্যবাদ ফিরে আসে ভারতে! নয়া ব্রাক্ষণ্যবাদী রাজন্যরা বুদ্ধের অনুসারীদের উপর পীড়ন, দলন, হত্যাযজ্ঞ্ শুরু করলে এদের অনেকে সাবেক বর্ণাশ্রমের প্রথায় ফিরে যায়। এরকম অসামান্য তীব্রতায় বৌদ্ধিক চৈত্য, স্তুপা, বিহার ধংস করা হয় যে আর বোঝার উপায় থাকে না বাংলাসহ ভারতের অন্যান্য জনপদে এই দর্শন সাধারন্যে গৃহীত হয়েছিল!

বৌদ্ধিক শাষক যোগিপাল, ভোগিপাল, মহিপালের সময় লেখা গানে বোঝা যায় যে এরা ‘মধ্যপন্থা’র অনুসারী! রাড়বাংলাতে বৌদ্ধিক শাষক পালদের অবসানের পর শুরু হয় কট্টর ব্রাক্ষণ্যবাদী সেন’দের শাসন! সেনবংশের বল্লাল’কে বলা যেতে পারে সে-সময়ের ইয়াহিয়া খান! ব্রাক্ষণ্যবাদীদের হাতে বুদ্ধবাদীদের নিকাশ সম্পর্কে, সংস্কৃত ‘শঙ্কর বিজয়ে’ লেখা আছেঃ ‘অসংখ্য দুষ্টমতাবলম্বি বৌদ্ধ ও জৈন রাজ্যমুখ্যদিগকে অনেক বিদ্যাপ্রসঙ্গে নির্জিত করে তাদের মাথা কুঠার দ্বারা ছিন্ন করে, অনেককে উদুখলে নিক্ষেপ করে, মুষল দ্বারা চূর্ণ করে, এইরূপ দুষ্টমত ধ্বংস আচরণ করে তিনি নির্ভয় থাকতেন।

সেনদের আচারসর্বস্বতা এবং পরধর্ম উচ্ছেদের পটভুমিতে বাংলায় তুর্কি ও পাঠানদের আগ্রাসন ঘটে। সেনদের আগে বৌদ্ধিক শাসনে লেখাপড়ার সুযোগ নিয়ে শ্রেণিভেদ, বর্ণভেদ ছিলনা। সেনদের শাসনকাল সম্পর্কে দিনেশ চন্দ্র সেন, ‘বৃহৎ বঙ্গে’ বলেছেন, ‘শুদ্রমাত্রেরই উচ্চশ্রেণির লেখাপড়ার অধিকার কাড়িয়া নেয়া হইল’! অরণ্যচারি অপরাপর কৌমগুলো সম্পর্কে সেনদের মনোভাবও সহজে অনুমেয়; সেনদের কাছে এরা ‘পাখি’ বা ‘জন্তু’! ব্রিটিশ শাসন কায়েম হবার আগ অব্দি প্রায় হাজার বছর বাংলাতে যে মুসলিম শাসন চলেছিল তার ভেতর কোন কোন শাষক নিঃসন্দেহে প্রজা নিপীড়ক ছিল! কিন্তু ঐ সময় সম্পর্কে লিখতে গিয়ে দিনেশ চন্দ্র সেন, ‘বৃহৎ বঙ্গে’ বলেছেন, ‘বাংগালা দেশে পাঠান প্রাবল্যের যুগ এক বিষয়ে বাংগালার ইতিহাসে সর্বপ্রধান যুগ। আশ্চর্যের বিষয় হিন্দু স্বাধিনতার সময় বংগদেশের সভ্যতার যে শ্রি ফুটিয়াছিল, এই পরাধিন যুগে সেই শ্রি শতগুণ বাড়িয়া গিয়াছিলো…এই পাঠানযুগে হিন্দু সমাজে সর্বপ্রথম নতুন বিক্ষোভ দুষ্ট হইল। জনসাধারণের মধ্যে শাস্ত্রগ্রন্থের অনুবাদ প্রচারিত হওয়াতে, তাহারা গরুড়পক্ষি হইয়া ব্রাক্ষনের নিকট কড়জোড়ে থাকিতে দ্বিধাবোধ করিল’! এই দ্বিধাবোধেরই প্রকাশিত বিস্তার চৈতন্যের বৈষ্ণববাদে! এই বৈষ্ণববাদে যে অবতারবাদের অবতারনা করে কৃষ্ণ, বুদ্ধকে একিভুত করা হয়েছে তাও এসেছে সেই আদি অস্ট্রিক, দ্রাবিড় এনিমিজম থেকেই!

রবীন্দ্রনাথের দোটানা

বৈষ্ণব কবি জয়দেবের ‘গিতগোবিন্দ’ দশাবতার বন্দনাতে মানুষ, কচ্ছপ, মাছ, বরাহ, বুদ্ধ, কৃষ্ণ সবাইকে ভগবান বলে সম্বোধন করছে! কচ্ছপ, বরাহ আরণ্যক এবং সমতলিয় অন্তজ আদিবাসীদের খাদ্য এবং ব্রাক্ষণের জন্য পরিহার্জ। ভারতিয় বিভিন্ন ভাষার বৃটিশ উপনিবেশিক যাত্রাকালের শৈশবে কোলকাতায় রাজধানী হবার সুবাদে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা এবং বাংলাভাষা বিকাশের সুযোগ পেয়েছে অনেক বেশি। প্রথম ভারতিয় নোবেল বিজয়ি রবীন্দ্রনাথ প্রায়ই আক্ষেপ করতেন যে বাংলা ভাষার সমস্ত ব্যাকরনের বই মুলত সংস্কৃত ব্যাকরনের বই! শব্দতত্ব, ব্যাকরন নিয়ে অনেক আলোচনায় দেশী শব্দের ব্যবহারে রবীন্দ্রনাথের উৎসাহ থাকলেও, সেই দেশী শব্দভান্ডারে আদিবাসীদের অবদান নিয়ে রবীন্দ্রনাথ তেমন সুনির্দিষ্ট আলোকপাত করে নাই। সুনিতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে উৎসর্গ করা রবীন্দ্রনাথের ‘বাংলাভাষা পরিচিতি’র এক বিপুল অংশ ব্যয় হয়েছে সংস্কৃত শব্দের ধাতুমুল খোজার পেছনে এবং তার দেশীয়করনের প্রস্তাবনায়! অথচ রবীন্দ্রনাথ ঘরের পাশের সাওতালদের কথপোকথনে আরো মনযোগী হলে দেশী শব্দের আদিবাসী শিকড় খোজার কাজে আমরা আরো এগিয়ে থাকতাম।

অনানুষ্ঠানিক শিক্ষায় দিক্ষিত রবীন্দ্রনাথের সুনিতি’দের মধ্য দিয়ে যাজকিয় সখ্যতার উচাটনে ‘শনিবারের চিঠির’ সজনিকান্তদের নিয়মিত বিষোদ্গারকেও দায়ি করা চলে। শান্তিনিকেতনে অন্ত্জ রামকিঙ্করের বিকাশ বলে দেয় রবীন্দ্রচিন্তার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। শব্দের আদিবাসী পত্তনির বিচারে পরে অবশ্য আমরা পেয়েছি নিহাররঞ্জন রায়, অতুল সুর, আহমেদ শরীফদের। অবশ্য এদের কেউ বোধ করি ‘জাতিক’, ‘আন্তর্জাতিকের’ প্রবর্তনায় ‘চন্ডালিকার’ কবির সামগ্রিক অবদান অস্বিকার করতে পারবেন না! বিদেশী প্রতীকের আত্মস্থতা এক অর্থে আদিবাসী পত্তনির বিস্তার, যদি সেই পত্তনির সঙ্কেতসূত্রগুলো আমরা নির্ণয় করে নিতে পারি। আর নির্ণয়ের পর তাদের যাদুঘরের বিষয় না করে যাপিত জীবনের অংশিদার করে নিতে পারি।

ডোরার কান্না ও ক্ষেপি সংস্কৃতি

পিকাসোর ডোরার কান্নাসহ কিউবিজমের অন্যান্য চিত্রকর্মগুলোকে কেউ দেখবে আফ্রিকার আদিবাসী, আধিভৌতিক প্রতীকের সাথে ইউরোপীয় অস্তিত্ববাচক, পাগান প্রতীকের আত্তীকৃত মিশ্রণ, বিনির্মাণ, নবায়ন, ও বিবর্তন হিসাবে, কেউ দেখবে বিকৃতি হিসাবে! এ পরিসরে পিকাসোর সামগ্রিক শিল্পকর্মের বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব না হলেও প্রতীকের বিশ্বায়নে ওর ভূমিকাকে ছুঁয়ে যাওয়া যেতে পারে। প্রতীচ্য বিশেষ করে আফ্রিকার মুখোশ, এবড়োথেবড়ো ভুডু আঙ্গিককে পাশ্চাত্যে গ্রহণযোগ্য শিল্পের আঙ্গিকে আত্মস্থ করাতে অবদান রাখা ছাড়াও আত্তীকৃত রাজনীতির শিল্পায়নে পিকাসোর পটভূমি বিশ্বের যে কোন অঞ্চলের প্রতীকের পালাবদলে দৃষ্টান্তযোগ্য হয়ে উঠতে পারে এবং হয়েছেও!

যে স্পেনে পিকাসোর জন্ম ও তারুণ্য তা ওর মধ্যবয়সে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সমাজবাদী শক্তি এবং ক্যাথলিক-মৌলবাদে নিষ্ঠ ফ্যাসিবাদের তীব্র রক্তক্ষয়ী সংঘাতে লিপ্ত; যাতে জয়ি হয় জেনারেল ফ্রাঙ্কোর নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিবাদী শক্তি! পিকাসোর ঘনিষ্ঠজন, তখনকার স্প্যানিশভাষি বিশ্বের অন্যতম কবি ও নাট্যকার গার্সিয়া লোরকাকে গ্রানাডাতে হত্যা করে ফ্যাসিবাদী খুনিরা। স্পেন থেকে সরে এসে প্যারিসে বসবাসরত পিকাসো তার শিল্পকর্মে ফরাসি ইম্প্রেশনিজম, রিয়ালিজম, ওরিয়েন্টালিজম কোনটাকে না নিয়ে নিজের ধাচে উগরে দিলো কিউবিজম, প্রতীক উপস্থাপনায় যা যোগ করলো যুগান্তকারী বাস্তবতার মাত্রা! স্যুররিয়ালিস্টেরা যতটুকু দিল, তার চেয়ে অনেক বেশি পেলো পিকাসোর কাছ থেকে! পিকাসো যাপনে এবং ওর প্রতীকগুলোর তান্ডবি মোড়বদলে সঙ্গিনীদের ভূমিকা ফণা ওচানো কোবরার মতন!

এখানে দ্রষ্টব্য যে পিকাসোর বন্ধু লোরকার মহাকাব্য নাটকের মুল মসলা হচ্ছে লোকগাথা, সে গাথাকে লোরকা ব্যবহার করেছে ব্যক্তির মানবিক মুক্তির পথে আবহমান বাধাগুলোকে চিহ্নিত করতে, লোকগাথার ভাববাদী, পুরুষতান্ত্রিক বাহনে লোরকা চড়িয়ে দিচ্ছে নারী পুরুষ বিশেষে ব্যক্তির অস্তিত্ববাচকতা! এখানেই লোরকার সাথে ফ্যাসিবাদের সংঘাত, ফ্যাসিবাদ লোকসংস্কৃতিকে নিচ্ছে তার পুরুষপ্রধান চেহারাসহ এবং সে-চেহারার খোলতাই দিচ্ছে ভাববাদের মুখোশে। পিকাসো নিজেও অনবরত আফ্রিকা, এশিয়ার লোকজ প্রতীক ব্যবহার করছে কিন্তু তা করছে ব্যক্তির উচাটনকে টেনেহিচড়ে খুলে ধরতে, তাতে ভাববাদের পরত চাপাতে নয়। লোরকার মৃত্যু সংবাদ পাবার মুহূর্তে পিকাসো দাড়ি কামাচ্ছিল।কামানো থামিয়ে আয়নাতে দেখা সাবানের আধা ফেনামাখা, আধ কামানো উদ্ভ্রান্ত, শোকতপ্ত নিজ মুখের ছবি পিকাসো একেছিল তাতক্ষনিকভাবে নিহত বন্ধুর সম্মানে!

ক্ষেপি-সংস্কৃতি ও লোক-সংস্কৃতি-সঞ্জাত পুরুষ প্রধান কৌমের প্রভাবে বিবর্তিত! বৈষ্ণবের যেমন বৈষ্ণবী, লালন আখড়ার সাধুসঙ্গের এক প্রধান অনুষংগ ‘ক্ষেপি’। লোকসংস্কৃতিকে কাল্ট পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা দক্ষিনপন্থী প্রতিক্রিয়াশীলতার ফলবান লক্ষন! যে ফলটা এতে ফলে তা ইতিহাসের বিবর্তনে বিষবৃক্ষের ফসল। ধর্ম, শ্রেণী, গোত্র, জাতীয়তা, লিঙ্গ, দৈহিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতা নির্বিশেষে ব্যক্তির অস্তিত্ববাচকতার সংগ্রাম বিষে বিষে বিষক্ষয়ের মত প্রতিক্রিয়াশীলতাকে কাউন্টার না করতে পারলে ফ্যাসিবাদী কাল্টের পোয়াবারো এবং প্রাগ্রসর-প্রতীকের পিছুহটা! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্পেন, গ্রিস, পর্তুগালসহ পুরো ল্যাটিন এমেরিকাতে সামরিক স্বৈরশাসন, পূর্ব ইউরোপে একদলীয় কমিউনিস্ট শাসন আর অন্যদিকে নেরুদা, পাস্তেরনাক, কুন্ডেরা, রাহুল সাঙ্কির্তায়নদের হাতে অস্তিত্ববাচক প্রতীকগুলোর সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ। হিটলারের এভা ব্রাউন, মুসোলিনির ক্লারা পেতাচ্চি, জেনারেল পেরনের স্ত্রী ইসাবেলা পেরন এক অর্থে ক্ষেপি। এদের প্রত্যাবর্তনের কোন উপায় এরা আর রাখেনা এবং কথিত সাধুদের গ্রাসে এদের সজ্ঞা পুরাপুরি লুপ্ত! পিকাসোর ‘ডোরার কান্না’ আক্ষরিকভাবে এই ক্ষেপিদের আর্তনাদ! পিকাসো, চৈতন্যদেব, লালন সাইকে একটি রেখচিত্রে আনলে দেখা যাবে ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সম্পর্কের বেলাতে এরা আনুষ্ঠানিকতা এবং দক্ষিনপন্থার বিরোধী! সময়ের প্রবল সংস্কারনিষ্ঠতার বিপক্ষে এদের অবস্থানও স্মর্তব্য!

চিত্রগ্রাহক ডোরা মারের সাথে পিকাসোর পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল ফরাসি কবি পল এলুয়ার। পিকাসোর বয়স তখন ৫৪, ডোরার ২৯। পরিচয়ের আগে থেকেই ডোরার নিজেকে কাটাছেড়া করবার বাতিক ছিল। এলুয়ার, পিকাসোর আরেক বন্ধু সাইকো-এনালিস্ট জাক ল্যকো, বন্ধুদের অনুরোধে দীর্ঘদিন ধরে ডোরার চিকিৎসার ভার নেয় এবং ব্যর্থ হয়। ডোরার সাথে পিকাসোর সম্পর্ক ছিল ৯ বছর। ডোরার মুখ বিভিন্ন জ্যামিতিক আদলে দোমড়ানো, মোচড়ানোর কারণ বলতে গিয়ে পিকাসো প্রতীক বিনির্মিতির কার্যকারণ নির্দেশ করেছিল, “আমার কাছে সে এমন একজন, যে কাঁদছে। বছরের পর বছর ওর প্রতিকৃতি বিভিন্ন নির্যাতনের আঙ্গিকে একেছি, তা মর্শকামিতা থেকে নয় এবং তাতে আনন্দও পাই নি! শুধুমাত্র একটা অন্তর্দৃষ্টির বশ্যতা স্বিকার করে নিয়েছি, যা আমাকে গ্রাস করেছিল। এটাই গভীরতম বাস্তবতা।”

‘গের্নিকা’ আকবার সময়পর্বে পিকাসো বিচিত্র আঙ্গিকে ডোরাকে ক্যানভাসবন্দি করে। গের্নিকা ম্যুরালে ডোরার মুখ দেখা যাবে জান্তব মুখোশের ভিড়ে প্রদীপ হাতে এক মহিলার অবয়বে! সে-সময় পিকাসো বলেছে, “বাসাবাড়ি সাজানোর জন্য পেন্টিং করা হয় না… বর্বরতা এবং অন্ধকার শক্তির বিরুদ্ধে এটা যুদ্ধের অস্ত্র!” প্রতীকের বিবর্তনের বেলায়ও কি একই কথা খাটে না?

প্রান প্রতীকের সম্প্রদান

ডঃ আহমদ শরীফ তার ‘বাঙলা, বাঙালী ও বাঙালীত্ব’ গ্রন্থে বলছেন, “লোকসংস্কৃতি মানে কি? আমাদের দরিদ্র, পশ্চাদপদ, শিক্ষার সূযোগ থেকে বঞ্ছিত, জনসাধারনের এবং হাজার বছরের অতীতের সংস্কৃতিই লোকসংস্কৃতি। সেই অজ্ঞতাকে, সেই কুসংস্কারকে মহিমান্বিত করে আজ লাভ কি?… আমাদের অজ্ঞতা ও দিনতাকে বড় করে কি লাভ?… মাটির ঘর আর বেড়ার ঘরকে বড় করে দেখিয়ে নিজেদের জন্য এয়ারকন্ডিশানের এই আয়োজনে প্রবঞ্ছনা আছে, প্রতারনা আছে! লোকসাহিত্য ধারা নষ্ট হয়ে গেল বলে বিল্ডিং থেকে এই দরদ দেখানোত গনমানুষের প্রতি ব্যঙ্গ করারই শামিল। রেডিও টেলিভিশান ইত্যাদি অনেক প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করছে এই প্রহসনে। লোকের নিঃস্বতার, দুর্ভাগ্যের, নিরক্ষরতার এবং সেইসঙ্গে লোকসংস্কৃতির অবসান চাই আমরা।” (পৃঃ ৭৯-৮০)

আহমদ শরীফ এগিয়ে ছিল তার জাতির চেয়ে কয়েক হাজার বছর! ১৯৬২ সনে পুর্ব পাকিস্তান ছাত্রলিগের নেতৃত্বে গঠিত ‘নিউক্লিয়াস’ স্বাধিন বাংলা বিপ্লবি পরিষদের সাথে  শুরু  থেকে শেষ অব্দি তার ঘনিষ্ট যোগাযোগ ছিল। ১৯৬৫ সালে শরীফ তার ‘ইতিহাসের ধারায় বাঙালী’ প্রবন্ধে পুর্ব পাকিস্তানকে ‘বাংলাদেশ’ এবং রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা… ’কে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে প্রস্তাব করেছিল।আহমদ শরীফ ঘোরতরোভাবে লোকসংস্কৃতি-সঞ্জাত জাতিয়তাবাদী রাজনীতির বিরোধী ছিল। আহমদ শরীফ ‘লোকসংস্কৃতি নির্ভর জাতীয়তাবাদ’ বলে যে প্রবণতার বিরোধিতা করেছে, যে লোকসংস্কৃতিকে ‘অজ্ঞ… কুসংস্কারাচ্ছন্ন’ বলেছে, তা যে ঢালাও মন্তব্য নয় সেটা তার বইপত্র পড়লে বোঝা যায়। লোকজ প্রতীকের সময়োপযোগী রূপান্তরের ইতিবাচকতা এবং আপাত পরাজিতের লুপ্ত নান্দনিকতাকে ধারণ করবার ক্ষমতা যে লোকসংস্কৃতিতে আছে তার মর্ম ও সম্যক বোঝাতে পেরেছে। পার্সি ও ইসলামি সাহিত্যের গভীরে গেলে আমরা পাব প্রাক ইসলামি ইমরুল কায়েস, ফেরদৌসির লালিত ডিস্কোর্স যা সামনে নিয়ে আসলে ফতোয়া আরোপ করা হয় রুশদির ওপর! ভারতিয় সাহিত্যের নিহিতার্থে প্রবেশ করলে আমরা পাব প্রাক বৈদিক, বৈদিকের সাথে বুদ্ধ, অতীষ দীপঙ্কর, জীমুত বাহনদের ডিস্কোর্স যা সামনে নিয়ে আসলে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয় রাহুল সাঙ্কির্তায়নকে।

বাংলাদেশে লোকসংস্কৃতির নামে ঐতিহাসিকভাবে খৃস্টান মৌলবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া NGO গুলা, লালন নিয়ে লেখালেখির তোড়ের সাথে জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের যেসব কথিত অনুসারীরা জড়িত তারা আহমদ শরীফের নাম একেবারেই উল্লেখ করে না। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এদের উথ্যান ৯০ দশকে। অবশ্য এদের বীজ আরোপ করা হয়েছিল ৭০, ৮০’র সামরিক শাসনের ছত্রছায়ায়, আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারির সময়, পাকিস্তানি সামরিক গুপ্তচর সংস্থার ব্যবস্থাপনায়। এদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে হাজার, হাজার কোটি টাকা। ৩ টা ব্যাপারে এদের উৎসাহ: মাদ্রাসা, মার্কসবাদ এবং লোকসংস্কৃতি। খেয়াল করা দরকার, প্রয়াত জাতিয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক “the crisis of rising expectations” after radical changes in society (such as the independence of Bangladesh)” প্রবর্তনার কথা বলে যেখানে ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরদের দৃষ্টান্ত-পুরুষ হিসাবে তুলে ধরছে; আহমেদ শরীফ বাংলা ভাষা, বাঙ্গালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কথা বলতে যেখানে অপরাপর আদিবাসী-নৃগোষ্ঠীর প্রতীকগুলোর বর্ণনা করছে; তখন তত্বিয় ‘rising expectation’ এবং নৃতাত্ত্বিক-বিবর্তনের ব্যবহারিক নান্দনিক-এম্পাওয়ারমেন্ট হিসাবে প্রতীকের পরোক্ষতা, বিমূর্ততার সীমানা ভেঙ্গে পড়বার কথা যাপনের প্রত্যক্ষ, খোলামেলা পরিক্রমায়। কিন্তু কেন ভাংগে নাই?

‘ঢাকা ক্লাব’ তাদের সমস্ত প্রতিপত্তি নিয়েও গনপ্রতিরোধের মুখে রমনা পার্কে তাদের সাবেক বৈধ মালিকানা প্রয়োগ করতে পারে নাই। কিন্তু লোকসংস্কৃতিওয়ালারা সেখানে লালনের আখড়া আখ্যা দিয়ে স্থাপনা তৈরি করে ফেলেছে। বাংলাদেশে ভুমিদস্যুতার প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ আয়োজনে নিয়োজিত লোকসংস্কৃতির কান্ডারিরা; আজকে যেখানে লালনের আখড়া, কাল সেখানে আইস্ক্রিমের কারখানা, পরশু বহুতল রিয়েল স্টেট, বাহ! সতিদাহ আর বাংলাতে নাই, তালাক নিয়েও লেখালেখি করা যায়, কিন্তু ক্ষেপি-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কথা বল্লে শুনতে হবে ‘পাতি-বুর্জোয়া’ গালাগাল! আর যখন ‘পাতি-বুর্জোয়া’ আখ্যা দেয়া যায় না, তখন আহমদ শরীফদের বলা হয় ‘মুর্তাদ’! কারা বলে? আর কারাই বা ইন্ধন যোগায়?

দেখা যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষক বলিউডের বানানো ‘স্লাম ডগ মিলিয়নিয়ার্স’, ‘সিটি অব জয়ের’ সমালোচনা করতে গিয়ে ‘আধিপত্যবাদ’ শব্দটা ব্যবহার করে নিজেদের বিড়ম্বনা ঢাকে, তারাই লোকসংস্কৃতিকে জাতে তোলার আন্দোলনের পুরোধা! এই শিক্ষকেরাই আত্মপরিচয়ের সঙ্কট আরোপ করে। জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকারের পর বাংলাদেশে নারীর, ব্যক্তির এবং সংখ্যালঘু কৌমের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারছে না এই লোকসংস্কৃতিওয়ালাদের কারণে। থিয়েটার মঞ্চ, মিডিয়াতে এদেরই প্রতাপ। যা গুরুত্বপুর্ন নয় দঙ্গল বেধে এরা তাকে গুরুত্বপুর্ন করে তুলে। যে শামসুর রাহমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতীকগুলোকে করে তুলেছে শাস্বত সেই শামসুর রাহমানকে গাল পাড়ে ইহুদি তোষনকারি বলে! যখন তথ্যের বিকৃতি ধরা পড়ে যায় তখন গঠন করে ছদ্ম বাউল সুরক্ষা কেন্দ্র! আমরা বুঝে না বুঝে সেখানে যাত্রা, জারি, পিঠা, তালপাতার পাখা নিয়ে আগড়ম, বাগড়ম করতে থাকি! এই আগড়ম, বাগড়ম দেখায়ে টাকা চাওয়া হয় এখানে, সেখানে এবং টাকা আসেও! একটা পরিক্ষিত এবং ফলদায়ক মডেল। কিন্তু ৭২-এর সংবিধানের মত অনেক সামাজিক প্রতীকের অন্তর্ঘাত ও গুমখুনের ময়নাতন্দন্তে এই মডেলটার প্রতি প্রবলভাবে অঙ্গুলি নির্দেশ করা যেতে পারে। স্মরন করা যেতে পারে, আহমদ শরীফের অসিয়তনামা, ‘চক্ষু শ্রেষ্ঠ প্রত্যংগ, আর রক্ত হচ্ছে প্রান প্রতীক। কাজেই গোটা অংগ কবরের কিটের খাদ্য হওয়ার চেয়ে মানুষের কাজে লাগাইতো বাঞ্ছনিয়’।

প্রতীকের কিম্ভুত রিপ্রেসেন্টেশানবাজগন

লালনের কথিত জীবন ভিত্তিক গৌতম ঘোষের ‘মনের মানুষ’ আমি দেখেছিলাম ঢাকাতে বড় পর্দায়। যে ‘কারীগরী নৈপূণ্যের’ কথা মাহবুব বলেছে, তা আমি খারিজ করে দেব। কস্টিউম, মেকআপকে যদি আমরা চলচ্চিত্রের একটা বড় কারিগরি দিক ধরি, তাহলে একটা পিরিয়ড-ছবিতে লালন, শিরাজ সাইর গায়ে মাড়ভাঙ্গা ইস্তারির ভাজওয়ালা ফতুয়া, নিচুমানের পরচুলা কারিগরি নৈপুন্যের স্বাক্ষর হতে পারেনা। ক্যামেরার কাজও ভিউকার্ড ফটোগ্রাফি! চলচ্চিত্র শিল্পের কুশল-নৈপূণ্যের একটা শাখাতেও ‘মনের মানুষ’, সমকালীন চলচ্চিত্রের ধ্রুপদী নির্মাণগুলোর সাথে তুলনীয় নয়; যদিনা টেনেহিচড়ে ‘রিপ্রেসেন্টেশান’ জাতিয় একাডেমিক টার্মিনোলজি এই তুল্যমূল্যে আরোপ না করা হয়!

সারা দুনিয়াতে ডানের, বামের যেসব একাডেমিক নিজেদের র্যা ডিকাল হিশেবে দেখাতে চায়, তাদের একটা আপ্ত মন্ত্র হচ্ছে, “politics of representation”। এরা বলিউড, হলিউডে তৈরি ‘স্লাম ডগ ডুয়েলার্স’, ‘সিটি অব জয়’ কে নামাবে, ‘মনের মানুষকে’ ওঠাবে এবং এই ওঠানামার অজুহাতে জনগণের অজুহাত পাড়বে। কারিগরি কুশলতা যে আজকের দুনিয়াতে সস্তার ছোট গেজেটেও অর্জন করা যায় তা আমরা ডেনমার্কের ‘ডগমে’ প্রবর্তনাতে দেখেছি। সত্তরের দশকে তৈরি অদ্বৈত বর্মণের গল্প ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ অবলম্বনে সত্তর দশকে ঋত্বিক ছবি বানালেন। সীমিত বাজেটেও সে ছবির কারিগরী দিক অনবদ্য, ক্যামেরা কোথায় ধরলে অভিনেতা, অভিনেত্রীদের চোখ দেখা যাবে, অভিব্যক্তি দেখা যাবে তার দিকে ঋত্বিকের পুরো মনোযোগ! অথচ আবু ইসহাকের গল্প ‘সূর্য দিঘল বাড়ি’ নিয়ে আশির দশকে বানানো শেখ নিয়ামত আলির ছবি দেখতে দর্শকের চোখ কচলাতে হবে, আলোর ব্যবহারে, ক্যামেরার পজিশনিংএ আনাড়িপনার জন্য! অথচ ‘সূর্য দিঘল বাড়ি’ ও ‘তিতাস একটি নদীর নামের’ মত সরকারি অনুদানে তৈরি। প্রতীকের genre বদলের সময় উপস্থাপনে যদি তার মাত্রিকতা কমে যায় তা “politics of representation” দিয়ে ঢাকা যায় না। ২০১৫ তে কান চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ ছবির পুরস্কার পেল প্যারিসে বসবাসরত শ্রীলঙ্কার এক অভিবাসী দম্পতির জীবন ঘেরা কাহিনী ‘ধিপান’! ছবির পরিচালক অভিবাসী সংগ্রাম এবং শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধে হুমকিতে পড়া সামাজিক প্রতীকগুলো তুলে ধরবার পাশাপাশি পুরোপুরি নিষ্ঠ থেকেছে কারিগরি নৈপুণ্যের দিকে। গল্পের যে সময়খন্ডগত প্রতীক তার মাত্রা স্পেশাল এফেক্ট দিয়েও যেরকম হয় না, সেরকম স্লোগানের মত “politics of representation” কপচালেও তা হয় না।

‘পলিটিক্স  অব রিপ্রেসেন্টেশান’টা কি’? NGO আর প্রাইভেট বা পাব্লিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন, কোন লোকজন কেন বেশি, বেশি করে এই টার্ম ব্যবহার করছে? আমরা যদি একটা লম্বা দাগের বিভিন্ন বিন্দুতে ফতোয়ায় নিহত হেনার লাশ, সিমান্তবর্তী তারকাটার ব্যাড়ায় ঝুলন্ত ফালানির লাশে এবং রোহিংগাদের দিকে তাকাই তাহলে দেখব যে যারা “Politics of representation” বলে জপছে, তাদের  লক্ষ্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক একটা সন্ত্রস্ত পর্যায়ে রাখা এবং এই সন্ত্রস্ততা থেকে যতরকমে পারা যায় সাংস্কৃতিক, রাজনিতিক সুবিধা উসুল করা। লক্ষ্যনীয় যে বাংলাদেশের বাংলা একাডেমিতে আরবি এই, সেইর অনুবাদে এবং লোক সংস্কৃতির বিকাশে যে পরিমান তহবিল তার তুলনায় বিশ্ব সাহিত্যের অপরাপর ভাষাতে অনুবাদের তহবিল অত্যন্ত অপ্রতুল। খামাখা ‘স্লাম ডগ…’ ‘সিটি অব জয়’ নিয়ে টানাটানি!

‘politics of representation’ বলনেওয়ালারা কবিতার আলোচনায়, ফিল্মের আলোচনায় যেভাবে ‘রিপ্রেশেন্টেশান’, ‘জাতিয় বুর্জোয়া’, ‘মুক্তিযুদ্ধের আধিপত্যবাদি ব্যাখ্যা’ এসব শব্দবন্ধনি নিয়ে আসে তা এদের নান্দনিক সমঝদারিত্বকে করে তোলে শর্তাধিন, খন্ডিত এবং পশ্চাদপদ রাজনৈতিক শিবিরের স্বার্থবুদ্ধিজাত। লোকসংস্কৃতির কেনাবেচাকারি রিপ্রেশেন্টেশানবাজেরা সর্বার্থে পুরুষ; কিন্তু লালন, পিকাসো, চৈতন্য নয়।

প্রতীকের রাস্ট্রভাষা বনাম প্রতীকের রাস্ট্রধর্ম

আমরা দেখতে পাই রাজনৈতিক পালাবদলের সাথে ঢাকার বুকে দাতব্য হাসপাতাল হলি ফ্যামিলির নাম রেড ক্রস থেকে রেড ক্রিসেন্টে বদলে যেতে; কিন্তু পশ্চিমী রেড ক্রসের ক্রুশ বা মধ্যপ্রাচ্যের রেড ক্রিসেন্টের চাঁদ-তারা কোনটাই বাঙ্গালির সংগ্রামসঞ্জাত নয়!

রাষ্ট্রধর্মটা কি জিনিস? রাষ্ট্রভাষাটাই বা কি জিনিস? ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রেও একক ভাষার জায়গাতে অন্যান্য বহু ভাষার স্বিকৃতি থাকতে পারে। তফসিলি আকারে নয়, প্রধান প্রায়োগিক ভাষা হিসাবেই। বাংলার সাথে অহমিয়া ভাষার তেমন দুরত্ব নাই। কিন্তু বাংলাভাষি অভিবাসীদের সাথে অহমিয়াদের দা-কুমড়া সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। কারন এই অভিবাসীদের অনেকেই হাজার বছরের বিদেশী বৈদিক সংস্কার এবং গত কয়েকশ বছরের ইসলামি সংস্কারের প্রতি যতটা অনুগত ঠিক ততটাই অবজ্ঞা দেখিয়েছে বাংলা ভাষার মুল সূত্রে বৈদিকদেরও আগের যে দেশী-কোল, মুন্ডা, ওরাও সাওতাল, গারো, কুকি, চাকমা, রাজবংশী, ভোটচিনা পাগান ভাষাগুলা তাদের প্রতি।

রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করেছে যে বাজারে যা যা বাংলা অভিধান, সেগুলা আসলে সংস্কৃত অভিধান। দেশী সাংখ্য, যোগ চর্চাকারি সিদ্ধাদের লেখা চর্যাগুলা যেমন হরপ্রসাদ’দের হাতে সংস্কৃতায়ন হয় তেমনি অনেক পরে দেশী পুথির ভাষার ঘটে ইসলামি করনঃ

“দিলসে বৈঠে রাম-রহিম দিলসে মালিক-সাই
দিলসে বৃন্দাবন মোকাম মঞ্জিল স্থান ভেস্ত পাই”

রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপের পাশাপাশি কোন শব্দের ঈকার নিজে বাদ দিয়েছে। কিন্তু সুনিতিকুমারেরা আবার ঈকার বসায়ে দিলে তা মেনে নিয়েছে। একই ব্যাপার আহমেদ শর(ঈ)ফেও! বিদেশী প্রতীক মাত্রেই বাংগালির কাছে বিশিষ্ট এবং সে বিশিষ্টতার সিলগালা হচ্ছে ঈকার, ঊকার, চন্দ্রবিন্দু। বিদেশী প্রতীককে বিশিষ্ট করতে গিয়ে বাংগালি নিজের কাছে হয়ে গেছে মামুলি! আর পরিচয় বলতে বুঝেছে জমক এবং চমক।
বাংলার মৃগয়ানির্ভর ও মাতৃপ্রধান সমাজে বৈদিকদের বহু আগে দেবি বলে গণ্য হয়েছিল তারা, শাকম্ভরী(দুর্গা), বাসুলী, মনসা যাদের সূত্র ধরে আসে বনবিবি, ওলাবিবিরা। এই আদিধর্মের প্রাণ ভোমরা আমাদের চারপাশে ছড়ায়ে ছিটায়ে থাকলেও বৌদ্ধ, ব্রাক্ষন্য ও ইসলামি প্রভাবে অবিলুপ্ত। মানে, আছে কিন্তু আছে ছোটলোকের আচার হিসাবে। বাংগালির লাঙ্গলের ফাল আগ্রাসি বৈদিকেরা গ্রহণ করলে তার প্রতীকায়ন ঘটে রামের স(ঈ)তাকে গ্রহণ হিসাবে।

‘হাজার বছর সংস্কৃতায়নের পর এই সেদিন অর্থাৎ ১৯৩০ অব্দিও (বাঙলাদেশের) কোন মাদ্রাসায় বাংলা হরফ চালু ছিলনা। মাদ্রাসা শিক্ষিতদের জন্য চিটাগাঙ্গে আরবি হরফে বাঙলা বইয়ের প্রতিলিপি তৈরি করা হত।’

উপরের উদ্ধৃতি ধার করা আহমেদ শ(রী)ফ থেকে যিনি প্রামাণ্যভাবে দেখায়েছে বাংলা ভাষাভাষি কিরাত, নিষাদেরা ১৯৭১ এর আগে অব্দি হাজার, হাজার বছর কিভাবে নিগৃহীত হয়েছে; আর যখন যতটুকুও বা গৃহীত হয়েছে তার প্রতিদানে তাকে কতটুকু শ্রমদাসে পরিনত করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে উপরের উদ্ধৃতিতে আহমদ শরীফ ‘আরবি’তে আরো অনেকের মত ঈকার বসায়ে দেন নাই। এর প্রত্যুত্তরে আমরা ১৯৩০ দশকের ইংরেজ যাজকিয় তত্বাবধানে তৈরি কোলকাতার বাংলা অভিধান অক্ষরে অক্ষরে অনুসরন করব কি না সে প্রশ্ন তোলার সময় অনেক আগেই এসেছে।

আহমদ শরীফের মত করে ‘বাঙলা’ লিখতে গেলে ইউনিকোডে অনেক কসরতের প্রয়োজন! উনি  ‘লিখতেন,“বাঙলা’, ‘বাঙালী’,”। বাংলা একাডেমি লিখছে ‘বাংলা’ ‘বাঙালি’। বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি ‘বাঙালি’কে ঈকার মুক্ত করলেও দুই বাংলার একাডেমি এখনো ঈ, ঊ, ণ, চাদবিন্দুসহ ভ্রান্তিবিলাসী জায়গাগুলাতে সার্বজনীন জায়গাতে আসতে পারে নাই, যার খেসারত দিতে হচ্ছে প্রজন্মান্তরে দুই বাংলার শিশুদের!
প্রতীকের বাহন যে অক্ষর, অক্ষরের বিশ্বায়িত বাহন যে ইউনিকোড তা ঠেকাতে বাংলা ফন্টের আড়তদারেরা হাইকোর্ট যাবেন, কিন্তু হাইকোর্ট কবে যে বাংগালি-বাউলের কাছে আসবেঃ
‘সুন্নত দিলে হয় মুসলমান
নারি(ঈ!) লোকের কি হয় বিধান
বামন(ণ!) চিনি পৈতার প্রমান
বামনি(ণী) চিনি কি ধরে’

প্রভাতফেরিটা আসলে মনের ব্যাপার। রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক জবরদস্তির সাথে ভাষাপ্রতীকের ডাইনামিজম সঙ্গতি রক্ষা করলে বাংলাসহ আরো অনেক ভাষাই হারায়ে যেত। এখন দরকার বৈদিকতা, বৌদ্ধিকতা এবং ইসলামিকরনের ভিতরে গুমখুন হওয়া আদিধর্ম, আদিবাসীদের প্রতীকগুলার আরো নিবিড় প্রায়োগিক সুরতহালঃ নানা বানান গাভি(ঈ)রে ভাই একই বরন(ণ) দুধ!

দেহছন্দ দেহতত্ব দেহপ্রতীক

“চুমুপাগলা রবীন্দ্রনাথ” আমার ব্যক্তিগত রবীন্দ্রপাঠের নোটবই’র নাম। সেটার খুচরা এন্ট্রিগুলোর শব্দসংখ্যাতত্ব উল্টায়েপাল্টায় দেখতে গিয়ে পেলাম রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন কিসিমের লেখায় ‘চুম্বন’ এর উল্লেখ শতেকের উপরঃ মানুষের মুর্ত চুমু হিসাবেই। সুইনবার্ন, শেলি, বার্নস, ক্রিস্টিনা রোসেটি যে যেভাবে চুমাচুমি নিয়ে লিখেছে রবীন্দ্রনাথ হামলে তা অনুবাদ করেছে; গ্যাটের চুমু-সমাচার নিয়ে লিখতে গিয়ে কবিগুরু প্রকারান্তরে নিজের চুমাসক্তির কথাই লিখেছে!… ‘সংগম’ শব্দটা রবীচর্চার সমগ্র জীবনে হাতে গোনা ৭ বার, তাও বিমূর্তভাবে যার সাথে মানুষের দেহক্রিয়ার কোন সম্পর্ক নাই। ‘কাম’ শব্দটা অবশ্য ২২ বার এবং মানুষের কামকলাছলা’র সাথে তা সম্পর্কযুক্ত কিন্তু তা এসেছে সংস্কৃত উসিলায়। ‘মৈথুন’ শব্দটা রবীন্দ্র-অভিধানে একবারে নাই, তবে ‘মিথুন’ আছে ২ বার। এর কারণ কি? ইউরোপের রেনেসা থেকে শিল্প বিপ্লবে সাহিত্য, শিল্প, কারুকলা পাশাপাশি অচলায়তন ভেঙ্গে বেরোতে চেয়েছে। বাংলার কথিত রেনেসার সময় সাহিত্য যখন অর্গল ভাংছে তখন চিত্রকলা বলতে পূজার পটের ছবি, ভাস্কর্য বলতে প্রতিমা। সাহিত্য সমাজকে ধারণ করলেও সমাজপতিদের আরোপিত বৈষম্যমূলক শিক্ষা সমাজকে সাহিত্য থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।

যে-ভৌগলিক এলাকাতে খ্রিস্টের জন্মের কয়েক হাজার বছর আগে মহেঞ্জোদারোতে পাওয়া গেছে সুঠাম, প্রত্যয়পূর্ণ, উচ্ছ্বল কিশোরীর জড়তাহীন নগ্ন ভাস্কর্য; যে-ভৌগলিক এলাকার উয়ারি বটেশ্বরে প্রমাণ মিলছে হাজার বছর আগের বিশ্ববাণিজ্যের; সে-ভৌগলিক এলাকাতে দেহতত্বের আলোচনা, সঙ্গীত থাকলেও; সেখানে লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের জন্ম হলেও  দেহছন্দ, দেহপ্রতীক হয়ে গেছে প্রবলভাবে জড়তাযুক্ত। ছৌ নাচ, মণিপুরি নাচ আজকের সমাজে মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন আদিবাসীদের নাচ। পতিতা, বেশ্যা শব্দের জায়গাতে এসেছে যৌনকর্মী ধরনের শব্দ; কিন্তু তাতে তাদের নিগ্রহ, উচ্ছেদ এতটুকু কমে নাই। পেশার নাম যত বলিহারি করা হোক না কেন, উদ্বাস্তু উচ্ছন্ন প্রতীকধারীর যে-বীতরাগ সমাজের প্রতি তাতে অপরাপর পেশার, অপরাপর প্রতীকেরও অবমূল্যায়ন হয়। উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে যৌনকর্মীরা বিচ্ছিন্নভাবে যেসব প্রতিনিধিত্বমূলক সংগঠন তৈরি করেছে, তাদের সভা সমিতিতে অনেক সময়ে চলচ্চিত্র, টেলিভিশন অভিনেত্রীদের প্রতি কটাক্ষ করা হচ্ছে এরকম বলে যে, ওরাওতো শরীর বেচে অভিনয় করছে, ওদের মর্যাদা দেয়া হলে আমাদের কেন দেয়া হবে না। দেহের বা শরীরের প্রাথমিক চাহিদাগুলোর যোগানে এতরকম বৈষম্য চাপানো যে তা পার হয়ে শিল্পের ও মননের মূল্যায়ন হয়ে উঠছে কঠিন থেকে কঠিনতর।

রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্ম, জীবনানন্দের মনস্তত্ব, নজরুলের আনুষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধাচরণ, জসিমুদ্দিনের গ্রাম তন্ময়তা ইত্যাকার অনুষঙ্গ মিলিয়ে পরবর্তী কবির কাছে দেহছন্দে প্রতীকভেদি হবার অনেক রকম অস্ত্র! এখানে শামসুর রাহমান নান্দনিকতার দায় আদায় করে নৈমিত্তিক জার্নালের মত তার বিবৃতিধর্মী লেখাতে যে-নারীদের আনে তারা মা, খালা, ফুফু, নানী, দাদি, প্রেমিকা, পরকীয়া প্রেমিকা। অপরাপর সামাজিক অনুষঙ্গের সাথে  সরাসরি মুখোমুখি হলেও  ভিতরগোজা স্বভাবের প্রতি আন্তরিক থেকে নারীদেহ, নারীমন দুজায়গাকে শামসুর  দেখে পরোক্ষ প্রতীক দিয়ে। শামসুরের সহযাত্রী শহীদ কাদরীও এ-জায়গাতে একই প্রবণতার অনুশিলক। সমসাময়িক আল মাহমুদ এখানে ব্যতিক্রম এবং এই ব্যতিক্রম নারীর পরিচয়গত মাত্রাকে বিস্তৃত না করে আরো সঙ্কুচিত করে ফেলে, সনাতনী স্ট্যাটাসকো-কে করে তোলে দৃঢ়তর। “জঘন্য, নগ্নযোনি গহরফলক, উষ্ণ কালসাপ, নরম গুল্মের কৃষ্ণ সানুদেশ, ত্রিকোণ কর্দম, ত্রিকোণ মৃন্ময়ী, মুত্রভেজা যোনীর দেয়াল…” লিখতে, লিখতে যখন বেরিয়ে আসে, “তারপর তুলতে চাও কামের প্রসঙ্গ যদি নারী/খেতের আড়ালে এসে নগ্ন করো যৌবন জরদ (সনেট , সোনালী কাবিন), তখন স্পষ্ট হয়ে যায় বাংলাদেশে মাহমুদের জনপ্রিয়তার মন্ত্রগুপ্তি কোথায়! কবিতার সমঝদার এবং আদিরসে বুদ ধর্ষকের কোন পার্থক্য থাকে না এখানে! আর মনে থাকেনা যে এখানের কবিতা পরম্পরায় আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম কৃষ্ণকলি, বনলতা সেন, মোমেরও পুতুলের মত গান এবং সোজন বাদিয়ার ঘাটের মত কাব্যগাথার! যে পরম্পরার পর দেহসৌষ্ঠবের সাথে নারীর স্পর্শকাতরতা, মনন ও মেধার মাত্রাও কবিতার প্রতীকে বিস্তৃত হবার কথা।

ওপার বাংলাতে আমরা এখানে পাচ্ছি মল্লিকা সেন গুপ্তকে; এপার বাংলা থেকে নারীর কামনা, বাসনা ও সামাজিক বৈশম্য নিজের জায়গা থেকে লেখার জন্য আমরা উচ্ছেদ করছি তসলিমা নাসরিনকে। হুমায়ুন আজাদ যখন অন্যান্য প্রবচনের প্রাগ্রসর লক্ষ্যভেদের পাশাপাশি ‘পাক সার জমিন’ লেখবার জন্য পাশবিকতার শিকার হয়, তখন আমরা বুঝি যে ভিন্নমত, ভিন্ন প্রতীক সহনশীলতার সীমা ভেঙ্গে যাচ্ছে চড়াদাগে। আবার হুমায়ুন যখন তার প্রবচনে লেখে, ‘আগে কাননবালারা আসতো পতিতালয় থেকে, এখন আসে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে’। তখন আমরা বুঝি যে লিঙ্গ সংশ্লিষ্ট প্রতীকের বাস্তুচ্যুতি ঘটছে অন্তরঙ্গে এবং বহিরঙ্গে দুদিক থেকে। কাননবালা, পতিতালয়, বিশ্ববিদ্যালয়  ছাত্রীদের একদাগে এনে যে অভিনয় শিল্পের মননশীলতার দিকটি গৌন করবার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীদের অবজ্ঞা করা হয়েছে তা নিয়ে সৈয়দ শামসুল হকের সমালোচনা  দ্রষ্টব্য।

দেহছন্দ, দেহপ্রতীকতো কেবল নরনারীর প্রজনন এবং যৌনতা কেন্দ্র করে হবার কথা নয়। নদীমাতৃক দেশে সাতার, মাছ ধরা, জেলে জীবন ইত্যাদি ঘিরে যে প্রতীক তাদের অবস্থা নদীর স্বাস্থ্য এবং নৌকার পালের মতই জীর্ণ। প্রেম উপযোগী নান্দনিক প্রতীকগুলো বিস্তৃত হয় নাই উভকামী, সমকামী, নিস্কামী, নালিংগ বা হিজড়াদের প্রতি! অথচ যে ফার্সি ভাষার বহু প্রতীক বাংলা ভাষা, হিন্দি ভাষা ধার করেছে তার প্রেমজ প্রতীকের পত্তনিতে ছড়িয়ে আছে সাকি বা কিশোরের দেহছন্দের প্রতি শত শত মুগ্ধ চরণ! প্রতীকের নান্দনিক সঙ্কোচনতো সামাজিক অসুস্থতার প্রকট লক্ষণ! দৈহিক, মানসিক প্রতিবন্ধীদেরও প্রেমজ-প্রতীক থেকে দূরে ঠেলে দেয়া হয়েছে। প্রেমজ-প্রতীক এহেন একপেশে পাশবিকতায় পর্যবসিত হলে তা যে শিশুদের প্রতি আদর, সোহাগেও জড়তা এনে দেয় তা বলাই বাহুল্য! কাছাকাছি চিনে নান্দনিকতার নামে হাজার বছর ধরে মেয়েদের শিশুকালে পায়ের গোড়ালি ভেঙ্গে বিশেষ লোহার জুতা পরিয়ে দেয়া হত; বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে শোক প্রকাশের জন্য খালি পায়ে মিছিল করা হয়। এ নিয়ে আমার কবিতা সিরিজ ছিলো, ‘পা ফেটিশ…’! আমার শত বছর আগে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দেহছন্দের, দেহপ্রতীকের জড়তার দিকে আঙ্গুল উচায়ে বলেছিল:

কি কাজ সুগন্ধ ঢালি পারিজাত-বাসে?
প্রকৃত কবিতা রূপী কবিতার বলে,–
চীন-নারী-সম পদ কেন লৌহ ফাঁসে?

প্রতীক মুক্ত হোক প্রতীকের বন্ধ থেকে, প্রতীক যুক্ত হোক সবার সঙ্গে এ-কামনায় ইতি টানি এ-যাত্রায়।

তথ্যসূত্র:

বাংলা
১)বাংগালির ইতিহাস, আদি পর্ব: ডঃ নিহাররঞ্জন রায়
২)বৃহতবংগ: দিনেশচন্দ্র সেন
৩)গোর্খ বিজয়: ডঃ পঞ্চানন মন্ডল সম্পাদিত
৪)ভারতবর্ষিয় উপাসক সম্প্রদায়: অক্ষয়কুমার দত্ত
৫)অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের সাথে বিভিন্নজনের প্রামান্য কথপোকথন
৬)বাংলা, বাংগালী ও বাংগালীত্ব: আহমদ শরিফ
৭)প্রাচিন পুথির বিবরন: আব্দুল করিম
৮)বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস: আশুতোষ ভট্টাচার্য
৯) মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, জসিমুদ্দিন রচনাবলী
১০) শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, হুমায়ুন আজাদ, তসলিমা নাসরিন, মল্লিকা সেন-গুপ্তের রচনা

ইংরেজি
1)History Of Bengal: Dhaka University
2)OED: Oxford English Dictioanary
3)Encyclopedia Brittanica
4)Historical Fragments Of Mughal Empire: Robert Orme
5)Picasso’s Weeping Woman: The Life and Art of Dora Maar: Mary Ann Caws 6)Wikipidia

লেখার সূত্র : নিউজ বাংলাদেশ ডটকম। (https://choyonsdhuturafm.blogspot.fr/2012/05/blog-post.html)