January 29, 2022

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

৬ ‘রাজাকারের’ বিচার শুরুর সিদ্ধান্ত রোববার

আদালত প্রতিবেদক : মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামালপুরের আট ‘রাজাকারের’ মধ্যে ছয় জনকে গ্রেফতারের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালে প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ।

পুলিশের (আইজিপি) পক্ষ থেকে দেওয়া ওই প্রতিবেদনের ওপর আদেশের জন্য আগামী ১০ মে রোববার দিন ধার্য করেছেন আদালত। একইসঙ্গে ওই ছয় রাজাকারের অনুপস্থিতিতে বিচার কার্যক্রম শুরু করা হবে কিনা তার ওপরও ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত দিবেন রোববার।

বুধবার  ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুর হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তজার্তিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই আদেশ দেন।

এর আগে গত ২৯ এপ্রিল আট রাজাকারের মধ্যে গ্রেফতার দুই জন ব্যতীত বাকি ছয় জনের গ্রেফতারের বিষয়ে কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে তার অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য পুলিশ প্রধানকে নির্দেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন রাজাকারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

জামালপুরে আলবদর বাহিনীর উদ্যোক্তা আশরাফ হোসাইনসহ জেলার আটজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গত ১৯ এপ্রিল ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে প্রসিকিউশন।

এরপর ২১ এপ্রিল শুনানি করেন প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ও তাপস কান্তি বল। ২৯ এপ্রিল তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয় আদালত ।

এ মামলার আট  আসামি  হচ্ছেন আশরাফ হোসেন (৬৪), অধ্যাপক শরীফ আহম্মেদ ওরফে শরীফ হোসেন (৭১), মো. আবদুল মান্নান (৬৬), মো. আবদুল বারী (৬২), মো. হারুন (৫৮), মো. আবুল হাশেম (৬৫), শামসুল হক ওরফে বদর ভাই (৭৫) ও এস এম ইউসুফ আলী (৮৩)। এদের মধ্যে দুই জন আসামি গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকলেও পলাতক রয়েছে বাকি ছয় জন।

১৯ এপ্রিল  দুপুরের দিকে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বলের নেতৃত্বে প্রসিকিউশন টিম ১০৭ পৃষ্ঠার আনুষ্ঠানিক অভিযোগটি দাখিল করেন।

আসামিদের মধ্যে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকা দুজন মুক্তিযুদ্ধে রাজাকার বাহিনীর সদস্য ছিলেন। পলাতক বাকি ছয়জন ছিলেন আলবদর বাহিনীর। গ্রেফতারকৃত শামসুল হক জামালপুর জেলা জামায়াতের সাবেক আমির এবং এস এম ইউসুফ আলী সাবেক জামায়াত নেতা ও সিংহজানি স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক।

আট আসামির বিরুদ্ধে  আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের ৩(১), ৪(১) ও ৪(২) ধারা অনুসারে হত্যা, গণহত্যা, আটক, অপহরণ, নির্যাতন, লুটপাট ও লাশ গুমের পাঁচটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ২২ এপ্রিল থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তৎকালীন জামালপুর মহকুমায় তারা অপরাধগুলো সংঘটিত করেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে জামালপুরে রাজাকার-আলবদর বাহিনী ও শান্তি কমিটি গঠন, স্থানীয় সাধনা ঔষধালয় দখল করে আলবদর বাহিনী ও শান্তি কমিটির কার্যালয় স্থাপন এবং সিংহজানি হাইস্কুলে আলবদরদের প্রশিক্ষণ প্রদান। এছাড়া পিটিআই হোস্টেল ও আশেক মাহমুদ কলেজের ডিগ্রি হোস্টেল দখল করে নির্যাতন কেন্দ্র গড়ে সেগুলোতে ১০ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা-গণহত্যা, আটক, অপহরণ, নির্যাতন ও গুমের অভিযোগ আনা হয়েছে। ঘটনার ৩৪ জন ও জব্দ তালিকার ছয় জনসহ মোট ৪০ জন সাক্ষী আট আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবেন।

মামলাটির প্রধান আসামি পলাতক আশরাফ হোসেন আলবদর বাহিনীর জামালপুর মহকুমার কমান্ডার ছিলেন। তার মাধ্যমেই মূলত ইসলামী ছাত্রসংঘের বাছাই করা কর্মীদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের কিলিং স্কোয়াড আলবদর বাহিনী গঠিত হয়। মামলাটি দায়েরের পর থেকেই তিনি ভারতে পালিয়ে আছেন বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন বলেও জানান তদন্ত কর্মকর্তা।

এছাড়া পলাতক অধ্যাপক শরীফ আহম্মেদ স্বাধীনতার পরে বিভিন্ন সময়ে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক এবং বাংলাদেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে কর্মরত ছিলেন।

গত ২৫ মার্চ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. মতিউর রহমান ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন কার্যালয়ে চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুর কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। এর আগে ২৪ মার্চ সকাল ১১টায় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার ধানমণ্ডিস্থ কার্যালয় সেফহোমে সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক আবদুল হান্নান খান, জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক সানাউল হক এবং এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্ত সংস্থার উপ-পরিচালক সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মতিউর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।

৯২ পৃষ্ঠার মূল তদন্ত প্রতিবেদনসহ ৫৯৬ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনে বিভিন্ন ধরনের সাক্ষ্য-প্রমাণ, দলিল ও ডকুমেন্টস রয়েছে। এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মতিউর রহমান ২০১৩ সালের ৬ জুন থেকে গত ২৪ মার্চ পর্যন্ত তদন্তকাজ সম্পন্ন করেন। তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আসামিদের বিরুদ্ধে মোট ১০টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনেছিলেন তদন্ত সংস্থা। সেখান থেকে একটি বাদ দিয়ে ও বাকিগুলোকে সমন্বিত করে মোট পাঁচটি অভিযোগ সম্বলিত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন প্রসিকিউশন।

রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে গত ৩ মার্চ আশরাফ হোসেনসহ ওই আটজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল-২। পরোয়ানা জারির পর ওই দিনই বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে অভিযান চালিয়ে  জামালপুর শহরের নয়াপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে শামসুল হককে ও ফুলবাড়িয়ার জাহেদা শফির মহিলা কলেজ গেট প্রাঙ্গণ থেকে ইউসুফ আলীকে গ্রেফতার পুলিশ। বর্তমানে কারাগারে থাকা এ দুজনকে তদন্তের স্বার্থে গত ৬ মার্চ সেফহোমে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন।