September 17, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে হাজার মানুষের বসবাস, দায় কার?

বিশেষ প্রতিবেদক : ছাদের সিলিংয়ে বড় বড় ক্ষতগুলো যেন চোখ পাকাচ্ছে। দেয়ালগুলো থেকেও সেই কবে খসে গেছে পলেস্তারা। সিলিং ফ্যান চালু করলেই ওপর থেকে ঝরে পড়তে থাকে চুন আর সিমেন্ট। মতিঝিল এজিবি কলোনিতে এমন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই বাস করছেন হাজার খানেক মানুষ। তুলনামূলক কম টাকা ভাড়া হওয়ার কারণেই তাদের এই অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভরা জীবনযাপন।

এ কলোনিতে বসবাসকারীদের মধ্যে আবার সরকারি বরাদ্দে আছে ২৩টি পরিবার। এর মধ্যে রয়েছে খোদ গণপূর্ত অধিদপ্তরেরই পাঁচ জন কর্মকর্তা, যারা কিনা বিভিন্ন সময় জনস্বার্থে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণের কাজটি করে থাকেন। এছাড়াও পূর্ত মন্ত্রণালয় এবং ভূমি সংস্কার বোর্ডের কর্মচারীরাও বাধ্য হয়ে বাস করছে মতিঝিল এজিবি কলোনির ৩৪ ও ৩৬ নম্বর ভবনে। অথচ ১০ বছর আগেই ভবন দুটি বসবাসের অযোগ্য বলে ঘোষণা করেছে সিটি করপোরেশন।

তবে এ মানুষগুলো মনে করেন তারা এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বাস করছেন নিতান্তই দায়ে পড়ে। কারণ বাসা ভাড়া বাবদ তারা যে বরাদ্দ পান, তা দিয়ে তিন রুমের ফ্ল্যাট পাওয়া সম্ভব নয়।

মঙ্গলবার সকালে মতিঝিল এজিবি কলোনিতে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায় ৩৬/৪৫ নম্বর ফ্ল্যাটটির বরাদ্দ গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মচারী আশরাফুজ্জামানের  নামে। তবে তিনি বাসায় না থাকায় তার সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি। কথা হয় তার স্ত্রী আয়েশা আক্তারের সাথে। ১৭ বছর ধরে তিনি এ বাসায় আছেন। শেষ বার ভূমিকম্পের সময় দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন কলোনির বাহিরে।

এত  ঝুঁকি সত্ত্বেও কেন এ ভবনে থাকেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘কি আর করব! আমার স্বামী যে টাকা বেতন পায় তাতে অন্য কোথায় বাসা ভাড়া করে থাকা সম্ভব না। তাছাড়া অনেক বার কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়েছি, কিন্তু  কাজ হয় না। তারা শুধু আশ্বাসই দেন।’’

ভবন দুটির গায়ে সরকারি কর্তৃপক্ষের ঝুঁকিপূর্ণ বিজ্ঞপ্তিও সাঁটানো রয়েছে। তাতে লেখা আছে, ‘অত্র ভবন নং ৩৪ ও ৩৬ অতি পুরাতন, জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। বিগত ২০/৩/২০০৫ ইং তারিখে বসবাসের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। সেজন্য এ ভবনে বসবাস মোটেও নিরাপদ নয়। এ ভবনে বসবাস করলে ভবনজনিত কোনো দুর্ঘটনার জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুটি ভবনে ৫৪টি করে ফ্ল্যাট রয়েছে। ৩৪ নম্বর ভবনের ১১টি ও ৩৬ নম্বর ভবনের ১২টি ফ্ল্যাট সরকারি কর্মচারীদের নামে বরাদ্দ রয়েছে।

বরাদ্দ যাদের নামে : ৩৪/১ নম্বর ভবনটি বরাদ্দ রয়েছে মো. শাহজামালের (গণপূর্ত অধিদফতর) নামে, ৩৬/৩ মো. হাবিব (এজি ভবন), ৩৬/৪ মো. খোকন (এনবিআর), ৩৬/১৩ মো. নুরুল আলম (গণপূর্ত), ৩৬/১৪ আমির হোসেন ভূঁইয়া (প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়), ৩৬/৯ আমির হোসেন (কোর্ট অব সেটেলমেন্ট), ৩৬/১৯ আমেনা খাতুন (গণপূর্ত), ৩৬/২২ আবদুস সাদেক (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়), ৩৬/৩২ মো. কাজল (ইনকাম ট্যাক্স), ৩৬/৩৩ কামাল হোসেন (জ্বালানি মন্ত্রণালয়), ৩৬/৩৭ মনিরুল ইসলাম (শিক্ষা ভবন), ৩৬/৪৫ আশরাফুজ্জামান (গণপূর্ত), ৩৬/৪৮, নুরের রহমান (হাইকোর্ট বিভাগ), ৩৪/১৯ মোহাম্মদ ফিরোজ আলম (স্বাস্থ্য),৩৪/১৬ আবদুল ওয়াদুদ (শিক্ষা মন্ত্রণালয়), ৩৪/২২ মোহাম্মদ ইকবাল (শিক্ষা), ৩৪/৩২ হাফিজুর রহমান (এনএসআই), ৩৪/৩৩ মোহাম্মদ লিয়াকত আলী (স্বাস্থ্য), ৩৪/৩৪ বশির আহমেদ (পূর্ত মন্ত্রণালয়), ৩৪/৪৭ মো. ফারুক মিয়া (ভূমি সংস্কার বোর্ড), ৩৪/৩৭ আজিজুল হক (এনবিআর), ৩৪/৪৮ মো. বেলায়েত হোসেন (বাংলাদেশ বেতার) ও ৩৪/২ নম্বর ভবনটি মোহাম্মদ হাসানের (বিআরটিএ) নামে বরাদ্দ রয়েছে।

ভবন দু’টিতে সরকারী কর্মচারি ছাড়াও ৭৫টি ফ্ল্যাটে থাকেন হাজার খানেক মানুষ। এদের অনেকেই স্থানীয় মস্তানদের চাঁদা দিয়ে থাকার কথা স্বীকার করলেও অধিকাংশই স্বীকার করেনি। উল্টো এসব প্রশ্ন না করে দ্রুত চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভাড়াটিয়া বলেন, ‘মাস গেলে লাইনম্যান আলামিন আসে। দুই বাড়ির মাঝ খানের ফাঁকা জায়গাটায় টেবিল পেতে ভাড়া আদায় করে। শুনেছি সে আহমদ আলী নামের এক মস্তানের হয়ে কাজ করে।’

অবৈধভাবে ঝুঁকিপূর্ন জীবনযাপনে পুলিশ কেন বাধা দিচ্ছে না তা জানতে মিতিঝিল থানার ওসি ফরমান আলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিউজবাংলাদেশকে বলেন, ‘ওখানে বসবাসকারীদের আমরা অনেক বার বলেছি, অন্য কোথাও চলে যেতে। কিন্তু তারা যান না। আমরা যে অভিযান চালিযে সবাইকে নামিয়ে দিব, তাও পারছি না। কারণ, আমি যতদূর জানি ওই দু’টি ভবনে বেশ কয়েকজন সরকারী কর্মচারী থাকেন।’