October 23, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

টাইম স্কেল বাতিলে ক্ষোভ বাড়ছে প্রশাসনে

নিজস্ব প্রতিবেদক : প্রস্তাবিত জাতীয় বেতন কাঠামো থেকে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদ দেয়ায় সচিবালয়সহ সারা দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারী সংগঠনগুলোর (নন-ক্যাডার) পক্ষ থেকে গত এক সপ্তাহ ধরে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে। একই সঙ্গে বেশ কয়েকজন সিনিয়র মন্ত্রী ও বেতন পর্যালোচনা কমিটির সভাপতির সঙ্গে দেখা করে তারা তাদের ক্ষোভ ও অসন্তোষের কথাও জানিয়েছেন।

দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা এই টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড এবার প্রত্যাহার করা হলে সরকারি কর্মচারী অঙ্গনে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টিসহ যে কোনো ধরনের অনাকাক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশংকা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তারা।

প্রসঙ্গত টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদ দিয়েই সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করেছে বেতন কমিশন পর্যালোচনা কমিটি। বুধবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়।

বুধবার দুপুরে এ খবর ছড়িয়ে পড়লে সচিবালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দফতরে কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। পরে একই দিন বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি নিজামুল ইসলাম ভুইঞা মিলনের নেতৃত্বে ২৫-৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নেতা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এর আগে তারা তিন দিন ধরে চেষ্টা করেও অর্থমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পাননি।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তাদের সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী ৫ জুনের আগে এ বিষয়ে তার সঙ্গে দেখা হবে না। ক্ষুব্ধ এসব নেতা তাদের ক্ষোভ ও অসন্তোষের বিষয় তুলে ধরে বলেন, আগামী ৫ জুনের পর এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে ব্যর্থ হয়ে পরে তারা নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের সঙ্গে দেখা করে তাদের ক্ষোভ ও অসন্তোষের কথা জানান।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এও) সমিতির নেতা রেদওয়ান চৌধুরী, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) সমিতির নেতা এসএম ফরিদ আহমেদ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবদুল মান্নাফ, ওয়াহিদুজ্জামান, এনামুল হক ও একরামুল হক প্রমুখ।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের মহাসচিব মো. রুহুল আমীন বলেন, টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদ দিলে সচিবালয়সহ সারা দেশে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি হবে। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে। বিষয়টি জানতে পেরে আমরা এক মাস ধরে সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ে দেখা করে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বহাল রাখার দাবি জানিয়েছি। কারণ সরকারি চাকরিতে অর্জিত অধিকার বাতিল করা যায় না।

এদিকে, বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি নিজামুল ইসলাম ভুইঞা মিলনের নেতৃত্বে ১৫-২০ জনের একটি দল অর্থ প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নানের সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় তারা টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বহাল রাখার দাবি জানিয়ে বলেন, টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদ দেয়া সরকারে জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। এ নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। যে কোনো সময় সরকারের বিপক্ষে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। ঘটতে পারে অনাকাক্ষিত ঘটনা। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত সমাধান করার দাবিও জানান তারা।

এ বিষয়ে অর্থ প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশ পেয়েছি। টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা শিগগিরই বৈঠকে বসব।

এ বিষয়ে একজন কর্মচারী বলেন, তারা এ পর্যায়ে ব্যর্থ হলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করবেন। তিনি বলেন, বলতে গেলে স্বাধীনতার পর থেকেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পেয়ে আসছে। দীর্ঘদিনের এ অর্জিত অধিকার এভাবে হঠাৎ করে বাতিল করা যায় না।

টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিলের বিষয়ে পর্যালোচনা কমিটির প্রধান ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা বলেন, টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিলের সুপারিশ করেছে বেতন কমিশন। পর্যালোচনা কমিটির এ নিয়ে কোনো বক্তব্য নেই।

টাইম স্কেল : কোনো চাকরিজীবী ১৫ বছরেও কোনো কারণে পদোন্নতি না পেলে সেক্ষেত্রে ৮ বছর পর ১টি, ১২ বছর পর ১টি এবং ১৫ বছর পর আরও ১টি করে মোট ৩টি টাইম স্কেল পেয়ে থাকেন। প্রতিটি টাইম স্কেল পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট চাকরিজীবীর বেতন স্কেল এক ধাপ ওপরে উন্নীত হয়। এটি টাইম স্কেল নামে পরিচিত। এতে করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী পদোন্নতি না পেলেও আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকেন। বিশেষ করে সরকারি চাকরির ৬৫ শতাংশই ব্লকপোস্ট রয়েছে। যাদের পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ নেই। তারাই মূলত এর সুবিধাভোগী। ১৯৮১ সালে ক্যাডার সার্ভিসে টাইম স্কেল চালু হলেও ১৯৮৩ সালে তা নন-ক্যাডার পদেও চালু হয়।

সিলেকশন গ্রেড : পদ না থাকা বা ভিন্ন কোনো কারণে একই স্কেলে সন্তোষজনকভাবে দীর্ঘদিন চাকরির পর অনেকে পদোন্নতি পান না। এ ধরনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নির্বাচিত কিছু ব্যক্তিকে কিছু শর্তসাপেক্ষে উচ্চতর স্কেল প্রদান করা হয়। এ পদ্ধতিকে সিলেকশন গ্রেড বলা হয়। সত্তর দশকে এ পদ্ধতি চালু হয়।

যে কারণে বাদ টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড : প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোতে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদ দেয়ার সুপারিশ করে বেতন কমিশন। সুপারিশে বলা হয়, বর্তমানে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাদের মধ্যে কোনো গ্রেডের ক্ষেত্রে ১টি, কোনো গ্রেডের ক্ষেত্রে ২টি এবং কোনো গ্রেডের ক্ষেত্রে ৩টি সিলেকশন গ্রেড বা টাইম স্কেল রয়েছে।

দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে ৪ বছর, ৮ বছর ও ১২ বছর চাকরিপূর্তিতে পরপর ৩টি এবং একই গ্রেডভুক্ত তৃতীয় শ্রেণীর চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে ৮ বছর, ১২ বছর ও ১৫ বছর চাকরিপূর্তিতে পরপর ৩টি সিলেকশন গ্রেড/টাইম স্কেল প্রাপ্যতা রয়েছে।

৪র্থ শ্রেণীর চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে কেবল মন্ত্রণালয়/বিভাগে কর্মকর্তারা ১০ বছর চাকরিপূর্তিতে এবং এর বাইরের কর্মকর্তারা বেতন স্কেলের সর্বোচ্চসীমায় পৌঁছার এক বছর পর ১টি সিলেকশন গ্রেড পেয়ে থাকেন। অর্থাৎ প্রচলিত টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড সুবিধার ক্ষেত্রে শ্রেণী ও বেতন স্কেলভিত্তিক ভিন্নতা ও বৈষম্য রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, জাতীয় বেতন কমিশন ২০০৪ প্রচলিত সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল ব্যবস্থা বাদ দেয়ার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি।