September 29, 2022

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

রোজাকে সামনে রেখে নিত্যপণ্য মজুদের হিড়িক

বিশেষ প্রতিবেদক : আসন্ন রমজানকে কেন্দ্র করে পণ্যের মজুদ বাড়াচ্ছে ব্যবসায়ীরা। ‌রাজধানীর পাইকারি বাজার মৌলভীবাজারের আড়তগুলো এখন নিত্য পণ্যে ঠাসা। এগুলো মজুদ করা হচ্ছে রমজানের বাজারে অধিকহারে মুনাফার উদ্দেশ্যে। এরফলে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। গত ১৫ দিনে ব্যবসায়ীরা যে পরিমাণ পণ্যের এলসি নিষ্পত্তিসহ নতুন এলসি খুলেছেন, তা অন্য যেকোনও সময়ের তুলনায় দেড়গুণ। এলসিকৃত এসব পণ্য দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে আসতে সময় লাগবে কমপক্ষে ২১ থেকে ৩০ দিন। ওই পণ্য দেশের বাজারে এসে পৌঁছলে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে। তবে ওই পণ্য অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রবেশের আগেই এভাবে বাজার থেকে পণ্য উঠিয়ে নিয়ে মজুদ শুরু করলে বাজারে সংকট দেখা দিতে পারে। তাতে বাজার সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।এতে তৈরি হতে পারে অস্থিরতা। এখনই বিষয়টি মনিটরিং প্রয়োজন বলে মনে করেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের নীতি নির্ধারণী মহল থেকে বলা হয়েছিল- রমজানেও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য স্বাভাবিক থাকবে এবং কোনও পণ্যের দাম বাড়বে না। অথচ বাজার ঘুরে দেখা গেছে ভিন্নচিত্র। ইতোমধ্যেই ২৮ টাকা কেজি দরের পেয়াঁজ বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৪২ টাকা দরে। ৯২ থেকে ৯৮ টাকা কেজি দরের মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা থেকে ১৩০ টাকায়। ভোজ্যতেলের দামও বেড়েছে কেজিতে ১/২ টাকা হারে। রমজান আসতে-আসতে এ সব পণ্যের দাম আরও বাড়বে, এমন আশঙ্কাও করছেন সাধারণ ক্রেতারা। জানতে চাইলে ব্যবসায়ীদের জবাব একটাই, ‘সাপ্লাই কম’।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মৌলভীবাজার পাইকারি ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা বলেন, ‘এটি একটি রুটিন কাজ। রমজান শুরুর আগে আমরা কিছু পণ্য মজুদ করে রাখি। যেন রমজানে পণ্যের সরবরাহ ঠিক থাকে। এতে আমরা তো কোনও দোষ দেখি না।’

সাধারণত রমজানে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, পেঁয়াজ, বিভিন্ন প্রকার ডাল ও খেজুরের চাহিদা বাড়ে। বাজারে পণ্যের চাহিদা বাড়লে দামও বাড়ে। অধিক মুনাফার আশায় ব্যবসায়ীরা এই সুযোগটি গ্রহণ করতে আগাম প্রস্তুতি হিসেবেই বাজার থেকে কিছু নিত্যপণ্য গুদামজাত করে। তখন বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়। আবার কিছু-কিছু ক্রেতা আছেন, যারা রমজান শুরুর আগে থেকেই সারা মাসের পণ্য আগাম কিনে রাখার প্রতিযোগিতায় নামেন। তখন বাজারে পণ্য সংকটের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। অস্থির হয়ে ওঠে নিত্যপণ্যের বাজার। নিত্যপণ্যের মূল্য চলে যায় নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। এবারও সংশ্লিষ্টরা এমনটাই আশঙ্কা করছেন।

বিষয়টি আঁচ করতে পেরে রমজানে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রীর মজুদ, সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখতে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতা ও আমদানিকারকদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক ডেকেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে। সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ নিজে উপস্থিত থাকবেন বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানানো হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এপ্রিল ও চলতি মে মাসের প্রথম ১০ দিন মিলে মোট ৪০ দিনে ভোজ্যতেল ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন, চিনি ১ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন, পেঁয়াজ ৪৫ হাজার মেট্রিক টন ও ১৭ হাজার মেট্রিক টন ছোলা আমদানির এলসি খোলা হয়েছে। আরও পণ্য আমদানি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, অতীতের মতো এবারের রমজানেও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক থাকবে। কোনও পণ্যের দাম বাড়বে না। রমজান উপলক্ষে সয়াবিন তেল, ডাল ও চিনিসহ সকল পণ্যের মজুদ যথেষ্ট রয়েছে। কোনও পণ্যের সংকট কিংবা সরবরাহের ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা হবে না এবং দামও বাড়বে না।

রমজানে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবির) ভূমিকা কেমন হবে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, টিসিবির মাধ্যমে সারাদেশে পণ্য সরবরাহ সম্ভব নয়। টিসিবি হচ্ছে আপদকালীন মজুদের জন্য। যা দিয়ে আপদকালীন বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। যেন বাজারে কেউ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য (অবা) শাখায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে বছরে ১৬ থেকে ১৮ লাখ মেট্রিক টন ভোজ্যতেল, ১২ থেকে ১৪ লাখ মেট্রিক টন চিনির চাহিদা রয়েছে। রমজানের এক মাসে এ দুটি পণ্যের দাহিদা স্বাভাবিকের তুলনায় ১ থেকে দেড় লাখ মেট্রিক বৃদ্ধি পায়। ছোলা ও পেঁয়াজের বিষয়টিও এমন। সেই দিকটি বিবেচনায় রেখে রমজান মাসে বাজারে এ সব পণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাজ করছে বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব সদর আলী বিশ্বাস।

এদিকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক আবুল হোসেন মিঞা জানিয়েছেন, সারা বছরের মতো রমজান মাসেও বাজারে নিত্য পণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবেন। সঠিক মূল্যে পণ্য বিক্রি ছাড়াও কোনও পণ্যের অবৈধ মজুদ পরিস্থিতিও মনিটরিং করবে।