June 23, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

গাড়ির ভেতর গণধর্ষণ: পুলিশের দায়

নিজস্ব প্রতিবেদক : এবার গাড়ির ভেতর গণধর্ষণের শিকার হলেন একজন কর্মজীবী তরুণী। যমুনা ফিউচার পার্কে একটি দোকানের বিক্রয়কর্মী ওই তরুণী কাজ শেষে রাত নয়টার দিকে রাস্তায় গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় একটি মাইক্রোবাস থামিয়ে তাকে জোর করে গাড়িতে উঠিয়ে নেয় কয়েকজন যুবক। গাড়ির ভেতর তাকে হাত মুখ বেঁধে একে একে ধর্ষণ করে গাড়ির চালকসহ পাঁচ যুবক। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলন্ত গাড়িতে এই ভয়াবহ নিপীড়ন শেষে মধ্যরাতে তাকে উত্তরায় নামিয়ে দিয়ে যায় অপরাধীরা। এরপর নির্যাতনের শিকার মেয়েটি তার বড় বোনকে সাথে নিয়ে থানায় মামলা করতে যায়। ভোর চারটা থেকে থানা থানায় ঘুরে অবশেষে রাজধানীর ভাটারা থানায় পরদিন দুপুরে তার মামলা নথিভুক্ত করা হয় এবং রাত সাড়ে ১১টার দিকে মেয়েটিকে তেজগাঁওয়ে পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে নেয়া হয়।

নারী নির্যাতন এবং অবশ্যই যৌন নিপীড়ন আমাদের সমাজে বা রাষ্ট্রে নতুন কোনো ঘটনা নয়। নিপীড়িত ব্যক্তির শ্রেণিগত অবস্থান, ঘটনার ধরনের নতুনত্ব বা মিডিয়া কাভারেজ– ইত্যাদির প্রভাবে সমাজ মনস্তত্ত্বে নিপীড়িতের প্রতি সমবেদনা, নিপীড়কের প্রতি ক্ষোভ, পুলিশ বা সরকারের প্রতি ক্ষোভ তৈরি হয় এবং অপরাধীদের বিচার দাবির ঘটনা ঘটে। প্রভাবকগুলোর গুরুত্বানুসারে আন্দোলন-প্রতিবাদের স্থায়ীত্ব নির্ধারিত হয় এবং অবশ্যই একসসময় স্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। এর সাথে ক্ষমতার রাজনীতি, প্রশাসনিক কাঠামো এবং বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক মনোগঠন, ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা মোটামুটি কমন ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে।
তারপরও প্রতিটি নিপীড়নের প্রতিটি ঘটনাই কিছু প্রশ্ন তৈরি করে। জবাবদিহিতার কিছু দাবিকে সামনে নিয়ে আসে।

এবারে যৌন নিপীড়নের শিকার ২২ বছরের তরুণীটি একজন কর্মজীবী। পাশাপাশি তিনি স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন। জীবিকার তাগিদে ঢাকায় আসা এই মেয়েটি একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী থেকে এসেছেন। মান্দি বা গাড়ো নামে পরিচিত তাদের মাতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর প্রতি যৌন নিপীড়নের ‘সংস্কৃতি’ নেই। তাদের নিজস্ব আচিক ভাষায় বাংলা ‘ধর্ষণ’ বা ইংরেজি ‘রেইপ’ শব্দটির কোন প্রতিশব্দ নেই। এই তারুণ্যে নেচে-গেয়ে আদিবাসী সারল্যে প্রকৃতির সাথে মিশে থাকার কথা যে মান্দি তরুণীর, জীবিকার তাগিদে তিনি আমাদের এই উন্নত সভ্য সমাজের মহানগরে এসে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হলেন! জাতিগর্বী বাঙালি পাঠকদের কি একটু গ্লানি বোধ করার অনুরোধ করা যায়?

দেড় ঘণ্টা ধরে পাঁচজন পুরুষের দ্বারা এই বীভৎস এবং ভয়াবহ এই নিপীড়নের শিকার হয়েও এই নারী পরাজয় মেনে নেননি। মুখ লুকিয়ে অন্যায়ের দায় বহন করে নীরবে-নিভৃতে অন্য অনেকের মতো হারিয়ে যাননি। তিনি রুখে দাঁড়িয়েছেন। রাষ্ট্রের কাছে অপরাধীদের বিচারের দাবি নিয়ে ছুটে গেছেন। তার আদিবাসী নারীর মর্যাদাবোধের সংস্কৃতি হয়তো তাকে এই সাহস যুগিয়েছে।

মধ্যরাতে অপরাধীরা তাকে উত্তরায় নামিয়ে দেয়ার পর শারীরিক ও মানসিকভাবে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার এই নারী তার বড় বোনকে সাথে নিয়ে থানায় মামলা করতে যান। রাত চারটায় তারা তুরাগ থানায় গেলে-ঘটনাস্থল অত্র থানার এলাকাভুক্ত নয়-এই কারণ দেখিয়ে তাদের ফিরিয়ে দেয়া হয়। এরপর ভোর পাঁচটায় তারা গুলশান থানায় গেলেও একইভাবে তাদের মামলা নেয়া হয় না। অবশেষে সকাল সাড়ে ছয়টায় তারা ভাটারা থানায় গেলে ওসি না থাকার অজুহাতে তাদের বসিয়ে রাখা হয়, সকাল সাড়ে নয়টার পর ওসি আসেন এবং সাড়ে বারোটার পর মামলা নেয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত রাত সাড়ে এগারোটায় তাকে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে পাঠানো হয়। দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার বিচার প্রার্থী একজন নারী প্রথম থানায় যাওয়ার সাড়ে আট ঘণ্টা পর মামলা নেয়া হল এবং বিশ ঘণ্টা পর তাকে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে নেয়া হল। এই হচ্ছে রাষ্ট্রের কাছে বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়া।

ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার মেয়েটিকে ভোর চারটায় যখন তুরাগ থানা প্রথম ফিরিয়ে দিল তখন তারা কি শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষটির জন্য নিরাপত্তা ও মানসিক সমর্থনের কোন ব্যবস্থা করেছিল? গুলশান থানা? শুধু অন্য এলাকায় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে দুইটি থানা কি এই দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ করতে পারে? ভাটারা থানায় এই নিপীড়িত মানুষটিকে দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা বসে থাকতে হয়েছে শুধুমাত্র একটি মামলা নথিবদ্ধ করার জন্য! এই সময়ে তার জন্য কি কোন সেবার ব্যবস্থা করেছিল পুলিশ কর্তৃপক্ষ? কোন ধরনের চিকিৎসা, মানসিক সমর্থন, যানবাহন সহায়তা না পেয়ে এমন চরম নিপীড়নের শিকার একজন নারী দীর্ঘ ২০ ঘণ্টা কাটিয়েছে শুধুমাত্র রাষ্ট্রের কাছে তার ন্যূনতম পাওনা ন্যায়বিচার চাইতে এসে! সাবাস পুলিশ বাহিনী! সাবাস বাংলাদেশ রাষ্ট্র!