October 23, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

ভারতীয় ঋণে নতুন রেললাইন স্থাপন করবে সরকার

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক : ভারতের ঋণ সহায়তায় খুলনা থেকে মংলা পর্যন্ত একটি নতুন রেললাইন নির্মাণ করবে সরকার। একই অর্থে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া থেকে শাহবাজপুর পর্যন্ত বিদ্যমান রেললাইনের সংস্কারও করা হবে।

মঙ্গলবার সকালে পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় এ সংক্রান্ত দুটো সংশোধিত প্রকল্পসহ ৯টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোধিত প্রকল্পের মধ্যে ছয়টি নতুন প্রকল্প এবং ৩টি সংশোধিত প্রকল্প রয়েছে।

নয়টি প্রকল্পের মোট ব্যয় হবে পাঁচ হাজার ৮৬৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের তহবিল থেকে ব্যায় হবে দুই হাজার ২৭০ কোটি ১৯ লাখ, সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ৩০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা এবং প্রকল্প সাহায্য তিন হাজার ৫৬৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় মন্ত্রী পরিষদের সদস্যসহ উর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরে পরিকল্পনা মন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল উপস্থিত সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।

খুলনা থেকে মংলা পর্যন্ত নতুন রেললাইন স্থাপনের জন্য অনুমোদিত সংশোধিত প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে তিন হাজার ৮০১ কোটি টাকা। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি প্রথম একনেকে অনুমোদিত হয়, তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল এক হাজার ৭২১ কোটি টাকা।

সংশোধিত এ প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করে পরিকল্পনা মন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল একনেক পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “রেলপথের এলাইনমেন্ট পরিবর্তনের ফলে রূপসা নদীতে প্রায় ৭১৭মিটার দৈর্ঘ্যের একটি রেলসেতু নির্মিত হবে। সেইসঙ্গে রেললাইনের দৈর্ঘ্য ১২ কিলোমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়াও নতুন করে কিছু জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এখন এ প্রকল্পের আওতায় খুলনা থেকে মংলা পর্যন্ত প্রায় ৬৫ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেললাইন নির্মিত হবে। সেই সঙ্গে ২১ কিলোমিটার লুপ লাইন তৈরি হবে। এ প্রকল্পে নির্মাণ কাজে (রূপসা রেলসেতুসহ) প্রায় ২২০০ কোটি টাকা খরচ হবে। অপরদিকে, ৬৭৮ একর ভূমি অধিগ্রহণে খরচ হবে ১০০০ কোটি টাকা। এছাড়া অন্যান্য খরচতো আছেই।”

সংশোধিত এ প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে ভারত সরকার ঋণ সহায়তা হিসেবে ২৩৭১ কোটি টাকা দেবে। বাকি ১৪৩০ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকার বহন করবে। বাংলাদেশ রেলওয়ে এ প্রকল্পটি ২০১৮ সালের জুন নাগাদ সম্পন্ন করবে।

অপরদিকে, মঙ্গলবারের একনেক মৌলভীবাজারের কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথটিকে পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এজন্য একনেকে ৬৭৮ কোটি টাকার একটি সংশোধিত প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকার দেবে ১২২ কোটি টাকা। বাকি ৫৫৬ কোটি টাকা ভারত সরকার বাংলাদেশকে ঋণ হিসেবে দেবে।

উল্লেখ্য, রেলচলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ায় এ রেলপথটি ২০০২ সাল থেকে বন্ধ আছে। সরকার বলছে সাড়ে ৫১ কিলোমিটার দৈর্ঘের এ রেলপথটিকে আরো ৯ কিলোমিটার বাড়িয়ে ভারতীয় সীমান্ত পর্যন্ত ডুয়েলগেজে রূপান্তরিত করে চালু করলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আঞ্চলিক রেলওয়ে নেটওয়ার্ক এবং ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে নেটওযার্ক উভয়ের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। ফলশ্রুতিতে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পর্যটন শিল্পের প্রসার ঘটবে।

এদিকে, একই সভায় সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে অবস্থিত মিল্কভিটায় নতুন করে আরো একটি গুঁড়া দুধ তৈরির প্ল্যান্ট স্থাপনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। এজন্য ‘সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি ঘাটে গুঁড়া দুগ্ধ কারখানা স্থাপন’ নামক ৭৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। মিল্কভিটা ২০১৭ সালের জুন নাগাদ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বলে সভায় জানানো হয়।
সভায় আরো বলা হয়, নতুন এ প্ল্যান্টটি স্থাপিত হলে গুঁড়া দুধের উৎপাদন দৈনিক ২৫ মেট্রিক টন বেড়ে যাবে যা প্রয়োজনীয় চাহিদার কিছুটা হলেও মেটাবে। বর্তমানে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ২১,৭০০ মেট্রিক টন গুঁড়া দুধ আমদানি করে। সে হিসেবে গড়ে দৈনিক আমদানির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৫৯ মেট্রিক টন। অপরদিকে, মিল্কভিটায় গুঁড়া দুধ তৈরির একমাত্র যে প্ল্যান্টটি বর্তমানে রয়েছে, তার দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা সাড়ে ১২ মেট্রিক টন।

দেশের গুঁড়া দুধের চাহিদা মেটাতে এ প্রকল্পটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনা মন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “শাহজাদপুরে দৈনিক প্রায় সাড়ে ৫ লাখ লিটার দুধ উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে মিল্কভিটা আড়াই থেকে সাড়ে তিন লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ করে যা দিয়ে তারা পাস্তুরিত তরল দুধ, গুঁড়া দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য তৈরি করে সারাদেশে সরবরাহ করে। কিন্তু অবশিষ্ট দুধ বাজারজাতকরণে সমস্যায় পড়েন ক্ষুদ্র খামারীরা। বিশেষ করে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়কাল যাকে দুধ উৎপাদনের মৌসুম বলা হয়, সে সময় উৎপাদিত অতিরিক্ত দুধ বাজারজাতকরণে সত্যিকারভাবেই সমস্যায় পড়েন ক্ষুদ্র খামারীরা। সেই সাথে বর্ষা মৌসুমের যাতায়াত সমস্যাতো আছেই। সেজন্যই এ এলাকায় দৈনিক উৎপাদিত ২ লাখ লিটার কাঁচা দুধ প্রক্রিয়াকরণ করে দৈনিক ২৫ মেট্রিক টন গুঁড়া দুধ উৎপাদন করতে চাইছে সরকার। সরকার বিশ্বাস করে এতে করে দুধের খামারীদের স্বার্থ যেমন রক্ষা হবে, সেই সাথে কমবে গুঁড়া দুধের আমদানিও।”

একনেকে দেশের ২২টি জেলার ১০৬টি উপজেলার ১০৩০টি ইউনিয়নের গ্রামীণ অতি দরিদ্র মহিলাদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে ৮৫৩ কোটি টাকার আরো একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। অনুমোদিত এ প্রকল্পটির নাম ‘সম্ভাবনাময় উৎপাদনশীল কাজে নারীদের সক্ষমতার উন্নয়ন’। সংক্ষেপে এ প্রকল্পের নাম ‘স্বপ্ন’। প্রকল্পটিতে সরকার ২১৩ কোটি টাকা দেবে। বাকি ৬৪০ কোটি টাকা উন্নয়ন সহযোগি সংস্থা ইউএনডিপি অনুদান হিসেবে দেবে।

প্রকল্পটিকে সামাজিক নিরাপত্তামূলক প্রকল্প আখ্যা দিয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, “গ্রামে যেসব ঋতুতে কাজ থাকে না, সেসব ঋতুতে খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ সৃষ্টি করে দরিদ্র মহিলাদের দারিদ্র ফাঁদ থেকে সামাজিক সুরক্ষা দিতেই আমরা এ প্রকল্পটির অনুমোদন দিয়েছি। এ প্রকল্পের আওতায় গ্রামীণ সড়ক মেরামত ও সংরক্ষণসহ বিভিন্ন কাজে দরিদ্র মহিলাদের দৈনিক ২০০ টাকা করে মজুরি দেওয়া হবে। এ মজুরি থেকে দৈনিক ৫০ টাকা ব্যাংকে জমা রাখা হবে। ফলে দেড় বছরে তার ২৫ হাজার টাকা জমা হয়ে যাবে। পরবর্তীতে এ পুঁজি খাটিয়ে তিনি আয় আরো বাড়াতে পারবেন।”

এছাড়া একনেক সভায় আরো যেসব প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয় তা হলো ৬১ কোটি টাকায় ‘বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নসহ সৌন্দর্যবর্ধন কাজ’; ৫৬ কোটি টাকায় ‘জামালপুর শহর বাইপাস সড়ক নির্মাণ’; ৮৮ কোটি টাকায় ‘কন্সট্রাকশন অব কোরস অব মিলিটারি পুলিশ সেন্টার অ্যান্ড স্কুল এট সাভার ক্যান্টনমেন্ট’; ২১৭ কোটি টাকায় ‘হ্যাচারিসহ আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার স্থাপন’; এবং ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার মানিকনগর এলাকায় মেঘনা নদীর বামতীরে প্রতিরক্ষামূলক কাজ’।