October 22, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

ধর্ষণ আপনাকে কেন ভাবাচ্ছে?

উদিসা ইসলাম : শুরুটা ঠিক কীভাবে হলো? যৌননিপীড়ন,ধর্ষণ,নির্যাতন অতঃপর হত্যা কীভাবে কবে থেকে ঘটতে শুরু হলো? পত্রিকার পাতা খুললেই এসব সংবাদে সয়লাব দেখছেন কবে থেকে?

এই সেইদিন যখন ১৪ এপ্রিল টিএসসিতে ঘটা যৌন হয়রানির ঘটনা গুরুত্ব দিলো না রাষ্ট্র সেইদিন থেকে কি শুরু হলো বলে আপনি মনে করছেন, নাকি যেদিন হাইকোর্টকে জবাবদিহি চাইতে হলো রাষ্ট্র কানে তুলছে না বলে। কবে? নাকি কবেকার কোন মেয়ে ইয়াসমিনকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনার পর থেকে। আপনি সম্প্রতি বিচলিত হচ্ছেন কেন?চারপাশে খবর বেশি দেখছেন বলে নাকি ঘটনা বেশি ঘটছে বলে।

লক্ষ্য করুন, একজন নারীকে বাইরে বের হতে নিষেধ করছে না। কিন্তু সে যে নারীকে বের হতে দিয়েছে এই জায়গা থেকেই নিজেকে মুক্ত করতে পারছে না। ফলে নারীর জন্য কি কি নিষিদ্ধ এবং নারী তার বাইরে গেলে বা না-গেলেও শাসনের সকল হাতিয়ার যে সে প্রয়োগ করতে পারে সেই ভাবনা থেকে বের হতে পারে না।

কবে থেকে শুরু হলো বা আপনার নজরে একটু ‘বেশি বেশি’হয়ে যাচ্ছে বলে কবে থেকে মনে হলো সেটার থেকে বেশি জরুরি: ধর্ষণ কেন ঘটছে এবং প্রতিরোধের জায়গাগুলো কি হতে পারে সেই আলাপে দ্রুত প্রবেশ করা। বিচারহীনতার সংস্কৃতি,অনায়াসে অস্বীকার করার সংস্কৃতি আমাদেরকে নিয়ে গেছে এমনই এক জায়গায় যে,আমাদের অপরাধপ্রবণতা কেবল বাড়েনি,সেটা বুক ফুলিয়ে প্রকাশের সাহসও বেড়েছে। প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমে যে খবর প্রকাশিত হয় যেখানে বিচার না পাওয়ার উদাহরণ উঠে আসে। পাঠকওতো জানেন আসল সত্যটা। অপরাধ করলে যদি ক্ষমতা থাকে তবে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে না। যদি কোনও কারণ বিচারের মুখোমুখি হতে হয় তবে বিশ্বাস করুন সেটি এতোটাই দীর্ঘস্থায়ী হবে যে আপনি আমি এমনকি বাদীও সেটির খোঁজ নিতে চাইবেন না। কারণ ধর্ষণের বিচার চাইতে যাওয়ার প্রতিটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতার স্মরণ তাকে ক্ষতবিক্ষত করে।

আর স্কুলে, বাসে, মাইক্রোবাসে,ঘরে ফেরার সময়,রাস্তায় কিংবা ঘরে ধর্ষণ ঘটার অন্যতম কারণ কি? আমাদের রাষ্ট্র ও সরকারের কিছু কিছু দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা যেভাবে ভাবছেন সেই পথেই যদি ভাবতে চাই,তবে কি কারণ এটাই যে,ছেলেরা খারাপ হয়ে গেছে? মেয়েরা খারাপ পোষাক পড়ছে? ছেলেটি মেয়েটিকে অত্যাচারিত হতে দেখে মজা পাচ্ছে? নাকি অন্যকিছু?

বিচারহীনতার সংস্কৃতি,অনায়াসে অস্বীকার করার সংস্কৃতি আমাদেরকে নিয়ে গেছে এমনই এক জায়গায় যে,আমাদের অপরাধপ্রবণতা কেবল বাড়েনি,সেটা বুক ফুলিয়ে প্রকাশের সাহসও বেড়েছে। প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমে যে খবর প্রকাশিত হয় যেখানে বিচার না পাওয়ার উদাহরণ উঠে আসে।

আমার মনে হয়,আমাদের অবক্ষয়ের জায়গাগুলো চিহ্নিত না করা, স্বীকার না করা। সন্তান যদি ধরে নেয় তার শত ‘অপরাধ’ তার মায়ের চোখে ‘দুষ্টুমি’তাহলে সে সন্তান সেই’দুষ্টুমি’করা ঠিক না তা জানবে না। আমরা যুগের পর যুগ একধরনের সমাজের নিরাপত্তা কাঠামোয় বসবাস করে এসেছি এবং এখন অস্বীকার করছি। যে কাঠামোয় মহল্লার বড়রা ছোটদের দেখে রাখতেন। সে এক অন্য নিরাপত্তা ছিলো। কেউ কাউকে না চেনা,কেউ কাউকে চিনতে না চাওয়া,কেউ কাউকে আশ্রয় না দিয়ে একা বেড়ে ওঠার যে অদম্য সংস্কৃতি তাতে সমাজ অস্বীকার করে পরিবারের বাইরের নারীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।

লক্ষ্য করুন, একজন নারীকে বাইরে বের হতে নিষেধ করছে না। কিন্তু সে যে নারীকে বের হতে দিয়েছে এই জায়গা থেকেই নিজেকে মুক্ত করতে পারছে না। ফলে নারীর জন্য কি কি নিষিদ্ধ এবং নারী তার বাইরে গেলে বা না-গেলেও শাসনের সকল হাতিয়ার যে সে প্রয়োগ করতে পারে সেই ভাবনা থেকে বের হতে পারে না।

একটা করে যৌননিপীড়নের ঘটনা ঘটে আমরা দিকনির্দেশনা পাই। আমাদের কাছে যৌননিপীড়নবিরোধী নীতিমালা আছে। ভীষণ শক্তিশালী এই নীতিমালাকে প্রতিটা প্রতিষ্ঠানে নিজেদের মতো করে ধারণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো। যদিও বেশিরভাগক্ষেত্রেই সেই ধারণ সম্পন্ন করেনি কর্তৃপক্ষ এবং তাদের এই না করার বিষয়টি নিয়ে কারও কাছে জবাবদিহিও করতে হয়নি।

সম্প্রতি রাজধানীতে মাইক্রোবাসে তুলে এক গারো তরুণীকে গণধর্ষণের ঘটনায় মামলা নিতে বিলম্ব করায় সেটা কেনও ‘অসাংবিধানিক’ ঘোষণা করা হবে না,অবহেলার জন্য দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না এবং ধর্ষিতকে কেন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না- তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। পাশাপাশি থানায় ধর্ম,বর্ণ,গোত্র,লিঙ্গ ও জন্ম পরিচয় নির্বিশেষে বৈষ্যমহীনভাবে সবার সেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র সচিব, আইজিপি ও পুলিশ কমিশনারকে একটি সার্কুলার জারির নির্দেশ দিয়েছে আদালত। সংবিধানের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়ার ফলে এখন আবারও সেটা চিহ্নিত করে দিতে হচ্ছে আদালতকে। এ ধরনের নির্দেশনা কেউ পালন না করলে তার শাস্তির পক্রিয়া আরও সহজ হওয়া জরুরি। তা না হলে একটি করে ঘটনা এবং ঘটনার প্রেক্ষিতে একটি করে নির্দেশনা আমরা পাব কিন্তু তার বাস্তবায়নের রাস্তাটা হবে অনিশ্চিত।

ধর্ষণকে ক্ষমতা বিছানোর হাতিয়ার হিসেবে যুগ যুগ ধরে ব্যবহার করে আসছে এই সমাজ। সেই ক্ষমতা বিছানোর বিষয় যখন পযন্ত ‘ সংখ্যাগুরু’দের না ভাবাতে পারবে ততক্ষণ তারা মুখ খুলবে না। আর তাই পাহাড়ের রাজনীতিতে ধর্ষণকে কখনো কখনো জায়েজ হিসেবেও বিবেচনা করে সমতল।

গত একমাসে ধর্ষণের খবর যত বেশি আসছে তত বেশি নারীর অধিকার নিশ্চিতে কর্মসূচিগুলো কি ধরনের হওয়া উচিত তা নিয়ে প্রশ্ন চাড়া দিচ্ছে। একজন গারো কিশোরী যখন রাজধানীতে তার কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে নিরাপদ নয় তখন আমাদের টনক নড়ে ঠিকই কিন্তু রোজ পাহাড়ে যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে সেগুলো আমাদের নজরে নিতেও দ্বিধা। কেননা পাহাড়ে ক্ষমতা কাঠামো ভিন্ন স্বরে কথা বলে। পাহাড়ের বিষয়ে কথা বলার অধিকার কেবল পাহাড়ের সাথে সংশ্লিষ্টদের। ধর্ষণকে ক্ষমতা বিছানোর হাতিয়ার হিসেবে যুগ যুগ ধরে ব্যবহার করে আসছে এই সমাজ। সেই ক্ষমতা বিছানোর বিষয় যখন পযন্ত ‘ সংখ্যাগুরু’দের না ভাবাতে পারবে ততক্ষণ তারা মুখ খুলবে না। আর তাই পাহাড়ের রাজনীতিতে ধর্ষণকে কখনো কখনো জায়েজ হিসেবেও বিবেচনা করে সমতল।

১৫ জানুয়ারি বসতিস্থাপনকারী বাঙালি আইয়ুব আলী দ্বিতীয় শ্রেণির এক পাহাড়ি শিশুকে জঙ্গলে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে জখম অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরের মাসেই খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি ও চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চনপুরের সীমান্তবর্তী কর্ণফুলী চা বাগান এলাকায় লাকড়ি আনতে গিয়ে বর্মাছড়ি ইউনিয়নের বটতলী চাকমা টিলা (করেঙাতলী) গ্রামের এক পাহাড়ি নারীকে(২৭) ধর্ষণ প্রচেষ্টা চালায় কাঞ্চনপুরের ভোলাগাজী গ্রামের বাসিন্দা মো: সাহাবুদ্দিন। আমরা প্রধান গণমাধ্যমগুলোতে এ নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্যও দেখি না।

এই যে বাছাই করে প্রতিবাদ এবং বাছাই করে উচ্চস্বর তার খেসারত নিজেদের দিতে হবে বৈকি।

লেখক: সাংবাদিক।