December 6, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

পরীক্ষার হাড় এবং মাংস

এনামুল হক : আমাদের পরীক্ষায় পাশের হাড় ( Bone ) ৮৭%বাঁকীটা মাংস । বুঝলামনা এতো হাড় আসলো কোত্থেকে? দেশে মাংশ কিনলে kg তে 250 Gm হাড় দেওয়ার নিয়ম । আর আমাদের শিক্ষায় হাড় প্রায় পুরোটাই । এগুলো মৃত কংকাল না জীবিত কংকাল? বাঁকী মাংস গেলো কৈ? হাড়ের মজ্জায় ( Bone Marrow ) মজ্জা আছে না বাঁশির মতো ভিতরে ( Hollow ) খোলা? কিছুই বুঝে আসছেনা । হাড়ের পরিমাণ দেখে বুঝাই যাচ্ছে আমাদের শিক্ষা এখন ( RCC , Reinforced Cement concrete ) পিলারের উপর দাঁড়িয়ে গেছে । যেখানে Rod ৮৭% তাতে সুড়কি, বালি আর সিমেন্ট থাকা না থাকার প্রশ্নই আসেনা, থাকলেও চলে না থাকলেও Steel structure রং ( Paint ) এর প্রলেপ দিয়েও মাংসের উপর চামড়া হিসেবে চালিয়ে দেয়া যাবে ইন্শাল্লাহ্ । ভয় শুধু ভিত্তিতে ( Foundation ) । ভিত্তি মজবুত কিনা সেটাই আমার গবেষণার বিষয় । এখান থেকেই স্ট্রাকচার ( Stucture ) টিকে, উঁচুতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব কিনা তাই হবে আজ আমার আলোচনার চানাচুর ও মুড়ি পর্ব, সাথে রং চা ।

মানুষের আশার যেমন শেষ নেই, তেমনি আশাহত মানুষের সংখ্যাও কম নয় এই বাংলায় । যেখানে স্বর্ণ নির্মিত পদকেও গলদ থাকে, মানুষের সামনে চুর মন্ত্রীরা গলা ফাটিয়ে চলে, দলে বলে, আমিতো সেখানেই জন্মেছি । চুরির নেশা হয়তো আমারেও পেতো যদি সোনার বাংলা আমারে ঠাঁই দিতো । রবীন্দ্রনাথকে মনে পড়লো, দুই বিঘার পরিবর্তে বিশ্ব, নিখিলের অধিবাসী হয়েছি বলেই আজ ভালো মন্দ তফাৎ করছি নইলে ময়লার স্তূপে বসবাস করে ময়লার গন্ধ পেতাম কিনা জানিনা । আমার বহু জুনিয়র দেশে এখন শত কোটি টাকার এবং সম্পদের মালিক অথচ সে আমার দশ ভাগের এক ভাগ বেতনে চাকুরি করেনা । তার সম্বল একখান সরকারি চাকরি । আমার আছে ছাতী আর লাঠি ।

আমাদের জীবন গুলো কালের স্রোতে, কালো গর্তে পড়েছে তবুও নিরাশার মাঝেই আশার প্রদীপ জ্বলে নীরবে নিভৃতে । অজানা সুখে গা ভাসাই যখন দেখি শরীরে হাড্ডি আছে শুধু মাংস নাই । দুদিন আগেই টয়লেট থেকে আমার এক আত্মীয়ের কংকাল উদ্ধার হয়েছে । গতকাল 23/5/2014 সে কংকালের জানাজা হলো । জানিনা একটা সুস্থ্য মানুষকে গলাটিপে হত্যা করে যারা উপহাস হিসাবে কংকাল উপহার দিয়ে গেলো তাদের পাশের হাড় কতো? যাই হউক মানুষ খারাপের পিছে ছুটে তাদের সীনা পাশ করে ফেলেছে বলেই হয়তো আজ চারদিকে পাশের এতো ধূম আর জীবিত মানুষ হচ্ছে গুম ।

অনেক সহজেই অনেক কিছুই হওয়ার কথা এবং সে আশা করতেই পারি । আশা কইরা ছেলের নাম রাখছে সাদ্দাম, আজ পর্যন্ত সাদ্দাম উঠে দাঁড়িয়ে দেখলোনা । সেই হামাগুড়িতে জীবন শুরু এখনও তাই আছে । আর বিশ্বকাপে টাইগার সম্পর্কে একটা ভালো ধারণাতো আমাদের আছেই । সব আশা পূর্ণ হবারও নয়, কারণ বহু আগেই আশার গুড়ে বালি মিশানো হয়েছে । যারা জানেন তাহারা ভূক্তভোগী এবং সুবিধাভোগী এই দুই শ্রেণীতেই শুধু ভাগাভাগি । আমি অযথায় মধ্যে বসে কান্দি সবার লাগি ।

আমাদের শিক্ষা ব্যাবস্থায় সকল বড় ছোট পাবলিক পরীক্ষায় EVM চালু করা উচিত । সবগুলো বিষয়ে শতভাগ MCQ চালু করে পাশের হার দুই থেকে পাঁচশত গুণ বাড়ানো যাবে বলে আমি আশাবাদী । দেশের সকল গ্রাম ও পাড়ার অর্ধ শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত জনতাকে সার্টিফিকেটধারী বানানোর একটি মহতী উদ্দোগ নেয়াও যেতে পারে । এটি বাস্তবায়ন করতে পারলে জীবিত, মৃত সব মিলায়ে শিক্ষিত হয়ে, বিশ্বের কাছে প্রমাণ করতে পারবো যে আমরা স্বশিক্ষিত জাতি । এখানে বহু সময় save করাও সম্ভব, যেমন এইট পর্যন্ত পড়ায়ে SSC দেয়ার ব্যাবস্থা করা, দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ায়ে HSC দেয়ার ব্যাবস্থাও করা যেতে পারে । পরীক্ষার বিশ মিনিটের মধ্যে ফলাফল সহ শিক্ষার্থীকে বাড়ীতে পাঠানোর ব্যাবস্থা করা যেতে পারে । এভাবে দশদিন পরীক্ষা দিয়ে পরের দিনই কলেজে ভর্তি হতে পারবে । কোনো জট বা জুট ঝামেলা থাকবেনা । এখনতো সবই প্রায় MCQ এবং নির্বাচনের প্রতীকের মতো কয়টি উত্তর দেয়াই থাকে শুধু Button Push করতে পারলেই হতো । এতে পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যত নির্বাচনে ভোট দেয়ার তালিমটাও হয়ে যেতো । নির্বাচন কমিশনতো সারা বছর বসেই থাকে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে উনাদের সাহায্য নিতে পারে । জাতিকে গতিশীল করতে এমন চিন্তা কি আমরা করতে পারিনা?

আমাদের শিক্ষা ব্যাবস্থাপনায় এক অরাজক পরিস্থিতির মধ্যিখানে আমরা । প্রায় শতভাগ পরীক্ষার্থির উত্তীর্ণ হওয়ার বিশ্ব রেকর্ডের কাছেই আছি না দুনিয়ার সব রেকর্ডস ভেঙ্গে ফেলেছি তা মালুম হচ্ছেনা কিন্তু এই ফলাফলকে নিয়ে যারা হালুম হালুম করে হালুয়া মিঠাই খাচ্ছে, তারা কিসের বড়াই করেন? কজন শিক্ষার্থী ভালো করে শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পেরেছে । বিভিন্ন শহরের সরকারী বা বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর শিক্ষার যে মান, সেটি কি ইউনিয়ন বা থানা পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান গুলোতে বিদ্যমান? অথচ সংখ্যায় এরাই বৃহৎ অংশ দখল করে আছে ।

আমি দিনে বহুবার কবির সেই বিখ্যাত বাণীটি মনে করি” এমন দেশটি কোথাও খোঁজে পাবে নাকো তুমি” কোথাও থাকলেতো পাবো । আসলেই এমন বিশৃঙ্খল প্রশাসনিক ব্যাবস্থা পৃথিবীর কোথাও নেই । পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন পকেটে পকেটে চলে যায়, মোবাইলের LCD তে display হতে থাকে, বিভিন্ন মাধ্যমে উত্তর পৌঁছে দেয়া হয়, আবার হলের বাইরেও বহুজন পরীক্ষা দেন । অনেকে সকালের পরীক্ষা সময় সুযোগের অভাবে রাত্রেই দেন । এই সকল ব্যাপারে কে কতটুকু কন্ট্রোল করছে, সেখানে সাফল্য না দেখায়ে এই জারজ বা জমজ ফলাফলের আনন্দ কিসের?

এই শিক্ষা জাতির শীরদাড়া ভেঙে যাচ্ছে । আমি আমার এলাকায় বহু পূর্ব থেকেই দেখে আসছি, কোচিং, আবাসিক, অনাবাসিক, সকাল, দুপুর, রাত্র, মনে হয় এই শিক্ষা নামক বস্তুটি এন্টিবায়োটিকের মতো সময় মেনে বিনা বিরতিতে তিন বেলা বাচ্চাদের গলাদকরণ করানো হচ্ছে । এরপরেও গৃহ শিক্ষক, নোট, গাইড সহ আরো কতো সিস্টেম চালু আছে আমার জানা নাই । এক আত্মীয়ের ছেলে প্রাইমারীতে পড়ে, সে স্কুল কোচিং শেষে বাসায় ফিরে রাত সাড়ে দশটায় । লেখাপড়া নামক ব্যাবসা দেখে, আমার মাথা নষ্ট । শিক্ষা নামের মালগাড়ী এদেরকে টেনে টুনে সার্টিফিকেটধারী করবে এতে সন্দেহ নেই । এদের মানসিক বিকাশ কে ঘটাবে?

যে সন্তানটি দশ বা বার বৎসর এমন কঠিন জীবন যাপন করবে তার ব্রেইন সেল ডেমেজ হতে বাধ্য । আমার দেখা দুই পরীক্ষায় প্রায় সাড়ে ষোল শত নাম্বার পেয়ে বাচ্চা জেদ ধরেছে, জীবনে আর পড়ালেখা করবেনা । সকল বই ট্রাঙ্কে ভরে তালা দিয়ে বসে আছে । কারো কথা শোনবেনা । ডাক্তারী, ইঞ্জিনিয়ারিং, ভার্সিটি তখন তার জন্যে সহজ ব্যাপার, পরীক্ষা দিয়েছে কিন্তু কৃতকার্য হয়নি । এখনকার শিক্ষার্থীদের বিশ্রাম নেই, তাই এদের বাইরে দেহ গড়ে উঠে ভিতরে ভিতরে মনটা বেড়ে উঠেনা । হবে কেমনে? ঢাকার ঘাস সাদা আর টাঙ্গাইলে মানুষতো মরবেই ।

শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড । আমাদের শিক্ষার হারের সাথে মেরুদন্ডের হাড়ের কি কোনো মিল আছে? আমাদের জনগোষ্ঠীর একটি বৃহৎ অংশকে সার্টিফিকেটধারী বানিয়ে কিসের যোগ্যতা দান করা হচ্ছে? দেশের আশি শতাংশ স্কুলে মান সম্পন্ন শিক্ষক নাই । যা আছে এরা শিক্ষকতা করার জন্যে উচ্চ মেধাশূন্য কিন্তু রাজনীতিতে মাশাল্লাহ, নাম্বার ওয়ান । শোনেছি রাজনীতি না করলে মরনের পরে এ দেশে জানাজা হবেনা । তাছাড়া বহু টাকা কমিটিকে পণ দিয়ে চাকরি নিতে হয় । এই শিক্ষকতা পেশায় একবার ঢুকতে পারলেই হলো, এদের মাথায় থাকে শিয়ালের বুদ্ধি । চাকরির পাশাপাশি বাড়তি আয় করতে কোন কোন রাস্তা চলতে হবে তা এদেরই আবিষ্কার ।

থুথু সরকারের সময় পাবলিক পরীক্ষা সমুহ SSC, HSC এবং Degree অনুষ্ঠিত হতো, হাটে, ঘাটে, মাঠে দলে বলে কিছু হতো পরীক্ষার হলে । সেই আয়ামে জাহেলিয়ার সময় এতো নকল করেও পাশের হাড়ের প্রবৃদ্ধির হার এতো উচ্চ ছিলোনা । আমার এক বন্ধু ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলো যে, এ রকম নকল চলতে থাকলে, একসময় নকল সরবরাহের লোকও দেশে খোঁজে পাওয়া যাবেনা । সেই অন্ধকার কেটে আস্তে আস্তে আলোর ঝলকানি দেখলাম এবং শোনলাম কিন্তু অবিশ্বাস্য কোন আলাদিনের প্রদীপ পেলো আমাদের ডিজিটাল শিক্ষার্থীরা যার ফলে জিপিএ সয়লাব, পাশের বন্যা বয়ে যাচ্ছে? এই বন্যার স্রোতে মেধাবী এবং মেধাশূন্য সব এক কাতারে দাঁড়িয়ে গেছে এটিই বেশী দুঃখজনক এবং লক্ষণীয় বিষয় । যারা নিজের মেধায় ভালো ফলাফল করবে বা করছে তাদের সাথে নকলবাজদের মিশিয়ে ফেলা হচ্ছে নীরব নকল বিপ্লবের মাধ্যমে । পরীক্ষার আগেই শিক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্ন পৌঁছে দিয়ে পরীক্ষার হল নকলমুক্ত করার যে সুখ, সেটি মেঘাচ্ছন্ন আকাশে ঈদের চাঁদ দেখার মতোই আনন্দের ।

আমাদের মেরুদন্ড ভেঙ্গে খন্ড খন্ড করার নামই কি শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড? জাতির মেরুদন্ডের হাড় ভেঙ্গে ভেঙ্গে পরীক্ষায় পাশের হার বাড়ানোতে কি কৃতিত্ব থাকতে পারে? আমরা আসলে তেল মেরে চলতে বা চালাতে পছন্দ করি । তাই চোখে আঙ্গুল ঢুকায়ে দিলেও অনেকেই কিছু মনে করেনা । আমাদের দশম শ্রেণী পাশ করা যে কেউ বুঝে, শিক্ষা ব্যাবস্থাও রাজনীতির মতো পঁচে গেছে, সেখানে মন্ত্রীরা কোনো ময়লা খোঁজে পায়না । পরীক্ষার পূর্বেই ছাত্রদের হাতে প্রশ্ন পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব কার? আর কে করে? মূহুর্তেই সারা বিশ্বে প্রশ্ন ছড়িয়ে দিয়ে নকল বিপ্লব করে মন্ত্রীরা যখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে ফলাফল হস্তান্তর করে খুশীর ঢেকুর তুলে, হাততালি দেয়, তখন কে বেশী খুশি হয়? অবশ্যই সেই শয়তানদের দল, যারা অসৎ উপায় অবলম্বন করে স্বর্ণ মুকুটখানি মাথায় পড়েছে । কেউ কি উপলব্ধি করেনা ভিতরে ভিতরে কি হচ্ছে?

প্রশ্ন পত্র ফাঁস করে, শিক্ষা বিপ্লব ঘটিয়ে, শিক্ষা ব্যাবস্থার পাছায় বাঁশ দিয়ে যুগে যুগে কোটিপতি হচ্ছে এক শ্রেণীর লোক, এই মাফিয়া চক্র শতভাগ নিয়ন্ত্রণ না করা পর্যন্ত কোনো হাড়ই প্রকৃত শিক্ষার হার হিসাবে গণ্য নয় । আর এ নিয়ন্ত্রণের কাজটি যাদের করার কথা তারাতো সর্বদাই প্রস্তুত আছে তেলের ড্রাম নিয়ে । এরা জেনে শোনেই নিয়ন্ত্রণের ব্যাবস্থা নিবেনা । হয়তো এদের বিরাট এক আয়ের উৎস এই প্রশ্ন ব্যাবসা । তাই, কারো কাছেই ভালো কিছু আশা করা দুরুহ । অনেক আগেই শিখেছিলাম এবং শোনেছিলাম “অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালোনা” এ শিক্ষা আজ মিথ্যা । অতিরিক্ত সবই ভালো এটিই আজিকার শিক্ষা, দীক্ষা । তাই হয়তো, হত্যা, গুমে আমরা হয়ে আছি নির্ঘুম, মারামারি, কাটাকাটি, আগুনে পোড়ার পরে ধরে আছি থুম । কখনও কখনও মৃত দেহের উদ্ধার হচ্ছে হাড়, তাই বুঝি আমাদের শিক্ষার প্রকৃত হার? আর এই কলংকিত কংকালের হার গলায় পড়ে জাতি আজ কাঁদছে বারবার ।

Enamul Haque
Singapore
25/5/2014
31/05/2015
Sunday
N.B: Repost