September 28, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

মোদি, দূরে থেকেও কাছে

আনোয়ার সাদী : বিষয়টি আপনাদেরও চোখে পড়েছে নিশ্চয়ই। জি, ফেইসবুকে আগাম নোটিশ দেওয়ার কথা বলছি। কাল থেকে পরীক্ষা শুরু দোয়া করবেন বন্ধুরা, কিংবা সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার সংবাদে থাকবো আমি, আশা করি আপনাদেরও পাশে পাবো, অথবা আশা করছি রাত বারোটায় ওমুক টিভির টকশোত থাকবো- এসব নোটিশের কথা বলছি। আমার বন্ধুদের অনেকেরই এমন বার্তা আমি পাই। এমন বার্তা আমিও দেই। সবাই যে বার্তায় সাড়া দেয় তা নয়, সবাই যে বার্তায় সাড়া দিয়ে টিভির সামনে বসে থাকে তাও নয়। তবে সবাই জানে এবং সবাই একটু সম্মানিত হয় এই ভেবে যে বন্ধুরা আমাকে তার ভালো খবরেও মনে রেখেছে। সবচেয়ে বড় কথা এসব বার্তা দিয়ে আমরা একে অন্যের সঙ্গে সংযুক্ত থাকি।

অন্যকে জানানো আমাদের সামাজিক রীতি। আমরা জন্ম-মৃত্যু-অর্জনে প্রিয়জনকে পাশে রাখি সবসময়। এমনকী কোনো নতুন কাজে হাত দেওয়ার আগে পরামর্শ করি অনেকের সঙ্গে। কারণ এক মাথার চেয়ে দুই মাথা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। ঘন ঘন এক সঙ্গে বসা আমাদের সংস্কৃতি। কিন্তু ফেইসবুক বা টুইটারে সামাজিক হওয়া আমাদের দেশে অপেক্ষাকৃত নতুন সংস্কৃতি। কিন্তু বেশ ভালোভাবেই এই সংস্কৃতি গ্রহণ করেছে এদেশের মানুষ। ফলে, প্রবাসী হয়েও এখন আমাদের প্রতিবেশীরা বাস করেন যেন পাশের ঘরেই।

বলে রাখা ভালো, আমাদের এসব জানানোর সংবাদমূল্য নেই। কেউ কোনোদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ওমুকের টকশোর খবর বা পরীক্ষার খবর পত্রিকার পাতায় তুলে দেন না। অবশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন অনেকেই নানা রকম বিশ্লেষণ তুলে ধরেন যার সংবাদমূল্য আছে। আবার অনেক মানুষ এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আছেন যাদের কথা-বার্তা, চলাফেরা সবই সংবাদ। এমন একজন মানুষ নরেন্দ্র মোদি। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

সাধারণত কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এলে সে সম্পর্কে একটা ব্রিফ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।  সেটা শুনে সংবাদ পরিবেশন করে এদেশের গণমাধ্যম। এবার তাঁর ব্যতিক্রম হলো। বাংলাদেশ সফর নিয়ে ফেইসবুক পেইজে উচ্ছ্বাস ও আনন্দ মাখা এক স্ট্যাটাস দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি লিখেন এমন এক দেশে আসবেন যে দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত শক্তিশালী। লেখায়, সফরের কার্যক্রম, চুক্তির বিষয়ে নরেন্দ্র মোদির অনুভূতি বেশ ভালোভাবে ফুট উঠেছে। এই প্রথমবারের মতো, অতিথির নিজের কথা থেকেই সফরের প্রস্তুতির সংবাদ দিতে পারলাম আমরা। লক্ষ্য করি আর না ই করি সংবাদ পরিবেশনে একটা নতুনত্ব আমাদের দেখাতেই হলো। সবচেয়ে বড় কথা, এ যাবৎ ভিভিআইপিদের সফর সম্পর্কে সরাসরি জানার সুযোগ সাধারণ মানুষের হয়নি। তারা সব কিছু জেনেছেন গণমাধ্যম হয়ে। মানে টিভি দেখে বা রেডিওতে শুনে বা পত্রিকায় পড়ে। এবার সাধারণ মানুষ সরাসরি ফেইসবুকে লগইন করে নরেন্দ্র মোদির নিজের লেখনী থেকে সফর সম্পর্কে তাঁর মতামত জেনে নিতে পারলেন। সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সামাজিকতা করার এই কূটনীতিকে কী বলা যায় আগামীর কূটনীতি? এমনকী বিমান থেকে নেমে বাংলাদেশের আতিথেয়তার প্রশংসা করে টুইট করেন মোদি। গণ্যমাধ্যম টুইটার থেকে তা সংগ্রহ করে টিকারে প্রচার করে। বলে রাখা ভালো সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকরা তখনো অফিসে ফেরার কথা ভাবতে পারে নি। সংবাদ প্রচারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের শক্তিশালী ব্যবহার আগামী দিনগুলোতে ফেইসবুক-টুইটারের মতো সাইটগুলোর আরো শক্তিশালী হওয়ারই ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে পৃথিবীর সব শিক্ষিত  মানুষকে একই সমাজের বাসিন্দা করারও ইঙ্গিত দেয়। শিক্ষিত মানুষরা একেকজন হয়তো বাস করবেন একেক ভূখণ্ডে কিন্তু মানসিকভাবে তারা বাস  করবেন একই সমাজে। অনলাইন আমাদেরকে সেই সমাজেরই হাতছানি দেয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শুধু নরেন্দ্র মোদি নয়, যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্য কিংবা কানাডার প্রধানমন্ত্রী/রাষ্ট্রপতিরা হরহামেশাই টুইটারে নিজের মনোভাব ও কার্যক্রম সম্পর্কে জানান দেন। এমনকী সেলফি আপলোড করা কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পারিবারিক ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। সেসব দেশে সাধারণ মানুষের জীবনে পারিবারিক বন্ধন জোরালো থাকুক আর না-ই থাকুক, নিজেদের নেতাদের পারিবারিক জীবন বেশ সাবলীল দেখতে চান তারা। ফলে, আমরা দেখি কানাডার প্রধানমন্ত্রী তাঁর সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যাচ্ছেন। আবার ওবামা-মিশেল দম্পতিরও অনেক ছবি দেখতে পাই। বলতে পারি, গত এক বছরে নরেন্দ্র মোদির বেশ কিছু সেলফিও আমরা দেখতে পেয়েছি। অথচ, ভারতের সমাজ প্রায় আমাদের মতোই। সেখানে পারিবারিক বন্ধন এখনো দৃঢ় এবং মূল্যায়িত। রয়েছে যৌথ পরিবারও।

ভুলে গেলে চলবে না আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ। পড়ালেখা করেছেন আমেরিকায়। তাঁর ফেইসবুক পেইজ রয়েছে এবং সেখানে তিনি নিয়মিত নিজের মতামত তুলে ধরেন। বিগত দিনগুলোতে আমরা শেখ হাসিনার বেশ কিছু পারিবারিক ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখতে পেয়েছি। সেখানে তিনি হয়তো রান্না করছেন কিংবা ছেলের সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলছেন। এসব ছবি সাধারণ মানুষের মনে কতোটা আলোড়ন তুলেছে, তা ছবির লাইক ও শেয়ার মানে প্রচার সংখ্যা দেখেই সহজে বুঝা যায়।

যাহোক, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম জিয়ার নামেও ফেইসবুকে অ্যাকাউন্ট আছে বলে আমরা জানি। আরো অনেক রাজনৈতিক নেতাই অনলাইনে আছেন। আর এসবই আগামী দিনে সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের সরাসরি যোগাযোগের সম্ভাবনাকেই প্রবল করে। ইঙ্গিত একটাই আগামী দিনে আমরা হয়তো থাকবো পৃথিবীর বিভিন্নপ্রান্তে কিন্ত মানসিকভাবে থাকবো একই সামাজে। সে সমাজে একজনের কাছ থেকে অন্যজন থাকবে অনেক দূরে। চাইলেই দেখা করে  অন্যজন্যের সঙ্গে বসতে পারবে না এক টেবিলে। ধরতে পারবে না হাত। কিন্ত থাকবে সামনে । দেখতে পাবে। যোগাযোগ করতে পারবে সেকেন্ডে সেকেন্ডে । সে সমাজের নাম ভার্চুয়াল সমাজ।