September 18, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

'বাল্যবিবাহে পেছাচ্ছে বাংলাদেশ : প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে উল্টো গতি'

নিজস্ব প্রতিবেদক : সারা বিশ্বে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ এগিয়ে গেলেও বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে দেশ ক্রমাগত পেছাচ্ছে এবং এ বিষয়ে কাজ করার জন্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়নের বদলে বরং উলটো দিকেই যাচ্ছে – আজ মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সংবাদ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একথা জানিয়েছে।

সংগঠনটির এশীয় অঞ্চলে নারী অধিকার বিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক হিদার বার বলেন, ১৯৯১ সাল থেকে ২০১০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ৯৭ শতাংশ থেকে ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০০১ সাল থেকে ২০১০ সালের মধ্যে শিশুমৃত্যুর হার কমেছে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। প্রাথমিক পর্যায়ে বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিশু শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ছেলে ও মেয়ের সংখ্যা প্রায় সমান। কিন্তু বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে চিত্র পুরোপুরি উলটো।

বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও দেশের সামগ্রিক সাফল্যের এই চিত্রে বাল্যবিবাহ একটি ‘ছিদ্রের মতো’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বর্তমানে বাল্যবিবাহের দিক থেকে সারা বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি বাল্যবিবাহের ঘটনার দিক থেকে বাংলাদেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক।

এইচআরডব্লিউ’র তথ্য অনুযায়ী, এদেশে ১৫ বছরের আগে বিয়ে হয়ে যায় ২৯ শতাংশ মেয়ের এবং ১৮ বছর বয়সে যখন একজন ব্যক্তির উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাগ্রহণ সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ার কথা, তখন ওই পর্যায়েই এদেশের ৬৫ শতাংশ কিশোরী বিবাহিত থাকে।

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে অন্যান্য সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ সফলতার দিকে এগিয়ে গেলেও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধই কেন এতোটা কঠিন হয়ে পড়েছে- এমন এক প্রশ্নের উত্তরে পরিবর্তন প্রতিবেদককে হিদার বার জানান, সরকার সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) নিয়ে কাজ করার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এই লক্ষ্যমাত্রায় বাল্যবিবাহের প্রসঙ্গটি নেই- এটি এই সমস্যার সমাধান না হওয়ার অন্যতম একটি কারণ।

এই সমস্যার সমাধান হিসেবে টেকসই উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দেয়া এবং টেকসই উন্নয়নের আলোকে বাল্যবিবাহের বিষয়টিকে জাতীয় পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দেন তিনি।

এইচআরডব্লিউ জানায়, ২০১৪ সালের জুলাই মাসে লন্ডনে অনুষ্ঠিত নারীদের শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এদেশে বাল্যবিবাহের পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক বলে স্বীকার করেছিলেন এবং পরিস্থিতির উন্নয়নে কাজ করারও আশ্বাস দিয়েছিলেন।

সে সময় বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন, মার্কিন ফার্স্টলেডি মিশেল ওবামাসহ মালালা ইউসুফজাইয়ের মতো ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ২০২০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ১৫ বছরের নিচে কোনো কিশোরীর বিয়ে না হওয়ার বিষয়টি কার্যকর করা হবে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে নিশ্চিত করা হবে ১৮ বছরের নিচে কোনো মেয়ের বিয়ে না হওয়ার বিষয়টি।

এছাড়া বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের বিষয়টি জাতীয় পরিকল্পনার আওতায় আনা হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু ওই প্রতিশ্রুতির দুই মাস পরই বাংলাদেশ সরকার মেয়েদের সর্বনিম্ন বিয়ের বয়স ১৮ থেকে ১৬-তে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয় এবং ব্যাপক বিতর্কের পরেও ওই প্রক্রিয়া এখনো বহাল রয়েছে বলেও অভিযোগ করে মানবাধিকার সংস্থাটি।

অথচ বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে যেকোনো ব্যক্তির বিয়েতে আইনগত নিষেধাজ্ঞা রয়েছে যা কার্যকর করা হয়েছে প্রায় তিন দশক আগে।

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের জন্য এইচআরডব্লিউ’র পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাল্যবিবাহের বিষয়টিকে বিস্তারিত ও স্পষ্টভাবে জাতীয় পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা; সরকারের সংশ্লিষ্ট সবগুলো মন্ত্রণালয়, দেশের সুশীল সমাজ এবং এমনকি শিশুদেরও এই পরিকল্পনার সাথে সম্পৃক্ত করা; বাল্যবিবাহের সাথে জড়িত সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া এবং জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর সহায়তা নেয়া ইত্যাদি।

এ প্রসঙ্গে এইচআরডব্লিউ’র শিশু অধিকার বিষয়ক উপ-পরিচালক বিদ শেপার্ড জানান, সরকার বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে দেশের অনেক জেলাতেই কাজ করে গেলেও একই সময় স্থানীয় সরকার প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তারা নকল জন্ম নিবন্ধন পত্র সরবরাহের সাথে জড়িত থাকায় জনগণের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছাচ্ছে। একই সময় জনগণ বাল্যবিবাহের অপকারিতা সম্পর্কে জানছে এবং উলটো দিকে সরকারি কর্মকর্তাদেরই এ ধরনের অপকর্মের সাথে জড়িত থাকছে দেখছে- সবমিলিয়ে বিভ্রান্ত হচ্ছে জনগণ।

এছাড়া, উপমহাদেশে প্রাচীনকাল থেকে প্রচলিত নিয়ম এবং মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশে ইসলামিক শরীয়াহ রীতি অনুসরণের নামে অনেকে মেয়েদের শৈশবেই বিয়ে দেয়ার পক্ষপাতী। এ সমস্যা থেকে বের হতে জনসাধারণকে সচেতন করতে হবে, তাদের বাল্যবিবাহের অপকারিতা সম্পর্কে জানাতে হবে এবং জাতীয় পর্যায়ে বাল্যবিবাহ বিরোধী আইন কার্যকর করতে হবে বলেও সংবাদ সম্মেলনে মতপ্রকাশ করেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।