June 25, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

আজ মাগুরছড়া ‍দিবস

ডেস্ক :  আজ ১৪ জুন। মাগুরছড়া ট্র্যাজেডি দিবস।  ১৯৯৭ সালের এই দিনে কমলগঞ্জের মাগুরছড়া গ্যাস ক্ষেত্রে ১নম্বর অনুসন্ধান কূপ খননকালে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কেঁপে উঠে কমলগঞ্জ, মুহূর্তে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে যায় সর্বত্র। দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে জ্বলতে থাকে এ আগুন।

আগুনে পুড়ে যায় সংরক্ষিত বনাঞ্চল, চা বাগান, হাজার হাজার বন্যপ্রাণি ও খাসিয়াদের জুম আবাদ। ক্ষতিগ্রস্ত হয় রেলপথ, সড়কপথ, গ্যাস পাইপ লাইন, গ্যাসকূপ, ভূগর্ভস্থ পানিসম্পদ, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। স্তব্ধ হয়ে যায় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। আজও সেই স্মৃতি মনে হলে শিউরে উঠে কমলগঞ্জ এলাকাবাসী।

গ্যাসকূপটিতে ওই সময় অনুসন্ধানের কাজ করছিল মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি অক্সিডেন্টাল। গ্যাস ফিল্ডে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ক্ষয়ক্ষতি পরিশোধ না করেই কোম্পানিটি  অপর আরেক মার্কিন কোম্পানি ইউনিকলের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ ত্যাগ করে। ইউনিকলও কিছু দিন কাজ করার পর ফের আরেক মার্কিন কোম্পানি শেভরনের কাছে তাদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে চলে যায়।

মাগুরছড়া গ্যাস ফিল্ডে ভয়াবহ এই বিস্ফোরণে মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা নির্ধারাণ করা হয়। গ্যাস ক্ষেত্রে বিস্ফোরণের পর দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তাকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ৩০ জুলাই মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিবের কাছে দুটি ভলিউমে প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠার তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়। পরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এ বিস্ফোরণের ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণ, ক্ষতিপূরণ পাওয়া  ও তা বিতরণের বিষয়ে তিন সদস্যের একটি সাব কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটি সাব-কমিটিকে জানায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে অক্সিডেন্টালের ব্যর্থতার জন্যই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। কমিটির তদন্তে অক্সিডেন্টালের কাজে ১৫ থেকে ১৬টি ত্রুটি ধরা পড়ে। অক্সিডেন্টালের কর্মকর্তারা দুই থেকে তিনটি ত্রুটির বিষয়ে আপত্তি জানালেও বাকিগুলো স্বীকার করে তদন্ত রিপোর্টে সই করেন।

ক্ষয়ক্ষতি প্রসঙ্গে তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়, মাগুরছড়া গ্যাস ক্ষেত্রে ব্লো আউটে ছোট বড় ৩৯টি চা বাগানের ক্ষতি হয়েছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয় ৪৬ কোটি ৬ লাখ ৮৪ হাজার ৮৩০ টাকা। এ ছাড়া বনাঞ্চলের মোট ক্ষতি ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৮৫৮ কোটি  ৩১ লাখ টাকা, ২  হাজার ফুট রেলওয়ে ট্র্যাক ধ্বংস বাবদ ক্ষতি ৮১ লাখ ৫৪ হাজার ৩৯৫ টাকা, সড়ক পথ  বাবদ ২১ কোটি টাকা, গ্যাস পাইপ লাইন বাবদ ১৩ লাখ টাকা, বিদ্যুৎ লাইন বাবদ ক্ষতি ১ কোটি ৩৫ লাখ ৯ হাজার ১৮৬ টাকা, খাসিয়া পানপুঞ্জির অধিবাসীদের পানের বরজ বাবদ ধরা হয়েছে ১৮ লাখ টাকা, বাস মালিকদের রাজস্ব ক্ষতি ধরা হয়েছে ১২ লাখ টাকা। আর বিস্ফোরণে পুড়ে যাওয়া ভূগর্ভস্থ গ্যাসের পরিমাণ ৪৮৫.৮৬ বিসিএফ এবং এর মধ্যে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ ২৪৫.৮৬ বিসিএফ ধরা হয়। উত্তোলনযোগ্য ২৪৫.৮৬ বিসিএফ গ্যাসের দাম ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮৩৪ দশমিক ৪৮ কোটি টাকা।

তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, ভয়াবহ এই বিস্ফোরণে মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও মাগুরছড়া ট্র্যাজেডির এতোগুলো বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও ওই মার্কিন কোম্পানির কাছ  থেকে আজও মেলেনি ক্ষতিপূরণ।

এদিকে ক্ষতিপূরণের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে পরিবেশবাদীসহ স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠন। দাবি আদায়ে তারা শান্তিপূর্ণভাবে লং মার্চ, মানববন্ধন, পদযাত্রা, সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল, গণসংযোগসহ নানা কর্মসূচির পালন করছে। এবারও বিভিন্ন সংগঠন আলোচনা সভা, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালনের প্রস্তুতি নিয়েছে।