September 28, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

অভিভাবকহীন রাজধানীর বাজারগুলো

বিশেষ প্রতিবেদক : রমজানের শুরুতেই অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে রাজধানীর খুচরা ও পাইকারি; উভয় ধরনের বাজারগুলো। নিত্যপণ্যের বাজার কেউ অস্থিতিশীল করলে বা কেউ কৃত্রিম উপায়ে পণ্যের দাম বাড়ালে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্তও কাজে আসেনি। রমজানের শুরুর দুদিনই অসাধু ব্যবসায়ীরা যে, যে ভাবে পেরেছে সে, সেইভাবে অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নিয়েছে। কেউ অতিরিক্ত চাহিদার দোহাই দিয়ে বাড়তি মুনাফা লুটেছে। কেউবা সরবরাহ কম বলে অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নেওয়ার উৎসব করেছে। গত দুদিন ধরেই বাজার মনিটরিংয়ে সরকারি কোনও সংস্থার কার্যক্রম রাজধানীর বাজারগুলোয় চোখে পড়েনি বলে জানিয়েছেন শুক্র ও শনিবার বাজারে আসা সাধারণ ক্রেতারা। ফলে তারা ২৫ টাকা কেজি দরের বেগুন কিনতে বাধ্য হয়েছেন ১০০ টাকা দরে। আবার ২০ টাকা কেজি দরের শশা কিনেছেন হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে। রমজানের অজুহাতে পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ,  লেবু ও ধনেপাতার দাম কয়েকগুণ বাড়িয়ে ক্রেতাদের কাছ থেকে ব্যবসায়ীরা সুবিধামতো আদায় করেছে। একই অজুহাতে বাজারে বেড়েছে শাকসবজি, মাছ, মুরগি ও সব ধরনের মাংসের দাম।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সব সময়ই মধ্য পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে অস্থির হয়ে ওঠে নিত্যপণ্যের এসব বাজার। এদের কারসাজিতে রমজান, ঈদ, কোরবানির মতো আনন্দময় ধর্মীয় উৎসবগুলো কারও-কারও জন্য হয়ে ওঠে কষ্টের কারণ। বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে অধিক মুনাফার আশায় এরা সব সময় হয়ে ওঠে বেশ খানিকটা তৎপর। এরা একদিকে মাঠ পর্যায়ের  কৃষককে ১০ থেকে ১২ টাকা কেজি দরে বেগুন বিক্রি করতে বাধ্য করে, অন্যদিকে সিন্ডিকেট করে সেই বেগুন ১০০ টাকা কেজি দরে সাধারণ ভোক্তাকে কিনতে বাধ্য করে। মাঝখান দিয়ে মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা লুটে নেয় এসব মধ্যস্বত্বভোগী অসাধ্য ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বৈঠকে সরকারি নীতিনির্ধারকদের এ বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করলেও কাজের কাজ তেমন কিছুই হয়নি।

এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে বারবার জানানো হয়েছে, রমজানকে কেন্দ্র করে বাজার মনিটরিং বাড়ানো হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চলছে মনিটরিং। রাজধানী ঢাকায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ১৪ জন উপ-সচিবের নেতৃত্বে ১৪টি মনিটরিং টিম কাজ করছে। পাশাপাশি জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নেতৃত্বে এলাকা ভেদে এক বা একাধিক টিম বাজার মনিটরিংয়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে আরও জানানো হয়েছে, রাজধানী ঢাকায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর বাজার মনিটরিং কার্যক্রম তদারকি করছে। মনিটরিং টিম বাজারে প্রয়োজণীয় নিত্যপণ্যের মূল্য, সরবরাহ ও মজুদ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে। পাশাপাশি রমজানের বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে যদি কোনও অসাধু ব্যবসায়ী যেকোনও পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বা কৃত্রিম মূল্য বাড়ায়, তা হলে তা প্রতিরোধে এসব মনিটরিং টিম বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করবেন। এ জন্য প্রতিটি টিমে একজন ম্যাজিস্ট্রেটও থাকবেন। প্রতিটি টিমে র‌্যাব, পুলিশ, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিসহ জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরের একজন করে প্রতিনিধিও যুক্ত থাকবেন।  ভ্রাম্যমাণ আদালত তাৎক্ষণিক অপরাধীকে শনাক্ত করে তার বিরুদ্ধে জেল জরিমানা বা উভয়দণ্ড দিতে পারবেন। রমজানের এই দুইদিনে রাজধানীর বাইরে এ ধরনের কার্যক্রমের কিছু খবর পাওয়া গেলেও রাজধানীতে এ ধরনের কোনও খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ১৪টি বাজার মনিটরিং টিম পরিচালনার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর যৌথভাবে,  অনেক ক্ষেত্রে পৃথকভাবে নিজ নিজ মনিটরিংসহ অন্যান্য প্রস্তুতি নিয়েছে। রমজানে সব ধরনের নিত্যপণ্যের সরবরাহ, মজুদ ও মূল্য ঠিক রাখতে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এ সংক্রান্ত কয়েকটি বৈঠকও করেছেন। বৈঠকে কৃষি, খাদ্য, অর্থ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ ঢাকা জেলা প্রশাসন, পুলিশ, র‌্যাব, দেশে কর্মরত চারটি গোয়েন্দা সংস্থা, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বন্দর কতৃর্পক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তারা এবং তাদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে শনিবার রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রমজানের বাতাস পুরোপুরি লেগেছে রাজধানীর বাজারগুলোয়। গত সপ্তাহের তুলনায় বেড়েছে সয়াবিন তেলের দাম। মসুর ডাল, চিনির বাজারও চড়া। তবে অনেকটাই স্থির আদা ও রসুনের দাম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, এবারের রোজায়ও কোনও পণ্যের দাম বাড়বে না। সকল প্রকার নিত্যপণ্য সাধারণ ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই থাকবে।

জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন বলেছেন, রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বাজারের প্রতিটি দোকানে পণ্যের মূল্য তালিকা দর্শনীয় স্থানে টাঙ্গিয়ে রাখা এবং পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের সময় পাকা রশিদ সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঢাকাসহ সারাদেশে এ নির্দেশনা কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট সকলকে নির্দেশ কার্যকর করতে বলা হয়েছে।

বাণিজ্য সচিব আরও জানিয়েছেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর এবং প্রতিটি জেলা প্রশাসনের বাজার মনিটরিং টিম নিয়মিতভাবে পুরো রমজানে এ বিষয়গুলো তদারকি করবে। সরকারের এ সব নির্দেশ অমান্যকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণসহ ট্রেড লাইসেন্স ও নিবন্ধন সাময়িকভাবে বাতিল এবং পণ্য বাজেয়াপ্ত করার অতীতের নির্দেশ বহাল থাকবে বলে জানিয়েছেন তিনি।