October 24, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

টাইগারদের ভারত বধ

ক্রীড়া প্রতিবেদক: রোববার মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ভারতকে মাটিতে নামিয়ে আনলো বাংলাদেশ। দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ছয় উইকেটে হারিয়ে প্রথম বারের মত সিরিজ জয় নিশ্চিত করলো টাইগাররা। আর এ জয় দিয়েই ২০১৭ তে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়ান্স লিগে জায়গা নিশ্চিত করে নিলো মাশরাফিরা।

এর আগে ১৮ বার পুর্নাঙ্গ সিরিজ জয়ের স্বাদ পেয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজের মত দলের বিপক্ষে হোয়াইট ওয়াশের স্বাদ। কিন্তু ভারতকে সিরিজ হারানোর তৃপ্তিই যেন আলাদা। বিশেষ করে বিশ্বকাপে ভারতের কাছে আম্পায়ারদের বিতর্কিত কিছু সিদ্ধান্তে পরাজয়টা যেন গলায় কাঁটার মত আটকে ছিল। প্রথম ওয়ানডেতে হারিয়েও যেন বিশ্বকাপের প্রতিশোধটাও সম্পূর্ণ হয়নি। এই ম্যাচ জয়ে যেন তার পূর্ণতা পেল।

ভারতের দেওয়া ১৯৯ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে টাইগারদের শুরুটা হয় দুর্দান্ত। তবে তামিমকে হারিয়ে কিছু কিছুটা ধীর স্থির ভাবে খেলে নিয়ন্ত্রন নেন সৌম্য সরকার এবং লিটন দাস। ধবল কুলকার্নির বলে স্লিপে দাঁড়িয়ে থাকা ধাওয়ানের হাতে ক্যাচ দিয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরেন তামিম ইকবাল(১৩)। ১৭তম ওভারে রবিচন্দন আশ্বিনের বলে এলবিডাব্লিউর ফাঁদে পড়ে আউট হন সৌম্য সরকার(৩৪) । তিন ওভার পরেই অক্ষর প্যাটেলের বলে ধোনির হাতে ক্যাচ দিয়ে লিটন(৩৬) ফিরে গেলে কিছুটা চাপে পরে বাংলাদেশ।

তবে বাংলাদেশের দুই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান সাকিব এবং মুশফিকের ব্যাটে এই চাপ সহজেই সামলে নেয় টাইগাররা। চতুর্থ উইকেট জুটিতে ৫৪ রান যোগ করেন এই দুই ব্যাটসম্যান। তবে দলীয় ১৫২ রানে দুর্ভাগ্যজনকভাবে রানআউট হয়ে ফিরে যান বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম।

এরপর সাব্বিরকে সাথে নিয়ে বাকি কাজটুকু সারেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। ৬২ বলে ৫১ রান নিয়ে অপরাজিত থাকেন সাকিব আল হাসান। আর সাব্বির করেন ২২ রান।

মূলত আগের ম্যাচে জয়ের নায়ক মুস্তাফিজের কাছে এই ম্যাচেও বিধ্বস্ত হয় ধোনিবাহিনী। ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই রোহিতকে ফেরান এই পেসার। ডান দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে দুর্দান্ত ক্যাচ নেন সাব্বির আহমেদ। দ্বিতীয় বলে রোহিতের উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পরে ভারত। তবে শেখর ধাওয়ান এবং বিরাট কোহলির ৭৪ রানের জুটিতে সে ধাক্কা সামলে নেয় ভারত।

১৩তম ওভারের তৃতীয় বলে টাইগারদের হয়ে দ্বিতীয় আঘাত হানেন নাসির। এলবিডাব্লিউর ফাঁদে ফেলে ফেরান ভারতের পোস্টার বয় বিরাট কোহলিকে। ২১তম ওভারের শেখর ধাওয়ানকে কিপার লিটন দাসের ক্যাচে পরিণত করে বাংলাদেশকে আবার উল্লাসে ভাসান নাসির হোসেন। তবে আউট হওয়ার আগে ক্যারিয়ারের ১৩তম অর্ধশত রান তুলে নিয়েছেন উদ্বোধনী এই ব্যাটসম্যান। ৬০ বলে ৭টি চারে ৫৩ রান করেন এই ভারতীয় ব্যাটসম্যান।

পরের ওভারেই রুবেল ফেরান আম্বাতি রাইডুকে। এর পর কোণঠাসা ভারত ধোনি-রায়নার ব্যাটে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করে। এই দুই ব্যাটসম্যান ৫৩ রানের জুটি গড়ে তুলেন। তবে মুস্তাফিজের আঘাতে ফিরে যেতে হয় রায়নাকে।  ৩৬তম ওভারের তৃতীয় বলে কিপার লিটন দাসের হাতে ক্যাচ দিয়ে সাজঘরে ফিরেন সুরেশ রায়না।

এরপর ৩৯তম ওভারের তৃতীয় ও চতুর্থ বলে ধোনি ও অক্ষর প্যাটেলকে সাজঘরে ফেরান মুস্তাফিজ। প্রথম ম্যাচে ধোনি-মুস্তাফিজের সেই ধাক্কার ঘটনার পর রোববারের ম্যাচে ধোনির উইকেট পেয়ে যেন উল্লাসে ভেঙ্গে পড়েন মুস্তাফিজ। অনেকটা যেন প্রতিশোধ নেওয়ার মতো। ৪১ ওভারের শেষ বলে আবারো আঘাত হানেন ভারত শিবিরে। ক্যাচ আউট করে সাজঘরে ফেরান অশ্বিনকে।

এরপর বৃষ্টি বাঁধায় সাময়িক খেলা বন্ধ থাকালেও বৃষ্টি শেষ হবার পর প্রথম এবং নিজের কোটার শেষ বলে আউট করেন ভারতের শেষ স্বীকৃত ব্যাটসম্যান জাদেজাকে। রুবেল শেষ ব্যাটসম্যান ভুবেনেশ্বর কুমারকে আউট করলে ২০০ রানে গুটিয়ে যায় ভারতের ইনিংস।

আগামী বুধবার সিরিজের শেষ ম্যাচে একই মাঠে ভারতের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ।

এদিকে এই জয়ের ফলে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলার নিশ্চয়তা পেল টাইগাররা।

এ বছরের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে র‍্যাঙ্কিংয়ের আটে থাকতেই পারলেই মিলবে ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলার সুযোগ। এ জন্য হাতে ছিল ভারতের সঙ্গে তিন ম্যাচ এবং আসছে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে তিন ম্যাচ, মোট ৬টি ওয়ানডে। এই ছয়টির মধ্যে দুটো জিতলেই হতো। আজ দ্বিতীয় ওয়ানডেও ভারতে হারিয়ে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাল মাশরাফি-সাকিবরা। এ জয়ে ভারতের বিপক্ষে প্রথমবারের মতো সিরিজ জয়ও হলো।

ভারতের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে জয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে টপকে যায় বাংলাদেশ। ৮৮ থেকে বেড়ে রেটিং পয়েন্ট হয় ৯১। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৮৮, পাকিস্তানের ৮৭। হিসাব ছিল, ২-১ সিরিজ জিতলে বাংলাদেশের রেটিং পয়েন্ট হবে ৯৩। আর পাকিস্তানের পর ভারতকেও বাংলাওয়াশ করতে পারলে বাংলাদেশের রেটিং পয়েন্ট হবে ৯৬। অত দুর যেতে হয়নি, আজ দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ভারতকে হারিয়ে র‍্যাঙ্কিংয়ে সাতে পৌঁছে গেল মাশরাফি-সাকিবরা। ছয়ে থাকা ইংল্যান্ডের রেটিং পয়েন্ট কিন্তু ৯৬। তবে এসব হিসাব অবশ্য ২০ জুন পর্যন্ত। আজকের ম্যাচ শেষেও তালিকা হালনাগাদ হবে।
রবীন্দ্র জাদেজাকে বোল্ড করে মুস্তাফিজের উল্লাস। ছবি: এএফপিচ্যাম্পিয়নস ট্রফির পর আগামী বিশ্বকাপও ইংল্যান্ডে। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলাটা হবে বিশ্বকাপের জন্য অভিজ্ঞতা পুঁজির সুযোগ। সেই সুযোগ পাওয়ার শর্ত ছিল একটাই, এ বছর ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মধ্যে থাকতে হবে র‍্যাঙ্কিংয়ে আটে। র‍্যাঙ্কিংয়ে সেরা আট দল খেলবে ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি। সেরা আট দল সুযোগ পাবে ২০১৯ বিশ্বকাপে সরাসরি বিশ্বকাপ খেলার সুযোগও। ফলে আট নম্বর জায়গাটি বাংলাদেশের জন্য ছিল দারুণ গুরুত্বপূর্ণ। যে জায়গাটি নিয়ে লড়াই হচ্ছিল পাকিস্তানের সঙ্গে। কারণ পাকিস্তান নয়ে। বাংলাদেশের কাছে ধবল ধোলাই হয়েই নয়ে নেমে যায় পাকিস্তান। আটে উঠে বাংলাদেশ।
পাকিস্তান কিছুদিন পরে খেলবে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ওয়ানডে। বাংলাদেশ খেলছে ভারতের বিপক্ষে। এই দুটো সিরিজ শেষেই র‍্যাঙ্কিংয়ে ওলটপালট হবে। তবে বাংলাদেশ ওত দিন অপেক্ষা না করেই পরপর দু ম্যাচে ভারতকে হারিয়ে ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলা নিশ্চিত করে ফেলল। এমনও হতে পারে, বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানও চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলবে। সেই সম্ভাবনাও আছে। তখন বাদ পড়বে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আটে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজের রেটিং পয়েন্ট ৮৮। নয়ে থাকা পাকিস্তানের ৮৭। আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজের কোনো ওয়ানডে সিরিজ নেই। আর সেপ্টেম্বর ৩০-এর মধ্যে র‍্যাঙ্কিংয়ের আটে থাকা দলগুলোই খেলবে ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি।
পাকিস্তানেরও কিন্তু শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পয়েন্ট বাড়ানোর সুযোগ থাকছেই। জুলাইয়ের সেই সময়টায় বাংলাদেশও খেলবে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে।
র‍্যাঙ্কিংয়ের হিসাব হচ্ছে, এগিয়ে থাকা দলের সঙ্গে খেলে জিতলে সেই দলের রেটিং পয়েন্টের সঙ্গে ৫০ পয়েন্ট যোগ করলে আপনি মোট পয়েন্ট পাবেন। হারলে সেই দলের রেটিং পয়েন্টের সঙ্গে ৫০ বিয়োগ করলে পাবেন মোট পয়েন্ট। র‍্যাঙ্কিংয়ের দুইয়ে থাকা ভারতের রেটিং পয়েন্ট ১১৬। প্রতিটা ম্যাচ জিতলে বাংলাদেশ পাবে ১৬৭ পয়েন্ট, হারলেও পাবে ৬৭ পয়েন্ট। ওদিকে একই নিয়মে শ্রীলঙ্কার (রেটিং পয়েন্ট ১০৬) বিপক্ষে প্রতিটা ম্যাচ জিতলে পাকিস্তান পাবে ১৫৬ পয়েন্ট, হারলে ৫৬ পয়েন্ট।
বাংলাদেশের জন্য সুখবর হলো, ভারতের বিপক্ষে সিরিজটা ২-১ ব্যবধানে হারলেও তাদের রেটিং পয়েন্ট হবে ৮৯। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে টপকে চলে যাবে সাতে। ২-১ সিরিজ জিতলে বাংলাদেশের রেটিং পয়েন্ট হবে ৯৩। আর বাংলাওয়াশ করতে পারলে বাংলাদেশের রেটিং পয়েন্ট হবে ৯৬। ছয়ে থাকা ইংল্যান্ডের রেটিং পয়েন্টও ৯৮।
পাকিস্তানেরও কিন্তু শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পয়েন্ট বাড়ানোর সুযোগ থাকছেই। জুলাইয়ের সেই সময়টায় বাংলাদেশও খেলবে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। প্রোটিয়াদের বিপক্ষে বাংলাদেশ প্রতিটি ম্যাচ জিতলে পাবে ১৬২ পয়েন্ট, হারলে শুধু ৬২ পয়েন্ট। প্রতিটা ম্যাচই গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ম্যাচটা বৃষ্টিতে ভেসে না যাওয়া। কারণ ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশ যদি দুটো ম্যাচ হারে আর একটি ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেসে যায়, তাহলে পাকিস্তান উঠে আসবে আটে, বাংলাদেশ নেমে যাবে নয়ে! কীভাবে? দুটো ম্যাচ হারলেও বাংলাদেশ পাবে ১৩৪ পয়েন্ট। এখন বাংলাদেশের মোট পয়েন্ট ২৮ ম্যাচে ২৪৭১। দুই ম্যাচ হারলে হবে ৩০ ম্যাচে ২৬০৫। অর্থাৎ রেটিং পয়েন্ট হবে ৮৭! ভগ্নাংশের দিক দিয়ে এগিয়ে থেকে ওপরে উঠবে পাকিস্তান। আর ভারতের কাছে ধবল ধোলাই হলে রেটিং পয়েন্ট নেমে হয়ে যাবে ৮৬।
ভারতের বিপক্ষে সিরিজ তো বটেই, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজেও বাংলাদেশ কেমন করছে, পাকিস্তানের পাশাপাশি তা অধীর আগ্রহে তাকিয়ে দেখবে ওয়েস্ট ইন্ডিজও। আর বাংলাদেশের কারও দিকে তাকানোর দরকার নেই।