September 19, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

ইন্টারনেটের বাংলা ডোমেইন নাম হারালাম

মোস্তফা জব্বার : যারা আমার কম্পিউটার চর্চার ইতিহাস জানেন তারা খুব ভাল করেই জানেন যে, আমি কম্পিউটারের লোক নই। আমার পেটে বোমা মারলেও বাইনারি লজিকের একটি ডিজিটও বের হবে না। বরং আমি স্মরণ করতে পারি যে, আশির দশকের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে একবার কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নিতে ভর্তি হয়েছিলাম। আমার সাথে ছিলো আমার শালাবাবু স্বপন। প্রথম দিন ক্লাশ করার পরই আমি প্রশিক্ষক মহোদয়কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, স্যার সামনের ক্লাশেওকি আপনি এসবই পড়াবেন? স্যার বলেছিলেন, যে হ্যাঁ। সেদিন তিনি কম্পিউটার দেখাননি, তার বিবরণও দেননি, বাইনারি অঙ্ক পড়িয়েছিলেন। আমার এখনও  যুগ্ম সংখ্যার বিষয়ে কোনো আগ্রহ নাই। কম্পিউটারের ভেতরে, মাইক্রোপ্রসেসরে ডিজাইনে বা চিপসেটে আমি মোটেই কোনো আনন্দ পাই না। আমার আনন্দ কম্পিউটার দিয়ে করা কাজের ফলাফলে।

শুরুটা করেছিলাম, কম্পিউটার দিয়ে বাংলা পত্রিকা প্রকাশ করার বিষয় নিয়ে। এই একটি বিষয়কে ঘাড়ে গর্দানে ঠেলে এমন একটি অবস্থা তখন তৈরি করতে সক্ষম হই যে,  কম্পিউটারে বাংলার ব্যবহার এবং আমি ও বিজয় প্রায় সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছি। যদিও এই যাত্রাটিও সুখের হয়নি এবং আমার বিজয় কীবোর্ড চুরি করা ঠেকাতে গিয়ে অহেতুক কিছু লোকের অবাঞ্ছিত গালাগাল শুনেছি, তবুও এই জগতটাই এখনও আমার প্রধান কর্মক্ষেত্র। খুব সঙ্গত কারণেই এসব বিষয়ে আমি কড়া নজর রাখি। আমার যেসব তরুণ বন্ধু এখন আইসিটি বিষয়ক সাংবাদিকতা করেন তারাও এই বিষয়ে কোনো খবর পেলেই আগে আমাকে স্মরণ করে। সেই সূত্র ধরেই বাংলা ডোমেইন নেমের খবরটি জানলাম।

২৫ জুনের  দৈনিক প্রথম আলোর ১৩ পৃষ্ঠার খবর; “ইন্টারনেট জগতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ডোমেইন (ইন্টারন্যাশনালাইজড ডোমেইন নেম-আইডিএন) ডট বাংলা (বাংলা) ব্যবহারের অধিকার হারিয়েছে বাংলাদেশ। ২০১২ সালে ব্যবহারের অনুমতি পেলেও গত তিন বছরে তা কার্যকর করতে না পারায় বাংলাদেশ ডোমেইনটি ব্যবহারের অধিকার হারায়। ডোমেইন ব্যবহারের স্বীকৃতি দেওয়া আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ইন্টারনেট করপোরেশন অব অ্যাসাইনড নেমস অ্যান্ড নাম্বারস (আইসিএএনএন)-এর তালিকায় বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য আইসিএএনএনের স্বীকৃত দুটি ডোমেইনের একটি হলো ডট বাংলা ও আরেকটি হলো ডট বিডি (বিডি)। তবে ডট বাংলা হারিয়ে গেলেও ডট বিডি এখনো চালু আছে। ইন্টারনেটে একটি রাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয়ের স্বীকৃতি হিসেবে কাজ করে এই ডোমেইন। যেমন ডট ইউএস ডোমেইন নামের কোনো ওয়েবসাইেট ঢুকলে বোঝা যায় সেটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েবসাইট। ডট বাংলা তেমনি ইউনিকোড দিয়ে স্বীকৃত বাংলাদেশি ডোমেইন। এই ডোমেইনটির ব্যাখ্যায় উইকিপিডিয়া বলছে, ডট বাংলা হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য একটি দ্বিতীয় ইন্টারনেট কান্ট্রি কোড টপ-লেভেল ডোমেইন (সিসিটিএলডি)। এই ডোমেইন বাংলা ভাষায় ওয়েব ঠিকানার জন্য বোঝানো হয়। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এ দুটি ডোমেইনের মালিক। মন্ত্রণালয়ের পক্ষে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) ডট বিডি ডোমেইন ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে। এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হলে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ-ই মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ডোমেইন উদ্ধারে এখন তারা তৎপর হয়েছে।

জানা গেছে, ২০১২ সালে বাংলাদেশের পাশাপাশি এ ডোমেইনটির অধিকার পেতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পক্ষে ভারত সরকারও আবেদন করে। সব দিক বিবেচনা করে আইসিএএনএন তখন ডোমেইনটি বাংলাদেশকে বরাদ্দ দেয়। বরাদ্দ পাওয়ার তিন বছরেও কেন ডোমেইনটি কাজে লাগানো গেল নানান মহলে এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেশের তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা ডোমেইন হারানোয় ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘ইন্টারনেটে আমার জাতীয় পরিচয় “ডোমেইন”। এটি হারানো লজ্জাজনক একটি ব্যাপার। কার অবহেলায় বাংলাদেশ এটি হারাল তা খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।’

ডোমেইনের অধিকার ফিরে পেতে সরকারকে তৎপর হওয়ার পরামর্শ দেন মোস্তফা জব্বার। টেলিযোগাযোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান লার্ন এশিয়ার সিনিয়র পলিসি ফেলো আবু সাঈদ খান বলেন, ‘সরকারি ওয়েবসাইটগুলোতে খুব সহজেই এই ডোমেইন ব্যবহার করা যেত। সরকার তিন বছরেও কেন তা করতে পারল না এটা বিস্ময়কর।

অন্যদিকে একই বিষয়ে অনলাইন পোর্টাল টেকশহর ২৪ জুন ২০১৫ পরিবেশিত খবরে জানায়, ২০১১ সালে ইন্টারন্যাশনালাইজড ডোমেইন নেইমে (আইডিএন) লেখার ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেয়েছিল বাংলাদেশ।

২০১০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক ডোমেইন হিসেবে ‘ডটবাংলা’ কার্যকর করতে আন্তর্জাতিক ডোমেইন ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্টারনেট করপোরেশন ফর অ্যাসাইন্ড নেইমস অ্যান্ড নাম্বারস (আইক্যান) এর কাছে আবেদন করেছিল।
বাংলাদেশের আবেদনের পর সংস্থাটি বাংলা ভাষাকে মূল্যায়ন করে। এরপর ইন্টারনেট অ্যাসাইনড নাম্বারস অথোরিটির (আইএএনএ) অনুমোদনও মেলে।

এরপর এই ডটবাংলার দায়িত্ব কে নেবে সে বিষয়ে আইডিএনের কাছে আবেদন করে তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াটি অবশিষ্ট ছিলো। কিন্তু প্রায় ৪ বছরেও এই কাজটি করা হয়নি। অবশেষ সম্প্রতি ডটবাংলাকে বরাদ্দহীন ঘোষণা করা হয়। ফলে ডটবাংলায় বাংলাদেশের আর দাবি রইল না।

উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ৩০ অক্টোবর দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অনুষ্ঠিত আইক্যানের বার্ষিক সম্মেলনে আইডিএন কান্ট্রিকোড টপ-লেভেল ডোমেইনে বিভিন্ন নন-ল্যাটিন ভাষা সংযুক্তির উদ্যোগ নেয়া হয়। সেই বছরের ১৬ নভেম্বর এই সংযুক্তির জন্য প্রথম আবেদন জমা পড়ে।

এতে অন্তর্ভুক্ত হতে হলে সেই ভাষাকে নন-ল্যাটিন এবং রাষ্ট্র অথবা নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের স্বীকৃত ভাষা হতে হবে। সেইসাথে কিছু কারিগরি বিষয়ও উতরে যেতে হয়।”

আমি স্মরণ করতে পারি, কম্পিউটারে বাংলা ভাষা প্রয়োগের বিষয়টি সহজ সরলভাবে আগায়নি। প্রথম দিকে বাংলা এনকোডিং ও প্রমিত কীবোর্ড নিয়ে প্রচুর পানি ঘোলা করা হয়েছে।  হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকার জাতীয় কম্পিউটার কমিটি ও কম্পিউটারে বাংলা প্রমিতকরণ কমিটি গঠন করে এই বিষয়ক উদ্যোগকে হিমঘরে ফেলে রাখে। ৯৬ সালে  আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলেও অতীতের জঞ্জাল পরিষ্কার করতে করতে ২০০১ সালের নির্বাচন আসে এবং ক্ষমতার পালাবদল হয়। আওয়ামী লীগ কম্পিউটারের ওপর থেকে শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করার বাইরেও কম্পিউটারে বাংলা ভাষার প্রয়োগ এবং এর প্রমিতকরণে অনেকগুলো উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু বেগম জিয়ার মন্ত্রী মইন খান পুরো বাংলা ভাষার বিষয়টাকে গুবলেট পাকিয়ে ফেলেন।

তিনি ২০০৩ সালে বিএসটিআই-এর ইটি-১৫ কমিটি ভেঙ্গে নতুন কমিটি বানিয়ে বিজয় কীবোর্ড নকল করে জাতীয় কীবোর্ড নামক কীবোর্ড প্রমিত করে চরম অচলাবস্থার সৃষ্টি করেন। আমরা তখন তাকে হাতে পায়ে ধরে অনুরোধ করেছিলাম ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামের সদস্য হতে। কিন্তু মাত্র ১২ হাজার ডলারের জন্য বেগম জিয়ার সরকার সেই সদস্যপদ নেয়নি। ফলে বাংলা ভাষাকে ইউনিকোড এনকোডিং-এ এখনও দেবনাগরীর দাসত্ব করতে হচ্ছে। আমরা যে সুযোগ নিইনি ভারত সেই সুযোগ নিয়েছে এবং বাংলার কোড তারাই তৈরি করে দিয়েছে। এমন অবস্থায় ২০০৯ সালে যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে এবং  প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান তথ্যপ্রযুক্তির দায়িত্ব পান তখন তাকে দিয়েই আমরা ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামের সদস্যপদ গ্রহণ করাই। একই সাথে আমরা তাকে দিয়েই তদবির করিয়ে বাংলা ডোমেইন নেমের জন্য আবেদন করাই। কিন্তু বাংলাদেশের একদিকে দুর্ভাগ্য যে এখানে পাকিস্তানপন্থী অতীতমুখি রাজনীতি আছে-অন্যদিকে দেশে আছে ঘুণে ধরা আমলাতন্ত্র। এই আমলাতন্ত্র যেমন করে ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামে আমাদের দাবি যথাসময়ে তুলে ধরেনি, তেমনি করে বাংলা ডোমেইন নেম নিয়েও কাজ করেনি।

আজ ২৫ জুন সকালে খবরটি পাঠ করে আমি সরাসরি টেলিকম বিভাগের সচিব ফয়জুর রহমানের সাথে আলোচনা করি। তিনি বস্তুত আকাশ থেকে পড়েন এবং কেন এমনটি হলো সেটি নিয়ে অনুসন্ধান করতে থাকেন। বিকেলে তিনি সংসদে যাবার আগে আবার যখন তার সাথে কথা বলি তখন তিনি আমাকে আশ্বস্ত করেন যে এরই মাঝে সরকার বাংলা ডোমেইন নামের বিষয়ে পত্র দিয়েছে এবং তিনি আশা করেন যে, বাংলা ডোমেইন নেম আমাদেরই থাকবে। তিনি আরও জানান যে, এই কাজের দায়িত্ব থাকা একজন যুগ্ম সচিব তাকে পত্র পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এবং পত্রের জবাব পাওয়া গেছে বলেও তাকে জানানো হয়েছে। তবে তিনি ২৮ জুন রোববারে আরো বিস্তারিত জানতে পারবেন বলে আামকে জানান।

সচিব মহোদয়ের ত্বরিৎ নড়াচড়ায় বুকের মাঝে একুট স্বস্তি এলেও আমি এখনও মনে করি যে, এই বিষয়টির নিষ্পত্তি হতে চার বছর লাগার কোনো কারণ ছিলো না। কোনো না  কোনো মহল বিষয়টিকে গুরুত্বহীন মনে করেছে এবং সেজন্য দোষীদের চিহ্নিত করে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তবে সবার আগে চাই বাংলা ডোমেইন। আমি আমার নিজের বিজয় বাংলা ডোমেইন বাংলা হরফে লিখতে চাই। যতো দিন সেটি লিখতে পারবো না ততোদিন আমার বুকের কষ্ট বিদায় হবেনা।

লেখক: তথ্যপ্রযুক্তিবিদ