September 17, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি : নিহত ১০, নিখোঁজ ৩

কক্সবাজার প্রতিনিধি : প্রবল বর্ষণ অব্যাহত থাকায় ও পাহাড়ি ঢলের মাত্রাও বাড়ছে।  এতে কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।  ইতোমধ্যে পাহাড়ি ঢলে ভেসে গিয়ে ও বাড়ির দেয়াল ধসে এবং গাছ চাপাপড়ে নারী ও শিশুসহ মারা গেছে ১০ জন।  ভেসে গিয়ে অন্তত ৩ জন নিখোঁজ রয়েছে। পাহাড় ধসের ঘটনায় আহত হয়েছে ৭ জন।

পাহাড়ি ঢলের পানিতে জেলা সদর, রামু, চকরিয়া, পেকুয়াসহ আট উপজেলার ৫০টি ইউনিয়নের প্রায় দু’শতাধিক গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে।  এতে পানিবন্দি জীবন কাটাতে হচ্ছে অন্তত ৭ লাখ মানুষকে।  জেলার পল্লী বিদ্যুতের আওতায় থাকা অনেক স্থানে বিদ্যুতের খুটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ৮০ ভাগ এলাকায় বিচ্ছিন্ন রয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ।

জেলার লক্ষাধিক দোকানপাটে পানি ঢুকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।  রান্না ঘর জলমগ্ন থাকায় চরম বেকায়দায় পড়ছে রোজাদাররা।

রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন জানিয়েছেন, উপজেলার কচ্ছপিয়া, উখিয়ার ঘোনা, কাউয়াখোপ ও জোয়ারিয়া নালা এলাকায় ঢলের পানিতে ভেসে গিয়ে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

শুক্রবার সকাল সাড়ে নয়টায় রামুর কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের লট উখিয়ারঘোনা এলাকায় পাহাড় ধসে চাপা পড়া আমির হোসেন (৪০)’র মৃতদেহ উদ্ধার করা করা হয়।  ৪ সন্তানের জনক আমির হোসেন স্থানীয় ছমি উল্লাহর ছেলে।

বৃহষ্পতিবার রাতে পানি চলাচলের নালা কেটে দেয়ার সময় তার উপর পাহাড় ধসে পড়ে।

শুক্রবার দুপুর ২টায় রামুর কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের তিতারপাড়া এলাকায় পানিতে ডুবে প্রাণ হারান খতিজা বেগম (৩৮)।  একইদিন সকালে পানিতে ডুবে প্রাণ হারান রামু ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের দক্ষিণ দ্বীপ ফতেখাঁরকুল এলাকার জুনু মিয়া (৬০)।

শুক্রবার ভোররাত তিনটায় উপজেলার জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের মিতার ছড়া এলাকায় পাহাড় ধসে মারা যান মো. শফির ছেলে মো. রিদুয়ান (১০)।  বৃহষ্পতিবার দিবাগত রাতে রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের আমতলিয়াপাড়া গ্রামে পানিতে ডুবে প্রাণ হারান মোস্তাক আহমদের স্ত্রী হালিমা বেগম (৩০)।

বৃহষ্পতিবার সকালে রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের ক্যাজল বিল এলাকায় বন্যা কবলিতদের নিরাপদ আশ্রয়ে নেয়ার সময় নৌকাডুবিতে দুইজন নিখোঁজ হয়েছেন।  এরা হলেন, বশির আহমদের মেয়ে কামরুনাহার (২২) ও এরশাদ উল্লাহর মেয়ে তরিকা হাসনাত (৪)।

স্থানীয় ইউপি সদস্য জাফর আলম শুক্রবার বিকেল সাড়ে পাঁচটায় জানিয়েছেন, এ ঘটনার পর থেকে এখনো নিখোঁজ এ দুজনের সন্ধান পাওয়া যায়নি।  পানিতে ডুবে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে তিনি ধারণা করেছেন।

রামু উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রিয়াজ উল আলম জানিয়েছেন, প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় রামু উপজেলার গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, কাউয়ারখোপ, ফতেখাঁরকুল, রাজারকুল, দক্ষিণ মিঠাছড়ি, জোয়ারিয়ানালা, চাকমারকুল, রশিদনগর, ঈদগড় ও খুনিয়াপালং ইউনিয়নের লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।  তবে বন্যা মোকাবেলায় প্রশাসন প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এজন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (কন্ট্রোল রুম) চালু করা হয়েছে। এসব এলাকায় দুর্গত লোকজনকে শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।

শুক্রবার দুপুরে কক্সবাজার শহরের দক্ষিণ ঘোনারপাড়া এলাকার পাহাড় ধসে মো. আবছার (৩) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।  এসময় দুই শিশুসহ আহত হয়েছেন ৬ জন।  দুপুর আড়াইটার দিকে বসতঘরের উঠানে খেলা করার সময় আকষ্মিকভাবে পাহাড়ের একাংশ ধসে পড়ে।  এতে শিশু আবছারসহ ৪ জন মাটির নিচে চাপা পড়ে।

খবর পেয়ে কক্সবাজার দমকলবাহিনীর লোকজন ঘটনাস্থ থেকে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে আবছারকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।  বাকি তিন জনের নাম জানা যায়নি।

এদিকে, কক্সবাজার শহরের ফাতেরঘোনা এবং সাহিত্যিকা পল্লী এলাকায় পৃথক পাহাড় ধসের ঘটনায় জয়নাব বেগম, মো. সাগর, আব্দুল মান্নান, শিশু উম্মে উর্মিলা, শিশু ইছমত আরা ও সাহারা খাতুন আহত হয়েছে।  তাদেরকেও হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

কক্সবাজার সদর’র পিএমখালীর দক্ষিণ ডিকপাড়ায় পানিবন্দি অবস্থায় মারা গেছেন হাফেজ আহমদ (৭০) নামের এক ব্যক্তি।  তিনি শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে ভুগছিলেন।  তাই ঠান্ডাজনিত কারণে মারা গেছেন বলে ধারণা করছেন ইউপি চেয়ারম্যান আবদুর রহিম।  এছাড়া দরগাপাড়ায় পানিবন্দি বাড়ির চালা থেকে এক অজ্ঞাত নামা নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক চেয়ারম্যান প্রার্থী টিপু সোলতান।

অপরদিকে, প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে প্রবল ঝড়ো হাওয়া ও বৃষ্টিপাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শুক্রবার সকালে বয়ে যাওয়া ঝড়ো হাওয়ায় অসংখ্য গাছপালা ও ঘরবাড়ি উপড়ে গেছে। এতে নারিকেল গাছ চাপা পড়ে মারা গেছে এক মা ও শিশু।

নিহতরা হলেন, সেন্টমার্টিনের কোনারপাড়ার নুর মোহাম্মদের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (২৫) ও তাদের শিশু পুত্র মোহাম্মদ জিশান (৪)।

সেন্টমার্টিনের ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল আমিন জানিয়েছেন, শুক্রবার সকালে সেন্টমার্টিনে প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া আঘাত হানে।  এতে বহু গাছপালা, বাড়ি ঘর ও মসজিদ মাদ্রাসা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ঝড়ো হাওয়ায় নারিকেল গাছ চাপা পড়ে মা ও শিশু মারা যায়।  এতে বেশ কিছু মানুষ আহত হয়েছে।  কিন্ত দ্বীপের হাসপাতালে কোনো ডাক্তার না থাকায় আহতরা চিকিৎসা পাচ্ছেনা।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মুজিবুর রহমান জানান, টর্নেডোর আঘাতে দ্বীপের সর্বত্র কম-বেশী ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে।  তবে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ৬ ও ৮নং ওয়ার্ড এলাকা। চকিদার ইসমাইলের বাসাবাড়িসহ বিধ্বসত হয়েছে অসংখ্য বসতঘর। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মসজিদ-মাদ্রাসা।  ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় এখনও অসংখ্য বাড়ি পানির নীচে রয়েছে।

তিনি আরো জানান, গত প্রায় ১ সপ্তাহ অবিরাম বর্ষণ ও দুর্যোগপুর্ণ আবহাওয়ায় টেকনাফ-সেন্টমার্টিনদ্বীপ নৌপথে ট্রলার চলাচল বন্ধ থাকায় দ্বীপে খাদ্য সংকট দেখা দিচ্ছে।  তার উপর টর্নেডোর আঘাত সেন্টমার্টিনদ্বীপ বাসিকে চতুর্মুখী সমস্যায় ফেলেছে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাহিদ ইকবাল অভিযান চালিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে অতি ঝুঁকিতে বসবাসকারী ১২০ পরিবারকে নিরাপদে সরিয়ে দিয়েছে।  ভারী বর্ষণে পাহাড় ধসের ঘটনা এড়াতে আরও দু’শতাধিক পরিবারকে নিরাপদে সরে যেতে বলা হয়েছে।

সরিয়ে দেয়া পরিবারগুলোকে নিকটস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার ব্যবস্থা নেয়া হলেও তারা নিজ নিজ আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে চলে গেছে বলে জানান ইউএনও।

এরআগে ভারী বর্ষণে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় পৌরসভার ফকিরামুরা এলাকায় উপজেলা প্রশাসন, বনবিভাগ এবং স্ব স্ব ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে বুধবার রাত ৯টা পর্যন্ত মাইকিংয়ের মাধ্যমে সতর্ক ও সরে যেতে বলা হয়।

কক্সবাজার সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আবু তালেব জানিয়েছেন, স্মরণকালের ভয়াবহ দুর্ভোগে রয়েছে সদরের ১০ ইউনিয়নের মানুষ।  অতিবর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নের বিস্তৃর্ণ এলাকা। ঢলের পানির তোড়ে বাঁশঘাটা এলাকার ব্রিজটি মাঝখান দিয়ে ধসে গেছে।  ভোমরিয়াঘোনা এলাকায় ঈদগাঁও-ঈদগড় সড়ক ভেঙে পানি ঢুকে ভেঙে গেছে ভাদিতলা এলাকা সড়কসহ একাধিক উপসড়ক।  পানিবন্দি হয়ে আছে শত শত বাড়িঘর। অনেক বাড়িতে পানি ঢুকে বন্ধ রয়েছে রান্না-বান্না।

এছাড়াও, পোকখালী ছমিউদ্দীন পাড়া, আলফজল পাড়া, পূর্ব পোকখালী, পশ্চিম পোকখালী, মধ্যম পোকখালী, পশ্চিম ইছাখালী, ঘাটঘর ও চৌফলদন্ডীর কালু ফকির পাড়া, খামার পাড়া, দক্ষিণ পাড়া, উত্তর পাড়া, রাখাইন পাড়া, পশ্চিম রাখাইন পাড়াসহ একাধিক এলাকা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে।

সদর ইউএনও শহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, পরিস্থিতি সম্পর্কে জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণসহ যাবতীয় সহযোগিতা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

চকরিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জাফর আলম জানিয়েছেন, উপজেলার কাকারা ইউনিয়নে শুক্রবার দুপুরে কাউসাঈন করিম (১৪) নামে এক কিশোর ঢলের পানিতে ভেসে গেছে।  শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি নিখোঁজ ছিল।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফুর রশিদ খান জানান, পাউবোর বেড়িবাঁধ ভাঙন সম্পর্কে জেলা প্রশাসককে বলা হয়েছে।

শুক্রবার বিকেলে দূর্যোগ পরবর্তী সময়ে করণীয় বিষয়ক প্রস্তুতিমূলক একসভা জেলা প্রশাসক সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সভায় ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক ড. অনুপম সাহা জানিয়েছেন, জেলার  সদর, রামু , চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার ২০টি ইউনিয়ন  টানা বর্ষণ ও পাহাড়ী ঢলে প্লাবিত হয়েছে। অবিরাম বর্ষণে পানি বন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় সাত লাখ মানুষ। দূগতদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌছে দেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস সূত্র জানায়, শুক্রবার সকাল ৬টা হতে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত ২৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।  কক্সবাজারে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে বলে সূত্র উল্লেখ করেন।

সূত্র আরো জানায়, মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে কক্সবাজারে দমকাসহ ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।