September 18, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

ক্রিকেট কী দুখ ভারী কাহানী

মাসকাওয়াথ আহসান : প্রথম ম্যাচটা হারার পর ধোনীর একটা ঝটকা লাগে। একবার চিমটি দিয়ে দেখে দুঃস্বপ্ন নয়তো। বিহারের রাজপুত সে। জীবনে ফাঁকি দিয়ে এ পর্যন্ত আসেনি সে। যে দলকে সে বিশ্বচ্যাম্পিয়ান করেছে; শচীনের বিদায়ী বিশ্বকাপে তার স্বপ্ন পূরণ করেছে; সেই দলটি এমন বাংলাদেশ ঝড়ে উড়ে গেলো। মুস্তাফিজ নামের ১৯ বছর বয়েসের একটা ছেলে কী দেবদূতের মত হাত যা স্মিত মুখে খেয়ে নেয় শর্মা; মানে শর্মার উইকেট। কোহলির মত দাপুটে ব্যাটসম্যানকে কী এক জাদুকরী কুলি করে ফেলে দেয়।
রায়না ড্রেসিং রুম-এর আয়নায় নিজের মুখ খানা দেখে বলে, মুঝে নফরত হ্যায় তুমছে রায়না; এ জ্বালা আর প্রাণে সয়না।
মা’র ফোন আসে, বেটা ঘাবড়াও মাত; আউর ম্যাচ হ্যায়না। ইয়ে কামাল কা টিম হ্যায়, মুশফিক এক সুইট লাডলা। ও খেলতে হ্যায়; তুমহারি তারা জাং নেহি লড়তে। বেটা এ এক মামুলি খেল হ্যায়; জাং নেহি হ্যায়।
রায়না ফোনের লাইনটা কেটে দেয়। এখন মায়েরও মুশফিককে কিউট লাগছে। আমি যেন কেউ নই। নিক মুশফিককেই ছেলে বানিয়ে নিক। আমি থাকবো না আর ও বাসায়।
হোটেলে ফিরে কোহলি ফোন করে আনুষ্কাকে। ফোন ধরেনা। মেয়েদের আজকাল যত বড় বড় ডিজাইনার ব্যাগের ব্যারাম; সেই সমুদ্র থেকে ফোন খুঁজে পাওয়াও কঠিন। রুম সার্ভিসের এক ছেলে বলে, স্যার মে আই সার্ভ ইওর ডিনার।
–আই এম নট ফিলিং হাংরি ইনাফ।
–নো প্রবলেম। ফিল ফ্রি টু কল মি। ক্ষুধা লাগলেই ফোন দেবেন।
–ভুখ নেহি লাগেগা; মেরা ভুখ খাতাম হো গ্যায়ি।
এবার ছেলেটা মুচকি হেসে ফেলে।
–ইটস জাস্ট আ ম্যাচ কোহলীজী। টেক ইট ইজি।
–ক্যায়সে; ক্যায়সে। ইয়ে ক্যায়সে হো সাক্তা।
এমন সময় আনষ্কার ফোন আসে।
–সরি কুঁহু আমি ফেসবুকে ব্যস্ত ছিলাম। তুমি বাজে খেলবা; আর ট্রলিং সামলাতে হয় আমাকে। আগে জানলে আমি এই ফ্লপ এফেয়ারে জড়াতাম না।
–ফিল ফ্রি টু লিভ মি এনি টাইম। আই ডোণ্ট নিড স্প্রিং বার্ডস।
–কী আমারে বসন্তের কোকিল কইলা; তুমহারা এ যো লুজার সিনড্রোম হ্যায়না; ওহি তুমে খা যাতে। আজ তুমহে এক কিউট সি টাইগার খা গ্যায়া।
–তোমাকে খুব খুশী খুশী লাগতেছে; হ্যাভ ইউ স্টার্টেড এনজয়িং মাই ফেইলিওর। নিজের ক্যারিয়ার ভালো যাচ্ছে; তাই দেমাগ দ্যাখাও। রাখি এখন।
–রাখবা ক্যানো; ম্যাচ হারার বিনিময়ে ঝগড়া রুটিন শেষ করো। এইতো চলতেছে। আমি বলেই টিকে আছি।
–তো এরজন্য কী তোমাকে পূজা করতে হবে। তুমি আমার জীবনে আসার পর থেকেই এই শনির দশা; খালি উইকেট পড়ে যায়। তুমি একটা ‘মাঙ্গলিক’।
–হাউ ডেয়ার ইউ সে দ্যাট। আজ আমি স্বামীজীর কাছে গিয়ে তোমার জন্য ভগবানের কাছে ফোন করিয়েছিলাম। আর আমাকে এও শুনতে হলো আমি মাঙ্গলিক। রাখি ফোন। আর কথা কইতে ইচ্ছা করেনা।
টেলিফোনের ওপারে ফোঁস ফোঁস শোনা যায়।
–স্বামীজী কা কল রঙ নাম্বারমে গ্যায়া। আমি কী করবো!
কোহলি কিছুক্ষণ হ্যালো হ্যালো করার পর বোঝে আনুষ্কা লাইন কেটে দিয়েছে। এক গ্লাস পানি খায়। চোখ দুটো লাল। কান্নাগুলো রক্তের রঙ নিয়েছে যেন। হোটেলের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখে পথে বিজয় মিছিল হচ্ছে, জয় বাংলা।
এসময় হাতে একটা বিয়ারের ক্যান নিয়ে হাজির হয় ধারাভাষ্যকার ভোগলে; বেশ টিপসী।
–এহ কোহলী মেরে ভাই; ইজ্জত বাঁচানো চাই। এরপরের ম্যাচ জিততেই হবে। তোমরা ভালো খেলো; আমি তাই দুটো করে খাই। আমার ব্যবসার পেটে লাথি মেরো না ভায়া।
সোফায় বসতে গিয়ে কার্পেটে জুতা আটকে পড়তে পড়তে তাল সামলে সোফায় গিয়ে বসে।
–বাংলাদেশ  এরকম খেললে শামীম, আতাহার আলী এরা কমেন্ট্রিতে রেগুলার হয়ে যাবে। পরে এক্স ক্রিকেটার লিপু এসে পড়লে আরো বিপদ, আমার আর সঞ্জয় মাঞ্জেকারের পজিশনটা নড়বড়ে হয়ে যাবে। একটু দেখো ভায়া।
–কী দেখবো বলেন। মুস্তাফিজের বল বুঝিনা। আর আমার রাইট সাইডের উইক পয়েন্টেই সবাই বল করে।
দ্বিতীয় ম্যাচে হারার পর হোটেলে ভোগলেদার কক্ষে গণক্রন্দন আয়োজিত হয়। এমন সময় রমিজ রাজার ফোন আসে।
–আবে ইয়ার ইয়ে কীয়া কিয়া! পাকিস্তানতো বেস্ট এইট সে গায়েব হো গ্যায়া; মেরা তো কন্ট্রাক্ট রিনিউ নেহি হোগা। ভোগলে এ কীয়া হুয়া!
–ভাইসাব সাব কুচ খো গ্যায়ি। বাংলা হাম লোগোকো কাঙ্গাল কারকে ছাড়া। রাস্তায় নাবিয়ে দিলো দাদা।
–এট লিস্ট ট্রাই টু এভয়েড বাংলা ওয়াশ।
–লাভ কী! পাকিস্তান আসছিল সবুজ জার্সি পইরা। ধোলাইয়ের পর সাদা ড্রেসে ফেরত গেছে। আর ভারত আসছিলো নীল জার্সি পরে। বুক পর্যন্ত ধোলাইয়ে সাদা। উপরে কলার পর্যন্ত নীল। এ দেখতে কেমন লাগে বলুন।
অশ্বিন পুল সাইডে বসে একা একা হাত ঘুরায়। তার মনের মধ্যে আহা ঐ বলটা যদি এইভাবে করতাম; ইস এই বলটা যদি ঐভাবে করতাম। এমন সময় তার কাছে পাকিস্তানের হাফিজের ফোন আসে, হ্যালো অশ্বিনদা; বাংলাদেশের সঙ্গে আর পারা যাবেনা। আমার একটা নতুন আইডিয়া আসছে মাথায়।
–কী আইডিয়া প্রফেসর!
–আমরা কেনিয়া-জিম্বাবুয়ের সঙ্গে বেশী বেশী খেলে কনফিডেন্স ধরে রাখতে পারি। জাপান-জার্মানী এসব দেশকে ক্রিকেটে উতসাহিত করতে পারি। যেইসব দেশ ক্রিকেট বোঝেনা ঐখানে মার্কেট খুঁজতে হবে। এ সামাঝ নে কী বাত হ্যায় অশ্বিনদা।
–দেখি ফিরে গিয়ে বোর্ডের সামনে প্রস্তাবটা তুলবো। তুমিও ঐদিকে কথাটা তোলো; এটা পাক-ভারত যৌথ প্রকল্প হলেই ভালো। এইদিকেই আসলেই আর কিছু করার নাই। কীসের অশ্বিন ঘূর্ণি-সাকিব পাত্তাই দেয়না; তামিম দানব হয়ে ওঠে; সাব্বির অনায়াসে চার মারে। করি কী!
হাফিজ হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে, বাংলাওয়াশের পর থেকে আমার আর রাতে ঘুম হয়না অশ্বিনদা। তুমি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। রাত জেগে জেগে আতিফ আসলামের গান শোনা খুব কষ্টের কাজ।
ধোনীর পিছে লেগেছে ইন্ডিয়ান মিডিয়া। ডায়েরিয়া রোগীর মত উইকেট পড়ে ইন্ডিয়ার; আর যত দোষ; ধোনী ঘোষ।
ধোনী ইন্ডিয়ান কিছু চ্যানেলের চাটখারি রিপোর্ট দেখে। ধোনীকে রাতারাতি গণশত্রু করে তোলাই ওদের কাজ। ধোনীর ইচ্ছা করে ট্রয়ের ঘোড়ার মাঝে লুকিয়ে রাখা মুস্তাফিজের বলের সামনে ইন্ডিয়ান স্পোর্টস রিপোর্টারগুলোকে দাঁড় করিয়ে দিতে। ধোনীর স্ত্রীর ফোন আসে, আর এস এস-এর পান্ডারা আমাদের বাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে হেইট স্পীচ দিচ্ছে। আমি কটা দিনের জন্য ড্যাডির বাসায় যাচ্ছি। ওদের চিতকারে বাচ্চাটার বারবার ঘুম ভেঙ্গে যায়।
ধোনীর মনে হয় এরা নেমক হারামের জাত। ওয়ার্ল্ড কাপ এনে দিলাম ফুল ছুড়লো; আজ বাংলাদেশের কাছে সিরিজ হেরেছি তাই পাথর ছুঁড়ছে।
এমন সময় রিসেপশান থেকে ফোন আসে। মাশরাফি এসেছে মুস্তাফিজকে নিয়ে। ধোনীই ফোন করে মাশরাফিকে অনুরোধ করেছিলো। অর্ধেক বয়েসের একটা ছেলের সঙ্গে ধাক্কাকান্ড নিয়ে কোন তিক্ততা রেখে যাওয়া ঠিক নয়। মুস্তাফিজ ছোট করে বলে, ভুলটা আমারই হয়েছে।
ধোনী হেসে বলে, ভুলটা আমারো; আমি একটু পাশ কাটিয়ে রানটা নেয়া উচিত ছিলো; খুব টেনশড ছিলাম। তোমার বল তো বুঝিনা।
মাশরাফি মুচকি হাসে।
–আমরা ক্রিকেটারদের মাঝে কোন তিক্ততা রাখতে চাইনা। স্পোর্টসম্যান স্পিরিটটাইতো খেলার আসল জিনিস। ধোনী জড়িয়ে ধরে মুস্তাফিজকে।
এরমধ্যে আরেক ঘটনা ঘটে যায়। ভারতের ক্রিকেট ফ্যান সুবীরকে স্টেডিয়াম থেকে বের হবার সময় বুলি করে কিছু বেঙ্গল গোট।
এরপর কিছু স্যুডো ইন্টেলেকচুয়াল চলে আসে ডিনাইয়ালের ডাইল নিয়ে। ‘ইহা মিডিয়ার সৃষ্টি’। সুবীরকে কেউ কিছুই করে নাই। এইডা ইন্ডিয়ান মিডিয়ার ষড়যন্ত্র। বাংলাদেশের মিডিয়ায়, রিপোর্টার গিয়ে সুবীরকে জিজ্ঞেস করে, আপনাকে নাকি হামলা করেছে; তো এতো ফ্রেশ দেখাচ্ছে কেন? রিপোর্টার থানার দারোগা বা সচিবালয়ের কেরানীর মত ধমক দিয়ে সুবীরকে দিয়ে বলিয়ে নেয়, তাকে এসে অতিথি পরায়ণ বেঙ্গল গোটস চুম্মা দিয়ে গেছে।
বিসিবি প্রেসিডেন্ট পাপন দ্রুত ব্যবস্থা নেন। উনি চুপচাপ মানুষ। খুব ভালোভাবেই বোঝেন কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। চারজন পুলিশ কনস্টেবল সুবীরের সঙ্গে নিরাপত্তার জন্য দেবার ব্যবস্থা করেন।
ভারতের অধিনায়ক ধোনীর কাছে খবর পাঠান, এভাবে দিনের পর দিন অনশন করে শরীর খারাপ হবে। সেহেরীতে ভালো খাবার ব্যবস্থা থাকছে সবাই যেন খেয়ে নেয়।
ভারতীয় ক্রিকেটার বিনির হোটেলের লিফটে দেখা হয় বাংলাদেশ দলের কোচ হাতুরেসিঙ্গের সঙ্গে। হঠাত তার মনে হয় লোকটা একটা সিং হের পিঠে হাতুড়ি নিয়ে বসে। হাতুরেদা হাসেন, হ্যালো বিনি।
বিনি লিফট থেকে বেরিয়ে দৌড়ে পালায়।
সিরিজ জিতে লোটাস কামাল ভারতের ক্রিকেটের অমরেশপুরী শ্রীনিবাসনকে ফোন করেন।
–শ্রীনিজী বাংলাদেশ টিমতো আপনার চমতকার(!) করে দিলে। আলিমদ্বার আর গোল্ডদ্বার ঐ দুইটারে পাঠাইলে পারতেন। ১৩ জন হইলে আপনার দলের খেলে সুবিধা।
ওপাশে শ্রীনিজীর গোঙ্গানীর শব্দ আসে।
তৃতীয় ম্যাচ জেতার পর ভারত টিমের সবাই খুশী হয়। শুধু খুশী হতে পারেনা ধোনী। মনের মধ্যে খচখচ করে। বাংলাদেশের ক্রিকেটার সৌম্যকে জিজ্ঞেস করে, হোয়াট ইজ দ্য সিক্রেট অফ ইওর রাইজিং।
–ধোনীদা; আমাদের এই বাংলাদেশের বাবা-মায়েরা ছেলের জানের ওপর ওঠেনা; তোমাকে ফার্স্ট হতে হবে। অথচ আপনার দেশের বাবা-মা ছেলেদের রেসের ঘোড়া মনে করে। আমরা আনন্দের জন্য খেলি দাদা; আমরা যুদ্ধ করিনা। অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষের ভাইরাসটা এদেশে নেই।
প্লেনের চাকা যখন বাংলাদেশের রানওয়ে শেষবার স্পর্শ করে উড়াল দেয়, ধোনীর বার বার মনে পড়ে মাশরাফির কথা। সে কারো সঙ্গে হ্যান্ডশেক করার সময় বামহাত দিয়ে মাথার ক্যাপটা একটু খোলার ভঙ্গী করে। জেন্টলমেন্স গেম। সো কার্টেসী উইনস।