October 22, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

আবুল হোসেন : একজন সমৃদ্ধমান কবি

সৈয়দ আলী আহসান

[চল্লিশের দশকের অন্যতম কবি আবুল হোসেনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী ২৮ জুন, রবিবার। তারই সমকালের কবি ও সমালোচক সৈয়দ আলী আহসান। বাংলাদেশে শিল্প-চিন্তা, কবি ও কবিতা নিয়ে তার বিবেচনাবোধ আজও গভীর তাৎপর্যময়। সে কারণে গুরুত্ব বিবেচনায় এই নিবন্ধটি পত্রস্থ করা হল]

কাব্যভাষা কী হবে তা নিয়ে অনেক চিন্তা অনেক কবিই করেছেন। আধুনিককালে অর্থাৎ বিংশ শতকের শুরুতে এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা হয় ইংল্যান্ডে এবং ফ্রান্সে। ইংল্যান্ডের কবিদের মধ্যে এজরা পাউন্ড এবং টিএস ইলিয়ট এ সমস্যার সমাধান করেন এভাবে— বস্তুকে অথবা বিবেককে অথবা ব্যক্তিকে উপস্থাপনার জন্য যে শব্দটি অপরিহার্য একমাত্র সে শব্দটি কবিতায় ব্যবহার করতে হবে। এ অপরিহার্যতা শব্দটি সাধারণ পাঠকের কাছে সমস্যার সৃষ্টি করলেও ইংল্যান্ডের কবি সম্প্রদায় এর একটি সিদ্ধান্ত নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বুদ্ধি এবং আবেগের জটিলতা একটি মুহূর্তে সমস্বরে উচ্চকিত করাকে তারা তাদের দায়িত্ব বলে বিবেচনা করেছিলেন। এভাবেই এক ধরনের ইমেজ নির্মাণের প্রক্রিয়া গড়ে ওঠে। এ পথে অগ্রসর হয়ে তারা কবিতার শব্দ সংগ্রহ করলেন প্রতিদিনকার জীবন থেকে, আবার একই সঙ্গে অতীতের সংবেদন থেকে। এ প্রচেষ্টার ফলে গদ্যের কথা এবং পদ্যের কথার মধ্যে কোনো ব্যবধান তার স্বীকার করলেন না। প্রথাগত ছন্দ থেকে মুক্তি ঘটল, এতদিনকার গৃহীত পদ্ধতিকে অপসারণ করে তারা কথাবার্তার পদ্ধতিকে গ্রহণ করলেন। ফলে কবিতার চরণ-বিন্যাস অনিয়মিত হল, শব্দ সাজানোর অন্বয়ের পরিবর্তন ঘটল। কখনো কখনো এ কারণে জটিলতাও এলো, আবার কখনো কখনো সহজ সম্পাদ্য তরলতাও এলো। আধুনিক বাংলা কবিতায় যারা ইংল্যান্ডের আধুনিক কাব্যস্বভাবের বিবর্তনকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে বিষ্ণু দে, অমীয় চক্রবর্তী ও বুদ্ধদেব বসুর নাম আমি উল্লেখ করছি। এদের কবিতায় ইংল্যান্ডের কাব্য প্রক্রিয়ার অনুসৃততা অত্যন্ত তরলও ব্যাপক ছিল। বুদ্ধদেব বসু তার ‘নতুন পাতা’ কাব্যগ্রন্থে অনিয়মিত চরণ-বিন্যাসে, কথোপকথনের গদ্যে এবং ছন্দের নিরঙ্কুশ সহায়তাকে অগ্রাহ্য করে বাংলা কবিতায় নতুন ভঙ্গির প্রবর্তন করেন। তার এ ভঙ্গি অনেক সময় অত্যন্ত তরল হয়েছে। যার ফলে কখনো কখনো কবিতায় ব্যহৃত অনেক পূর্ণ বাক্য বা বাক্যাংশ কবিতা বলে মনে হয় না। সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধদেব বসুর একটি বিরাট দুর্বলতাও তার কবিতাগুলোকে তীক্ষ্ণধী করতে পারেনি। আধুনিককালে টিএস ইলিয়ট যেখানে সেন্টিমেন্টালিটিকে আবেগের পরাজয় বিবেচনা করেছেন, সেই সেন্টিমেন্টই ছিল বুদ্ধদেব বসুর কবিতার রসাবেগের মূল লক্ষ্য। এ ধারায় অগ্রসর হয়েও একটি স্বতন্ত্র পথ-পরিক্রমায় আবুল হোসেনের কাব্য রচনার সূত্রপাত।

চল্লিশের দশকের কবিদের মধ্যে যারা সাম্প্রতিক আঙ্গিককে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করে আপন স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন তাদের মধ্যে আবুল হোসেন একজন। ফররুখ আহমদ সাম্প্রতিক চলিত ভঙ্গিকে গ্রহণ করেননি, আহসান হাবীবও নয়। ফররুখের কবিতার পৃথিবী এবং আহসান হাবীবের কবিতার পৃথিবী আবুল হোসেনের কবিতার পৃথিবী থেকে ভিন্নতর। তারাও নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যে বিশিষ্ট ছিলেন, কিন্তু আবুল হোসেনের বিশিষ্টতা এক অন্য রকম। বাংলা কবিতায় কথোপকথনের যে ধারাক্রম আবুল হোসেন সেই ধারাক্রমকে গ্রহণ করবার চেষ্টা করেছিলেন। বাংলা কবিতার উচ্ছ্বাস, আবেগ এবং উচ্চসুরকে কৌশলের সঙ্গে পরিহার করে আবুল হোসেন আধুনিককালের সময় সচেতনতায় আপন কবিতাকে উন্মুখর করেছিলেন। আবুল হোসেনের ‘বাংলার মেয়ে’ কবিতাটি যখন কবিতা পত্রিকায় প্রকাশ পায় রচনা রীতির স্বাতন্ত্র্যে তা অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আমাদের প্রতিদিনকার জীবনের ঘরোয়া শব্দগুলো একটি সহজ, নিরাভরণ নিঃসংশয়ে এখানে আত্মপ্রকাশ করেছে। কিছু অতিকথন ছিল যা এ ধরনের ভঙ্গি নির্মাণের জন্য প্রায় অপরিহার্য বলা চলে। আবুল হোসেন ছন্দকে এবং কাব্যকে তৎকালীন কবিতা রচনার প্রথা থেকে শিথিল করে একটি অনিরূপিত ভঙ্গিতে উপস্থিত করেন।

একজন বিদেশী কবির কবিতায় পড়েছিলাম : what does not change is the will to change. এ পৃথিবীতে পরিবর্তন করবার ইচ্ছার অর্থাৎ প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের যে বাসনা আমাদের চিত্তে জাগে সে বাসনারই বিবিধ রূপকল্প আমরা কবিতায় নির্মাণ করি। আবুল হোসেন ‘নব বসন্ত’ কাব্যগ্রন্থে এ বাসনার কিছু ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। নব যৌবনকালের এক সুপ্রত্যক্ষ দুঃসাহসের পরিচয়লিপি নিয়ে ‘নব বসন্ত’ আজও অম্লান।

আবুল হোসেন ‘নব বসন্তের’ পরে তাৎপর্যবহ আরও দুটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন ‘বিরস সংলাপ’ অন্যটির নাম ‘হাওয়া তোমার কি দুঃসাহস’। উভয় কাব্যগ্রন্থেই কথা বাকভঙ্গির আভরণে, তির্যক ব্যঙ্গোক্তিতে এবং নাটকীয় পরিবেশনায়, অসাধারণত্ব অর্জন করেছে। কথ্য বাচনভঙ্গিকে বক্তব্যের দায়ভাগে বন্দী করা অত্যন্ত কঠিন কিন্তু এ কঠিন কর্মে আবুল হোসেন কৃতকার্য হয়েছে। তাছাড়া সমকালীন জ্বালা-যন্ত্রণা, মানুষের অসহায়তা এবং বিক্ষুব্ধ কর্মের শাসন এ কাব্যগ্রন্থ দুটির মধ্যে ছড়িয়ে আছে। আরও একটি কথা আবুল হোসেনের এ কাব্যগ্রন্থ দুটি সম্পর্কে বলা যায়- তা হল তার আপন গৃহের সঙ্গে মৈত্রীবন্ধন এখানকার কবিতাগুলোকে তা প্রাণময় করেছে। এই যে গৃহগত সৌজন্যতার উল্লেখ একটি কবিতায় সুন্দরভাবে আছে, যেখানকার কথাগুলো আবুল হোসেনের সব সময়ের কথা :

‘তবু যদি পাই ফিরে আসবার
সুযোগ কখনও আর একবার
কিছুই নতুন চাইবো না আর।
বেছে নেব এই জীবন আবার।’

বাংলা কবিতায় চলিলত ভঙ্গির অসাধারণ প্রকাশ ক্ষমতার পরিচয় প্রকাশ করেন সর্ব প্রথম দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। প্রাত্যহিক নাগরিক বৃত্তের মধ্যে শব্দকে যে কত চতুরতা এবং কৌতুকের সঙ্গে প্রকাশ করা যায় তার অপূর্ব দৃষ্টান্ত দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘আষাঢ়ে’ কাব্যগ্রন্থটি। কথোপকথনের দ্রুতলয়ে এবং হাস্যকৌতুকের অভাবনীয় সংরাগে প্রতিটি কবিতা পাঠকের কাছে নতুন আনন্দ নিয়ে আসে। মানুষের কর্মক্ষেত্রের বৈচিত্র্য এবং কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন পেশাজীবীর দ্বন্দ্ব হাস্যরসের অনুকূল উল্লাসে প্রকাশিত হয়েছে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় কবিতার মধ্যে গদ্যভঙ্গির যে গতি এনেছিলেন তার সাহায্যে হাস্যরসের প্রকাশটি স্বাভাবিক এবং সজীব হয়েছে।

দ্বিজেন্দ্রলালের পর যিনি একাগ্র নিষ্ঠার সঙ্গে কবিতায় চলিত ভঙ্গির পরীক্ষা করেন তিনি প্রমথ চৌধুরী। প্রমথ চৌধুরী তার জীবনের কার্যক্রম অত্যন্ত পণ্ডিত এবং শাণিত বুদ্ধির অধিকারী ছিলেন। বাংলা সাহিত্য ভাষার চলিত ও সাধু এ দুটি ভঙ্গিকে একটি ভঙ্গিতে রূপান্তরিত করবার যিনি প্রয়াস পেয়েছিলেন তিনি প্রমথ চৌধুরী। তিনি গদ্য এবং পদ্য উভয় ক্ষেত্রে চলিত ভঙ্গির সাহায্যে প্রাখর্য এনেছিলেন এবং আমরা জানি যে রবীন্দ্রনাথকে চলিত ভঙ্গিতে দীক্ষিত করার প্রথম প্রয়াস তিনিই করেছিলেন। তার ‘সনেট পঞ্চাশ্য’ কাব্যগ্রন্থে চলিত ভঙ্গির পরীক্ষা অপূর্ব অন্বয়ে আমাদের সামনে পরিস্ফুটিত হয়েছে। প্রমথ চৌধুরী ছিলেন বুদ্ধিদীপ্ত সম্ভ্রান্ত নাগরিক। তার এই নাগরিক হর্ষ, চতুরতা এবং ব্যঙ্গ তার সনেটগুলোর মধ্যে ধরা পড়েছে। নাগরিক সম্ভ্রমবোধ এবং অনেক উঁচুমানের বৈদগ্ধ বাংলা সাহিত্য ক্ষেত্রে প্রমথ চৌধুরীকে একটি স্বতন্ত্র রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

রবীন্দ্রনাথকে আমরা এ আলোচনায় আনছি না, কারণ রবীন্দ্রনাথ তার নিজস্ব সত্তায় এমন এক ভূখণ্ডের পরিব্রাজক ছিলেন যেখানে শব্দগুলো সম্ভ্রম এবং শুচিতার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। চলিত বাগবিধির মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ক্রিয়াপদের পরিবর্তন ঘটিয়েছেন মাত্র। এ পরিবর্তনটা অনেকটা আনুষ্ঠানিকতার মতো। তিরিশের দশকে এসেই এ আনুষ্ঠানিকতা বাংলা কবিতার একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তিতে পরিণত হয়। এ সময়কার কবিরা কবিতার ভঙ্গির নানাবিধ পরীক্ষায় ব্যাপৃত ছিল। এদের মধ্যে একমাত্র বিষ্ণু দে-ই চলিত ভঙ্গির তাৎপর্য বুঝতে পেরেছিলেন বলে আমাদের মনে হয়।

সে সময় বুদ্ধদেব বসু তার ‘নতুন পাতা’য় নিষ্কপট গদ্যভঙ্গির পরীক্ষা করেন এ কথা আমরা পূর্বেই বলেছি। তার ‘কবিতা’ পত্রিকায় তিনি এ ভঙ্গিকে সমর্থন জানিয়েছিলেন এবং তার পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের আবির্ভাব। আবুল হোসেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সমসাময়িক। কিন্তু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আবুল হোসেনের পার্থক্য এখানে যে সুভাষ মুখোপাধ্যায় কর্মের দায়ভাগে মানুষের যে শ্রেণী বিভক্তি আছে সেখানকার নিম্নশ্রেণীর মানুষের কণ্ঠস্বর কবিতায় আনতে পেরেছেন, যা আবুল হোসেনের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তবু আবুল হোসেন বাংলাদেশের কবিতার ধারাক্রমের মধ্যে একজন সমৃদ্ধমান কবি— এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।