December 6, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

যানজটে মহাদুর্ভোগ, হেঁটেই গন্তব্যে রাজধানীবাসী

নিজস্ব প্রতিবেদক : রবিবার দুপুর পৌনে ১২টা। মতিঝিলের বেসরকারি একটি অফিসের কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন ও ফরিদুল ইসলাম অফিসের কাজে রাজধানীর বনানীতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে আবার ফিরছিলেন মতিঝিলে। ঘণ্টাখানেকেরও বেশি সময় অপেক্ষা করে বাস পেলেন না তারা। হেঁটেই মহাখালীতে পৌঁছলেন। এর পর বাসে উঠলেন দু’জনেই। কিন্তু দু-এক মিনিট যাওয়ার থমকে দাঁড়াল বাস। মহাখালী থেকে বিজয় সরণি পার হতে প্রায় সোয়া ঘণ্টা সময় পেরিয়ে গেল। রাস্তায় থমকে আছে শত শত বাস-প্রাইভেটকার। যেদিকে চোখ যায়— শুধু গাড়ি আর গাড়ি। এর পর রাগে-ক্ষোভে বিরক্ত হয়ে নেমে পড়লেন দু’জনেই। হেঁটে ফার্মগেট পর্যন্ত এলেন দু’জনে।

রাস্তার অবস্থা বিবেচনায় এনে ফরিদুল ইসলাম হেঁটেই মতিঝিল অফিসে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। ফার্মগেট হয়ে কারওয়ান বাজার, এফডিসি, মগবাজার, মিন্টু রোড হয়ে সোজা মতিঝিলে পৌঁছতে সময় লাগল তার দেড় ঘণ্টার মতো। কিন্তু তার সহকর্মী শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় ফার্মগেট থেকে আবার বাসে উঠলেন। দীর্ঘ যানজট ঠেলে ফরিদুলের চেয়ে প্রায় এক ঘণ্টা পরে অফিসে এলেন তোফাজ্জল।

তোফাজ্জল হোসেন, ফার্মগেট থেকে কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর ও মৎস্য ভবনের মোড়ে বড় ধরনের জ্যামে পড়েছি। শারীরিকভাবে অসুস্থ হওয়ায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আর বাস থেকে নামিনি। তবে এই সময়ে বাস থেকে অনেকে নেমে গন্তব্যের উদ্দেশে হেঁটে গেছেন।

রাজধানীর মিরপুর-২ নম্বরের বাসিন্দা আবু সালেহ। দীর্ঘ প্রায় ৬ বছর ধরে ওই এলাকা থেকে পল্টনে অফিস করেন তিনি। রমজানে সকাল সাড়ে ৯টায় অফিস হওয়ায় সাড়ে ৭টার দিকেই বাসা থেকে বের হন তিনি। কারণ একটু এদিক-সেদিক হলেই জ্যামে আটকে অফিসে যেতে দেরি হবে তার। তাই অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে একটু আগেভাগেই বাসা থেকে বের হন। তিনি বলেন, ‘তিন-চার বছর আগে মিরপুর থেকে মতিঝিল বা পল্টনে আসতে এক ঘণ্টার বেশি সময় লাগত না। কিন্তু এখন? ভাগ্য ভাল থাকলে দেড় ঘণ্টা আর যদি ধরা খাই (জ্যাম লাগে) তাহলে গন্তব্যে কখন পৌঁছনো যাবে তা বলা মুশকিল।’

আবু সালেহ বলেন, ‘রবিবার অফিস থেকে সোয়া ৪টার দিকে বের হয়ে বাসায় পৌঁছেছি ইফতারের পরে। রাস্তায় ইফতার করতে হয়েছে।’

রাজধানীতে যানজটের চিত্র নতুন নয়, নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। মাঝেমধ্যে ট্রাফিক জ্যাম এমন অবস্থায় দাঁড়ায় যে, রাস্তায় দীর্ঘ সময় রোগীবাহী এ্যাম্বুলেন্স করুণ সুরে সাইরেন বাজালেও কিছুই করার থাকে না কারও। আগে এ্যাম্বুলেন্সের শব্দ শুনে মানবিক কারণে জায়গা করে দিতেন পথচারী, বাসের ড্রাইভার বা ট্রাফিক পুলিশ। এখন মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর রোগীর জন্য কারও কারও মায়া হলেও কিছুই করার থাকে না। কারণ যানজটের ধরনটা এখন এমন হয়েছে যে, ইচ্ছা করলে ওই এ্যাম্বুলেন্সটিকে বের করে দেওয়ার সুযোগ থাকে না। যানজট নামক এই মহাঅশান্তিতে পড়ে তাই অনেকের মুখে শোনা যায়— ‘এই নগর বসবাসের অনুপযোগী। এখানে আর থাকা যায় না।’

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকায় যানজটের সমস্যা নতুন নয়। প্রায় দুই কোটি মানুষের নগরী এই ঢাকাতে যানজট প্রতিদিনের চিরচেনা ঘটনা। যানজট নিরসনে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে অতীতে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। সদ্যসমাপ্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগেও মেয়রপ্রার্থীদের কণ্ঠে যানজট নিরসনের প্রতিশ্রুতি শোনা গিয়েছিল। কিন্তু দুই মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতির একচুলও ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি। রমজান শুরু হওয়ার পর যানজটের মাত্রা আরও বেড়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকছেন মানুষ। ভোগান্তির যেন শেষ নেই তাদের। হাঁফিয়ে উঠছে নারী-শিশুরা। বয়স্কদের ভোগান্তিই সবচেয়ে বেশি। নির্ধারিত সময়ে অফিসে পৌঁছতে পারছেন না কর্মজীবীরা। শিক্ষার্থীরা হিমশিম খাচ্ছেন ক্লাসে পৌঁছতে। মানুষের এ দুর্ভোগ যেন সমাধানের নয়।

যানজট নিরসনে কয়েকটি ফ্লাইওভার হয়েছে। আরও হচ্ছে। কিন্তু খুব বেশি এর সুফল পাচ্ছেন না নগরবাসী। ফ্লাইওভারের গোড়ায় বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানোর কারণেও যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। ফুটপাথ দখলমুক্ত করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয় মাঝেমধ্যেই। তবে শেষ পর্যন্ত সবকিছু উদ্যোগের মধ্যেই থেকে যায়। সকালবেলা উচ্ছেদ করা হয় ফুটপাথ, বিকেলবেলাই আবার দখল হয়ে যায়। রাজধানীতে যানজটের নানা কারণ রয়েছে। এর মধ্যে ভিআইপিদের যাতায়াতে বিশেষ সুবিধা উল্লেখ করার মতো।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মনিরুল ইসলাম দ্য রিপোর্টকে বলেন, রমজান মাস উপলক্ষে যানজটের পরিমাণ বাড়ছে। সকাল সাড়ে ৯টা অফিস টাইম, বিকেল ৩টার পর আবার সবাই একসঙ্গে বের হন। তাই সকাল ও বিকেল উভয় সময়েই যানজট দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে ইফতারের পর মানুষজন কেনাকাটায় মার্কেট করতে রাস্তায় বের হওয়ায় রাতেও যানজট হচ্ছে। এ ছাড়া রাজধানীর মগবাজারসহ কিছু এলাকায় ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ চলছে। এ কারণেও গাড়ি চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে।

চলতি বছরে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগ রাজধানীর যানজট নিয়ে একটি গবেষণা করে। ওই গবেষণায় দেখা গেছে, যানজটে ঢাকা সিটিতে বছরে আর্থিক হিসাবে ৩২ হাজার কোটি টাকার কর্মঘণ্টার ক্ষতি হয়। এ হিসাবে প্রতিদিন ৮৭ কোটি ৬৭ লাখ ১২ হাজার টাকা আর ঘণ্টা হিসাবে প্রতি ঘণ্টায় ক্ষতি হয় ৩ কোটি ৬৫ লাখ ২৯ হাজার টাকা।

পুরকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান জানান, ঢাকা শহরে প্রতিদিন যে কোনো পরিবহন মিলে মোট ২২ মিলিয়ন ট্রিপ দেওয়া হয়। ট্রিপের গড় দূরত্ব ৫ দশমিক ৪ কিলোমিটার। প্রতি ট্রিপে ৩০ মিনিট করে দেরি ধরে এই হিসাব করা হয়েছে।

তিনি জানান, তাদের গবেষণায় রাজধানীর মগবাজার থেকে কাকরাইল মোড় পর্যন্ত নেটওয়ার্ক ধরা হয়েছে। এতে পিক আওয়ারে অর্থাৎ সন্ধ্যা সোয়া ৬টা থেকে সোয়া ৭টা পর্যন্ত এ নেটওয়ার্কে প্রতি ঘণ্টায় রাস্তায় দেরি হওয়ার কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় ৮ লাখ টাকা।

ড. মো. হাদিউজ্জামান আরও জানান, তাদের গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী ঢাকা শহরে গণপরিবহন আরও বাড়াতে হবে। পথচারীদের বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।

যানজটের দুর্ভোগ কমাতে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণাধীন রয়েছে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের কাজ। শুরু হয়েছে মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ।