September 28, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

রাজুর বিদ্যাশিক্ষা : শেখ মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান

—না, আমি স্কুলে যেতে চাই না। আমার এসব ভাল্লাগে না মা!
—কেন বাপু, তুই স্কুলে যেতে চাও না কেন? তোর সমস্যাটা কী?
—সমস্যা আবার কী! ভাল্লাগে না বললাম তো।
—সমস্যা নেই, তবে ভাল্লাগে না কেন?
—বললাম তো জানি না।

মা ছেলের এভাবে মুখে মুখে কথা শুনে অবাক হন। রেগেও যান। কিন্তু বহুকষ্টে সেই রাগকে তিনি চেপে যান। তিনি ভাবেন এমন সুবোধ-বালক আজ এভাবে বেয়াদবের মতো কথা বলছে কেন? সমস্যাটা কী? তিনি একপ্রকার বিরক্তি নিয়ে বলেন, ‘ঠিক আছে রাজু, আজ তোমার স্কুলে যেতে হবে না। তবে তুমি আজ বাইরে যাবে না। বাড়িতেই থাকবে।’

রাজু যেন খুশী হয়েও খুশী হতে পারে না। সে বলে, ‘বাইরে গেলে সমস্যা কী?’ মা এবার আর রাগ ধরে রাখতে পারেন না। ধমক দিয়ে বলেন, ‘চুপ করো বেয়াদব আর একটা কথা নয়। আমি যা বলছি তা-ই করো।’

রাজু একপ্রকার ভয় পেয়ে যায়। সে আর কোনো কথা বলে না, চুপ করে ঘরে গিয়ে বসে। মা তাকে পড়তে বলে যায়। কিন্তু সে বই খাতা নিয়ে ঠিকই বসে, তবে পড়া তার হয় না। খাতাতে কি সব হিজিবিজি আঁকে আর লেখে। মা দূর থেকে তা একবার দেখলেও কিছু বলেন না। তিনি পাশের ঘরে গিয়ে বসেন। মায়ের মাথায় নানা ভাবনা এসে ভর করে। তিনি বসে বসে ভাবেন, আসলে ব্যাপারটা কী?

এরপর তিনি রাঁধতে যান। এভাবে দুপুর হয়ে আসে এক সময়। মা রাজুকে গোছল করে আসতে বলেন। রাজু গোছল করে আসে। তিনিও গোছল ও গোছগাছ করে নেন। এমন সময় রাজুর আব্বু আব্দুস সালাম বাসায় ফেরেন। আজ আর ভাল লাগছে না বলে তাদের পোশাকের দোকান বন্ধ করে বাসায় এসেছেন। তা ছাড়া বাসাতে তার কিছু কাজও রয়েছে। বেশ কিছুদিন হল তার সামনে পহেলা বৈশাখ। ফলে বাসায় বসে পরিকল্পনাটাও করতে পারলেও মন্দ হয় না।

তাকে বাসাতে আসতে দেখে রাজু-রাণীর মা খুশী হন। চারজনে একত্রে খাওয়া-দাওয়া করেন। খাওয়া শেষে সালাম সাহেব যখন বিশ্রামের জন্য বালিশে হেলান দিয়ে বসেন তখন রাজুর মা বলেন, ‘একটা বিষয়ে একটু কথা বলতে চাই।’ তিনি পান খেতে খেতে বলেন, ‘বল।’ রাজুর মা বলেন, ‘বেশ কিছুদিন হল আমরা ছেলেটার দিকে ঠিক মতো নজর দেয় না…।’ কথা শেষ করতে না দিয়ে সালাম সাহেব বলেন, ‘কেন, কোনো ঝামেলা হল নাকি?’ রাজুর মা বলেন, ‘না, মানে বলছি কি— ছেলেটা কেমন যেন বেয়াড়া-বেয়াড়া হয়ে যাচ্ছে। ঠিক মতো স্কুলে যেতে চাই না। মুখে মুখে কথা বলে।’ সালাম সাহেব রেগে গিয়ে ছেলেকে ডাকতে যায়, এমন সময় রাজুর মা তাকে ইশারা দিয়ে থামিয়ে দিয়ে বলেন, ‘ওকে ডেকো না।’

—তাহলে, বল কী করা উচিত?
—আমাদের একটু ভাবা উচিত কেন ’ও এমন করছে?
—তা ঠিক বলেছ। আচ্ছা আর কী কী করছে?
—তা ঠিক বলতে পারব না। ও বাইরে কী করে না করে তা কি জানি?
—আচ্ছা, এক কাজ আজ ওকে নিয়ে আমরা ঘুরি। আর ভুলিয়ে-ভালিয়ে জানতে হবে তার দিন কীভাবে কাটে?

কথা মতো কাজ। বিকেলে রাজুকে তার বাবা বলেন, ‘রাজু আজকে আমরা চারজন ঘুরব। মজা করব।’ রাজু হঠাৎ এমন কথায় অবাক হয়। সে খুশী হয়। বলে, ‘ঠিক আছে আব্বু, আজ বেশ মজা হবে!’

বিকেলে তারা চারজন ঘুরতে বের হয়। মা, রাজু, রাণী ও রাজুর আব্বু প্রথমে রাজুর ফুপুবাড়ীর উদ্দেশে রওনা হন। পথে রাজুর সাথে সালাম সাহেব হেসে হেসে নানা কথা বলেন। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয়— ওদের ছোটখালার বাড়ী। এরপর সন্ধ্যার দিকে তারা বাড়ী ফেরে। ফেরার পথে সালাম সাহেব দোকান থেকে ছেলের জন্য কিছু খেলনা কিনে দেন ছেলে-মেয়েকে। বাড়ী ফিরতে ফিরতে তাদের রাত হয়ে যায়।

বাসায় এসে সালাম সাহেব তার ছেলেকে আলাদা ঘরে নিয়ে গিয়ে আদর করে বলে, ‘বাবু, তুমি ঠিক মতো স্কুলে যাও না কেন?’ রাজু বলে, ‘আমার ভাল লাগে না।’

—কেন ভাল লাগে না?
—জানি না।
—আচ্ছা তোমার প্রিয় বন্ধু কে কে?

রাজুর বলতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু আজ অন্যরকম দিন। আজ আনন্দের দিন। সে প্রথমে বলে, ‘বলব না।’ আব্দুস সালাম সাহেব বলেন, ‘বল, বাবু।’ রাজু বলে, ‘রাশু, রনি, অনীল… এরা।’

সালাম সাহেব আর বেশী কিছু জিজ্ঞাস করেন না। তিনি পরের দিন খোঁজ নেন আসলে এরা কেমন ছাত্র? বিভিন্নজনের সাথে এবং শিক্ষকগণের কাছে শুনে জানতে পারেন— তারা ঠিক মতো পড়ালেখা করে না, ঠিকমতো স্কুলেও যায় না। তারা বেশীরভাগ দিন স্কুলের সময় অহেতুক খেলাধূলা ও দুষ্টমী করে দিন পার করে। সেই সাথে তারা মাঝে-মধ্যে মারামারিও করে। নমর-শরম ছেলেদের তারা মাঝে-মধ্যেই মারধোর করে।

আব্দুস সালাম সাহেব এসব জানতে পেরে— তার আর জানতে বাকী থাকে না কেন ছেলে দিন দিন বেয়াড়া হয়ে যাচ্ছে। তার মনে পড়ে প্রবাদ আছে, ‘সৎ-সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ-সঙ্গে সর্বনাশ’। তিনি ভাবেন, ছেলেকে প্রথমে বুঝিয়ে বলবেন কিন্তু সে যদি কথায় কান না দেন তবে ক্রমেই কঠোর হবেন। রাজুর জন্য সেদিনও খেলনা কেনেন। বাসায় গিয়ে তাকে ওইগুলো দেন। এরপর তাকে বুঝিয়ে বলেন কেন ওদের সাথে মেশা ঠিক নয় এবং মিশলে সমস্যাগুলো কী কী হচ্ছে। রাজু প্রথমে রাগ করতে চায় কিন্তু তার বাবার সব কথা শোনার পর আর রাগ করতে পারে না— উল্ট লজ্জা পায়। এরপর থেকে রাজু যারা ভাল ছেলে এবং যারা মেধাবী তাদের সাথে মিলা-মেশা শুরু করে। স্কুলে ও পড়ালেখাতেও সে নিয়মিত হয়ে উঠে। এখন তাকে জোর করা লাগে না— পড়ালেখার বিষয়ে বা স্কুলের বিষয়ে। কেউ তার আর ছোটবোন রাণীর উদাহরণ দিয়ে তাকে আর লজ্জা দেয় না। আব্দুস সালাম সাহেব তার ছেলের পরিবর্তনে খুশী হয়— তিনি জানান, এবার রাজু রেজাল্ট ভাল করলে তাকে একটি ছোট সাইকেল কিনে দেবেন।

লেখক : কবি ও শিশু সাহিত্যিক