December 6, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

অর্জন অনেক; এবার ‘গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়’ হয়ে উঠুক

কাবেরী গায়েন ::

[প্রায়ই দেখি পত্রিকায় রিপোর্ট বের হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর কোনো তালিকায় পড়ে না, আন্তর্জাতিক মানে পিছিয়ে আছে। অতিশয় সত্যি কথা। কিন্তু বিনীতভাবে জানতে ইচ্ছে করে, বাংলাদেশের কোন খাতটি আন্তর্জাতিক মানে সফল? স্বাস্থ্য? প্রকৌশল? রাজনীতি? অর্থনীতি? শিল্প? সাহিত্য? না, এক ক্রিকেট ছাড়া কোনোক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক মান অর্জন করেনি। কিন্তু ঘুরে ঘুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে বিশ্বমানে পৌঁছাতে পারেনি সে নিয়ে সবাই বলেন, এমনকি রাজনীতিকরাও। বুঝতে পারি, সবার প্রত্যাশা রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে। কিন্তু ১৮/২০ হাজার টাকা বেতন দিয়ে একজন বিশ্ববিদ্যালয় প্রভাষককে ঢাকায় টিকে থাকতে বলে তাঁকে দিয়ে আন্তর্জাতিক জার্ণালে লেখাতে চাওয়া একটু বেশি হয়ে গেলো না? যেখানে গবেষণার জন্য বলতে গেলে কোনো বরাদ্দই নেই? আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন অ্যালামনাই কি আজ পর্যন্ত হাতে ধরে কিছু টাকা অনুদান দিয়েছেন কোনো একটি বিষয়ে গবেষণা করার জন্য? যা আন্তর্জাতিক পরিসরে আন্তর্জাতিক অ্যালামনাইরা হামেশাই করে থাকে? হার্ভার্ড, পিন্সটন, ক্যাম্ব্রিজ, অক্সফোর্ড-এর গবেষণার এক বড় অংশ তাঁদের আল্যামনাই-দের অংশগ্রহণ। সরকারি বরাদ্দ তো আছেই। তাই বলি, সমালোচনা অনেক হয়েছে। এখন একটু খোলামনে দেখি সবটা। চেষ্টা করি কীভাবে উত্তরণ করা যেতে পারে। সমালোচনার সাথে একটু দায়িত্বও নেই সবাই মিলে। আমাদের দেশের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা পৃথিবীর সবদেশের চেয়ে কম মেধাবী, এটি আমি মানি না। সবাই মাথা খাটালে কিছু বুদ্ধি বের হবেই। শুভ জন্মদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।]

এক। শুরুর কথা

এদেশের খুব কম মানুষই আছেন, যারা আহমেদ ছফা’র এই বক্তব্যের সাথে দ্বিমত করবেন যে, “ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই দেশটির যা কিছু আশাভরসার, তার সবটাই তো ধারণ করে এই বিশ্ববিদ্যালয়।” এই কথা বলার কিংবা এই ধারণা তৈরী হবার ন্যায্য কারণ রয়েছে।

পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম বিশ্ববিদ্যালয়ই আছে, যে বিশ্ববিদ্যালয় একই সাথে জাতির উচ্চ শিক্ষার আয়ত্তসাধ্য দ্বার উন্মোচন করেছে একদিকে, অন্যদিকে একটি জাতিকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে, পরাধীনতার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ, লালন এবং নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা সম্ভবপর করে তুলেছে। মজার ব্যাপার হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনেও কিন্তু দুটি উপাদান কাজ করেছিলো। একটি রাজনৈতিক, অন্যটি শিক্ষায়তনিক। অধ্যাপক অজয় রায় (২০১৩)-এর মতে,

“১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে পূর্ববাংলার অভিজাত মুসলিমলীগ নেতাদের ভেতর যে আশাভঙ্গের বেদনা তৈরী হয়েছিলো, সেটিকে প্রশমিত করার জন্য তখনকার ইংরেজ সরকার ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়।… অন্যদিকে ভারতের তখনকার বঙ্গীয় সরকার চেয়েছিলো অক্সফোর্ড বা ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় তৈরী হোক।”

সেদিক থেকে কোলকাতার চেয়ে ঢাকার পরিসর তখনো উন্মুক্ত। তবে রাজনীতি যাই-ই থাক, এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবার কারণেই এদেশের কৃষকের পাট বিক্রির টাকায় কৃষকের সন্তানের উচ্চশিক্ষার পথটি উন্মুক্ত হয়েছিলো। যাদের পক্ষে হিন্দু জমিদার বা মুসলিম অভিজাত শ্রেণীর মতো কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বা আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়া সম্ভব বা সহজ ছিলো না। ফলে কৃষকের ছেলেটি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এলেন, তার মধ্য দিয়েই একটি গুণগত পরিবর্তন সাধিত হয়ে গেলো এই বাংলার নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর। সম্ভবপর হয়ে উঠলো একটি মধ্যবিত্ত উচ্চশিক্ষিত অসাম্প্রদায়িক শ্রেণীর বিকাশ, যার ঐতিহাসিক মূল্য অনির্ণেয়।

দুই। শুরুটাই ছিলো স্বাধীন আর মুক্তবুদ্ধির

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রাটি শুরুই হয় অত্যন্ত উজ্জ্বলভাবে। শুরুতেই ‘নাথান কমিটি’র সুপারিশ  সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তোলার প্রস্তাবের বিপরীতে  জিতেছিলো ‘স্যাডলার কমিটি’র সুপারিশ আর তা হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হবে স্বায়ত্ত্বশাসিত। তাই শুরুতেই, স্বায়ত্ত্বশাসিত মুক্তবুদ্ধি চর্চ্চার অবারিত প্রতিষ্ঠান হিসেবেই যাত্রা শুরু হয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। যাত্রা শুরু হয়েছিলো বিশ্বমানের পন্ডিতদের স্বাধীন বিচরণক্ষেত্র হিসেবে। একদিকে বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক প্রখ্যাত প্রাচ্যবিদ্যা বিশারদ হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তিব্বত ও নেপাল থেকে উদ্ধার করেন চর্যাপদ ও দোহাসহ প্রাচীন বৌদ্ধসাহিত্য। চর্যাপদকে তিনি পরিচিত করান বাংলাভাষার আদিরুপ হিসেবে। একই বিভাগের এস. কে. পাল গবেষণা করেছেন বৈষ্ণববাদ নিয়ে, আর ভাষাতত্ত্ব নিয়ে বিশ্বমানের কাজ করেছেন বহু ভাষাবিদ পন্ডিত ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ।

অন্যদিকে বিজ্ঞান অনুষদও গড়ে উঠেছিলো বিশ্ববিখ্যাত পন্ডিত আর গবেষকদের দিয়ে। এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় অধ্যাপক অজয় রায় (২০১৩)-এর প্রবন্ধে। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের নির্দেশে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ঘোষ ল’-খ্যাত রসায়নবিদ স্যার জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ এসেছিলেন রসায়ন বিজ্ঞানের প্রধান হিসেবে। পদার্থ বিজ্ঞানের প্রধান ছিলেন  অধ্যাপক ওয়াল্টার জেমস জেনকিন্স যিনি কুলিজ টিউব থেকে ইলেকট্রন বিমের চরিত্র নিয়ে কাজ করেছেন। ছিলেন রিডার বিশ্ববিখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী সত্যেন বোস। এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে বসেই তিনি উদ্ভাবন করেন কোয়ান্টাম স্ট্যাটিসটিক্স যা এখন বোস স্ট্যাটিসটিক্স নামে পরিচিত। জড় কণিকার উপর প্রয়োগ করে আইনস্টাইন এর পরিধি বাড়ান আর এই পরিসংখ্যান পরিচিতি পায় বোস-আইনস্টাইন স্ট্যাটিসটিকস নামে। যেসব প্রাথমিক কণিকা এই সংখ্যায়ন মেনে চলে তাদের বলা হয় বোসন। কাজ করেছেন বিজ্ঞানী কে এস কৃষ্ণাণ। এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই প্রকাশিত হয়েছিলো কৃস্টাল ম্যাগনেটিজমের উপর তাঁর পাঁচটি ক্ল্যাসিক প্রবন্ধ যা বিশ্ববিখ্যাত।

শুরুটা যে বিশ্ববিদ্যালয়ের এতোটাই উজ্জ্বল, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসর বেড়েছে আর যুক্ত হয়েছে নতুন প্রতিভার সম্ভার। যুক্ত হয়েছেন মোহিতলাল মজুমদার, উদ্ভিদবিজ্ঞানী জিপি মজুমদার, ইতিহাস বিভাগ থেকে ইতিহাসবিদ রমেশ চন্দ্র মজুমদার সম্পাদনা করেছেন  ‘The Early History of Bengal (1924), আর দ্বিতীয় খন্ড বের হয়েছে স্যার যদুনাথ সরকারের সম্পাদনায় ‘A history of Bengal’।  অধ্যাপক অজয় রায় (২০১৩) এবং অধ্যাপক সর্দার ফজলুল করিম (২০০১)-এর বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়, তখন গড়ে উঠেছে ‘শিখা গোষ্ঠী’ আর ‘প্রগতি লেখক সংঘ’। মুক্তবুদ্ধি চর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। কাজী মোতাহার হোসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হোসাইন, আবদুর রহমান খাঁ-র মতো তখনকার তরুণ শিক্ষকরা  নেতৃত্ব দিয়েছেন  ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের, যা মুসলিম সমাজের রেনেসাঁ হিসেবে খ্যাত। আচার্য সত্যেন বোসকে ঘিরে গড়ে উঠেছিলো আড্ডার আসর ‘বারোজনা’। এই ‘বারোজনা’-য় ছিলেন বিজ্ঞান বিভাগের ডিন ড. জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, আইন বিভাগের নরেশ চন্দ্র মিত্র, ইতিহাসের অধ্যাপক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, অন্নদা শ্কংর রায়ের মতো ব্যক্তিরা। ‘বারোজনা’ যেসব সেমিনারের আয়োজন করতো, সেখানে বক্তৃতা করেছেন বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা, স্যার সিভি র‍্যমন, কে এস কৃষ্ণাণ। বের হয়েছে বিজ্ঞানী সত্যেন বোসের সম্পাদনায় পত্রিকা ‘বিজ্ঞান পরিচয়’।

দেশভাগ হয়েছে ১৯৪৭ সালে কিন্তু বুদ্ধিমুক্তির আন্দোলন তথা মুক্তবুদ্ধি চর্চার ক্ষেত্র থামেনি।  এসেছেন নাট্যকার মুনীর চৌধুরী, লিখেছেন ‘কবর’। এই বিশ্ববিদ্যালয় জন্ম দিয়েছে এদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের- সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অর্থনীতির অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী, রেহমান সোবহান, আনিসুর রহমান- যাঁরা দিয়েছেন অর্থনীতির ক্ষেত্রে ‘দুই অর্থনীতি তত্ত্ব’ পাকিস্তান আমলে। উচ্চশিক্ষায় কান্ডারি হয়ে দাঁড়িয়েছেন খান সরোয়ার মুর্শিদ, ড. আহমেদ শরীফ, অধ্যাপক অজয় রায়, বিজ্ঞানী কুদরত-ই-খুদা প্রমুখ।

পাকিস্তান আমলের সকল ষড়যন্ত্র রুদ্ধ করে দিয়ে বাঙালির নতুন কাব্যভাষা তৈরী করেছেন যে শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দিন, আলাউদ্দিন আল-আজাদ, হাসান হাফিজুর রহমান তারাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন একসময়। আবার প্রবল পাকিস্তানি সিনে-ইন্ডাস্ট্রির বিরুদ্ধে প্রায় একাই লড়েছেন যে জহির রায়হান কিংবা ‘লিবারেশন টাইগার্স’ বানালেন যে আলমগীর কবির একাত্তরের বদ্ধ দিনগুলোতে, ভাষা অন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেন যে ভাষা মতিন কিংবা স্বাধীনতার স্বপ্ন বিকশিত হয়ে পরিণতি পেলো যে বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে, সেই পরম নেতা  এবং তাঁর সহযোগী ১৯৭১ সালে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী বাঙালির আরেক মহান নেতা তাজউদ্দিন আহমেদ সকলেই এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দিয়েছেন দর্শনে অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেব। বাংলা সাহিত্যে অধ্যাপক অধ্যাপক মুফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ড. আনোয়ার পাশা। ইংরেজি সাহিত্যে ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, হুমায়ূন কবির, রাশিদুল হাসান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই কাজ করেছেন সমাজবিজ্ঞানের দুই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক নাজমুল করিম, অধ্যাপক রঙ্গলাল সেন। ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য্য। এই বিশ্ববিদ্যালয় ধারণ করেছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনকে। ধারণ করেছে ইসলামের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম, ড. মমতাজুর রহমান তরফদার, দর্শন বিভাগে অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম কিংবা ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমেদ-এর মতো শিক্ষকদের। বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, আইন, ব্যবসা-প্রশাসনসহ সকল শাস্ত্রে এ পর্যন্ত যারা মেধাবী এবং জাতিকে নির্দেশনা দিয়েছেন, দিয়ে চলেছেন- তাঁদের সিংহভাগই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে জড়িত।

তিন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবিতার সংকটে বিশ্ববিদ্যালয়

ফের বলে নেই, একটি জাতির মধ্যে উচ্চশিক্ষার বিস্তারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একক অবদান পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। কিন্তু, যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়টি আমাদের অহংকার এবং যেহেতু  বিশ্ববিদ্যালয়টি আর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই শতবর্ষে পা রাখবে, তাই কিছুটা নির্মোহভাবে এর বর্তমান অবস্থাটি পর্যালোচনা করা দরকার, নয়তো এই গৌরব অব্যাহত রাখা মুশকিল হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুরু হয়েছিলো বিশুদ্ধ জ্ঞান-চর্চার মধ্য দিয়ে। তবে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত কালপর্বে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটির রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মোকাবেলাও করতে হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়কেই। ফলে বিশুদ্ধ জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি আন্দোলন-সংগ্রাম এবং সেই আন্দোলনের লক্ষ্যাভিসারী জ্ঞানের চর্চা একটু একটু স্থান করে নিয়েছে। ফলে বিশুদ্ধ গবেষণা, যা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত লক্ষ্য, সেই অবস্থানটি কমপ্রোমাইজড হতে শুরু হয় এই কালপর্বেই। বিজ্ঞান গবেষণার চেয়ে ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয় বিষয়ের গবেষণা বা পর্যবেক্ষণ অনেক বেশি জনপ্রিয়তা পায়, যা একটি যুদ্ধমান জাতির জন্য খুবই স্বাভাবিক। আর পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের যুদ্ধ যে কেবল ১৯৭১-এ হয়েছে, এমন নয়, বরং যুদ্ধটি এই গোটা কালপর্বেই ছিলো। সর্বোপরি, দেশের শ্রেষ্ঠ মেধাবীদের ১৯৭১ সালে হত্যা করে পাকিস্তানী বাহিনী এদেশের আল-বদর, আল-শামস বাহিনীর সাহায্যে। ফলে স্বাধীনতার পর পরই একটি সার্বিক মেধাশূন্যতার কবলে পড়ে যায় এই দেশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়। উল্লেখ করা প্রয়োজন, পাকিস্তান আমলের শুরু থেকেই গবেষণা এবং শিক্ষার সার্বিকখাতে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্বপাকিস্তানের তুলনা করলে অর্থ বরাদ্দের বৈষম্যও প্রকটভাবে ধরা দেয়।

স্বাধীনতার পরে, ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ, যে অধ্যাদেশে শিক্ষকদের নৈতিকতা ও বিবেককে সর্বোচ্চ স্থান দেয়া হয় যে কোন কাজ চালানোর ব্যাপারে, সেই অধ্যাদেশের সুযোগটির সম্ভবত বেশ অপপ্রয়োগও হয়েছে। দু’টি কারণে এটি হয়ে থাকতে পারে। প্রথমত, প্রবল দলীয় রাজনীতি এবং দ্বিতীয়ত, নিজের দায় সম্পর্কে ধারণা না থাকা। বিশেষ করে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরবর্তী বাস্তবতা যা মূলত সেনাশাসন ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি- এই দুই ধারায় বিশ্ববিদ্যালয়কে বিভক্ত করে ফেলে। শিক্ষক রাজনীতি প্রবল হয়ে ওঠে দলভিত্তিক রাজনীতিকে কেন্দ্র করে। পাকিস্তানী সেনা-শাসনকে হটিয়ে যে বাংলাদেশের জন্ম, সেই বাংলাদেশে দীর্ঘকাল কার্যত সেনাবাহিনী নামে-বেনামে শাসনকালে শিক্ষক-রাজনীতি ও ছাত্র-রাজনীতিকে কলুষিত করার একটি চক্রান্ত শুরু থেকেই জারি ছিলো। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলো সেই দূর্গ, যাকে যে কোন স্বৈরশাসক ভয় পেয়েছেন। এই চক্রে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্ত্বশাসন রক্ষার ব্যাপারটি যেমন প্রাধান্য পায় শিক্ষক রাজনীতির একাংশে, অন্যদিকে স্বার্থান্বেষী রাজনীতিও গ্রাস করতে থাকে শিক্ষক সমাজের একাংশকে, যা খুব অবশ্যম্ভাবি। এমন পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে যা হওয়া স্বাভাবিক, সেটিই হয়েছে। প্রবল রাজনীতিকীকরণের কবলে পড়ে গেছে বিশ্ববিদ্যালয়। রাষ্ট্রের  শাসকরা তাই চায়।

স্বায়ত্ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ধারণা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করেছিলো সেই ১৯২১ সালে, ‘স্যাডলার কমিশন’- এর প্রস্তাব জয়যুক্ত হবার মধ্য দিয়ে, সেখানে ফাটল ধরে। ক্রমশ সরকারী হয়ে উঠতে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে সরকার পতনের সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে শুরু করে প্রশাসনের সকল পদে আমূল পরিবর্তন ঘটে। এমনকি রাতের অন্ধকারে উপাচার্যের অফিস দখলের মতো ঘটনাও ঘটে। কাজেই, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয়করণ প্রকট হয়ে উঠেছে। মেধার সাথে কম্প্রোমাইজটি এই নিয়োগের ক্ষেত্রে এখন প্রায় ‘প্রাকৃতিক’ হয়ে উঠেছে। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যা কোন ব্যক্তি-প্রশাসকের ভালো-মন্দের সাথে আর সম্পর্কিত নয়। তার অর্থ আবার এও নয় যে, মেধাবী শিক্ষার্থীরা নিয়োগ পান না, তাঁরাও পান, তবে এই রাজনৈতিক স্ক্রুটিনি পার করে। এই প্রথম দফা কম্প্রোমাইজ মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলে শিক্ষকদের স্বাধীন চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ক্ষেত্রে।

এখানে বলে নেয়া দরকার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাটি কেবল শ্রেণীকক্ষে পাঠদান নয়, বরং নতুন জ্ঞানের উৎপাদনের সাথেও সম্পর্কিত, যা নিশ্চিত করে নিত্য-নতুন গবেষণা। বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংর্কিং-এ বাংলাদেশ ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে, এমনকি এশিয়ার শীর্ষ ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও আর বাংলাদেশের অবস্থান নেই। এই রেটিংটি হয় শিক্ষার্থী-শিক্ষক রেশিও, বিভাগের সংখ্যা এবং সেই অনুপাতে আন্তর্জাতিক গবেষণা জার্নালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা হিসেব করে। এইখানে এসে আমাদের হোঁচটটি  ক্রমাগত দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।  সেটিকে সম্যকভাবে বুঝতে গেলে আরো দু’টি উপাদানের সাপেক্ষে বুঝতে হবে, কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর দোষ দিলে যেমন হবে না, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়ের জায়গাটিও চিহ্নিত করতে পারা চাই।

ইতিমধ্যে আরো দু’টি বিপর্যয় ঘটে গেছে বৈশ্বিকভাবে। প্রথমটি নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতি এবং এনজিও কার্যক্রম। নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতি একদিকে সারা পৃথিবীর মানুষকে ভোগবাদী একটি সমাজের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বহুজাতিক কর্পোরেশন কৃত্রিম চাহিদা তৈরী আর পুনরুৎপাদন করে প্রচার করে চলেছে গণমাধ্যমে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর সরকারের সাবসিডি কমিয়ে নেবার ব্যাপারে ক্রমাগত সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। অন্যান্য পেশার মানুষের সাথে একটি সাম্যমূলক জীবন চালানোর জন্য যে অর্থনৈতিক সামর্থ্য থাকা চাই, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একজন শিক্ষকের জন্য তার খুব সামান্য অংশই দিতে পারছে। ফলে একজন শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেই বাড়তি রোজগারের চিন্তা করতে হচ্ছে। তিনি একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে যাচ্ছেন। বাড়িভাড়ায় একটু সাশ্রয়ের জন্য আবাসিক শিক্ষক হতে চাইছেন কোন হলের। আবাসিক শিক্ষকতা যে ধারণা থেকে প্রনয়ণ করা হয়েছিলো, তার সাথে আজ আর কোন সম্পর্ক নেই। সত্যি কথা বলতে একটি স্বল্পমূল্যে আবাসন পাওয়াই মূখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি দাক্ষিণ্য হিসেবেই দেখে এবং বিনিময়ে দলীয় অনুগত্য আশা করে। শুধু ভদ্রস্থ একটি জীবন-যাপনের জন্যই যখন রাজনীতির নামে দলীয় আনুগত্য এবং বাড়তি আয়ের জন্য নানা জায়গায় ছুটাছুটি করতে হয়, তখন শিক্ষায়তনিক বিষয়ে পর্যাপ্ত মনোযোগী হওয়া দুরুহ হয়ে পড়ে, মুক্তবুদ্ধির চর্চা তো আরো দূরের কথা।

এবার আসা যাক, গবেষণায় বরাদ্দ প্রসঙ্গে। গবেষণা করতে টাকা লাগে। গত চার বছরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা-গবেষণা খাতে আর্থিক বরাদ্দের দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে গবেষণা খাতে বরাদ্দ অপ্রতুল শুধু নয়, প্রতিবছর এই বরাদ্দ কমছে। এ বিষয়ে দৈনিক সমকালে আকরামুল হক শামীমের রিপোর্ট থেকে জানা যায় (২৭ জুন, ২০১৪), “২০১৪-১৫ অর্থবছরের জন্য বাজেট প্রস্তাবিত হয়েছে ৩৭৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকার। শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের ৯.৬৮ শতাংশ এবং গত অর্থবছরের তুলনায় .৮১ শতাংশ কম। কেবল গবেষণা খাতে বরাদ্দ মাত্র ৩ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের এক শতাংশের কম। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে মোট বাজেট ছিলো ৩১৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। শিক্ষা-গবেষণাখাতে বরাদ্দ ছিলো ১০.৪৯ শতাংশ । ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে বাজেট ছিলো ৩০৬ কোটি ২০ লাখ টাকা, শিক্ষা-গবেষণাখাতে বরাদ্দ ছিলো ৩২ কোটি ৮০ লাখ টাকা যা মোট বাজেটের ১০.৭১ শতাংশ। ২০১১-১২ অর্থবছরে বাজেট ছিলো ২৭৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা, শিক্ষা-গবেষণাখাতে বরাদ্দ ছিলো ১১.৯ শতাংশ। এভাবেই শিক্ষা-গবেষণাখাতে ক্রমহ্রাসমান বরাদ্দ একদিকে, অন্যদিকে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা মোট বাজেটের ৭৯.৯ শতাংশ ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে।…”।  এবছরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজের ১% মাত্র বরাদ্দ করা হয়েছে গবেষণাখাতে। কিন্তু তারপরও শিক্ষকদের বেতন প্রয়োজনানুগ নয়।

এই অবস্থার মধ্যেও যখন প্রমোশনের জন্য নির্দিষ্ট ছক পূরণ করতে হয় একজন শিক্ষককে, তখন প্রকাশনা দেখাতে হয়। অনুষদ জার্নালগুলোতে যেসব লেখা প্রকাশিত হয়, সেসব প্রকাশনায় প্রকৃত জ্ঞানের উৎপাদনের চেয়ে পদোন্নতির দিকেই মনোযোগ রাখা হয়। ফলে একটি গভীর সংকটে পড়েছে আমাদের প্রকাশনা-মান, যা আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছাতে পারছে না। সৃজনশীলতা ব্যহত হচ্ছে।

উপরন্তু, ক্রমাগত সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠবার কারণে সরকার থেকে চাপ দেয়া হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আভ্যন্তরীন আয় বাড়ানোর জন্য বর্দ্ধিত বেতন, নৈশ-শিফট চালু ইত্যাদির মাধ্যমে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ক্রমাগত সরকার কর্তৃক মনোনীত হবার কারণে সরকারের এইসব হস্তক্ষেপের বিপরীতে শক্ত অবস্থান নিতে সক্ষম হচ্ছে সেটি জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। অন্যদিকে, আশির দশকের মধ্যভাগ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বুদ্ধিবৃত্তির অনেকটাই নিয়োজিত থেকেছে বিভিন্ন এনজিও-গবেষণার প্রস্তাবনা লেখা এবং অনেক ক্ষেত্রেই ফরমায়েসি গবেষণা সম্পন্ন করার মধ্যে। সেও তো অর্থনৈতিক কারণে। তবে এইসব গবেষণায় ক্ষতি ছিলো না, যদি বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো এসব উপার্জনের অর্থ বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা ফান্ডে জমা হতো, যা দিয়ে সেই শিক্ষকরাই গবেষণা সহকারী রাখতে পারতেন। কারণ, টাকা আনতে না পারলে গবেষণা সহকারী কীভাবে রাখবেন? গবেষণা সহকারী ব্যতিরেকে গবেষণা করবেন কীভাবে? গবেষণা করতে না পারলে প্রকাশনা হবে কীভাবে? প্রকাশনা না হলে প্রমোশন কীভাবে হবে? কিন্তু আমরা এই স্বচ্ছ প্রক্রিয়াটির মধ্যে যাইনি। এইখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ করার জায়গা অবশ্যই আছে। তবে ইদানীং যেসব রিপোর্টিং হয় ঢালাওভাবে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা নেই হত্যাদি, সেখানে যারা রিপোর্ট করেন, তাঁরা অরেকটু গভীরভাবে তলিয়ে দেখবেন বিষয়গুলো, কেবল শিক্ষকদের দোষ না দিয়ে বরং যে পদ্ধতিটি তৈরী হয়েছে, সেই পদ্ধতিকে প্রশ্ন করে, সেই প্রত্যাশা থেকেই যায়।

উত্তরণের উপায় কী?

সমস্যা যতো বড়ই হোক, সমাধানের উপায়ও আছে বৈ কি! প্রথম উপায় হলো, শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো। এর কোন বিকল্প নেই। আমাদের দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ সারা পৃথিবীতেই সবচেয়ে কম দেশগুলোর মধ্যে পড়ে। জাতীয় আয়ের ২.২ শতাংশ মাত্র ছিলো গতবছর পর্যন্ত, এ’বছর আরো কমেছে। স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী এই ব্যাপারে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। এই বরাদ্দটি বাড়াতে হবে। শিক্ষকদের জীবন-ধারণের মতো পর্যাপ্ত বেতন দিতে হবে, যেনো তিনি কেবল জীবন-যাপনের জন্য চিন্তিত না থেকে শিক্ষা ও গবেষণাকাজে মনোনিবেশ করতে পারেন। দীর্ঘদিন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য পৃথক বেতন ব্যবস্থার দাবি শুনে আসছি, ফলাফল হলো বেতন বৈষম্য আরো বেড়েছে এবারের বেতনঠামো বিন্যাসে । গবেষণাখাতে বাজেট বাড়াতে হবে। শিক্ষক সমিতি তো শিক্ষকদের এমনসব দাবি আদায়ের জন্যই কাজ করবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা থাকে। সমস্যা হচ্ছে, শিক্ষক সমিতির শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া আদায়ের প্ল্যাটফর্ম হিসাবে কাজ করার কথা থাকলেও, কোন এক অজ্ঞাত কারণে সরকার পরিবর্তনের সাথে শিক্ষক সমিতিরও পরিবর্তন হতে দেখা যায় ফলে দাবি-দাওয়ার ক্ষেত্রে যে আন্দোলনটি দৃশ্যমান হবার কথা, সেটি হয় না।  এগিয়ে আসতে পারেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অ্যালামনাইরা, যেমন হাভার্ড, প্রিন্সটনসহ বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যায়। তাঁরা গবেষণার জন্য ফান্ড তৈরীতে সাহায্য করতে পারেন।

অর্থের যোগানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বিবেচনা দরকার এ কারণে যে কোন রাষ্ট্র তার মানব সম্পদ উন্নয়নের জন্য যত ধরণের বিনিয়োগ করতে পারে, তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হলো শিক্ষায় বিনিয়োগ। শিক্ষকরা এই মর্মে বরং আলোচনা নিয়ে আসতে পারেন রাষ্ট্রীয় ও জনপরিসরে। অর্থের বরাদ্দ বাড়লে, শিক্ষা-গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে গবেষণার উপর ও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা জার্নালে প্রকাশের মতো গবেষণার উপর জোরারোপ করতে হবে। বিদেশি বিশ্বদ্যিালয়ের মতোই  RAE (Research Assessment Exercise)-এর ব্যবস্থা করতে পারেন। প্রত্যেক চার বছর সময়ের মধ্যে তাঁর শ্রেষ্ঠ চারটি প্রকাশনা জমা দেবেন যার উপরে মূল্যায়ণ হবে। এই একটি কাজ বাধ্যতামূলক করা গেলে সকল বিভাগ চাপের মধ্যে থাকবে। তখন আসবে শিক্ষক নিয়োগের প্রশ্ন।

এখন যেমনভাবে বিজ্ঞাপন দেয়া হয় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ঢালাওভাবে, তারচেয়ে বিভাগে কোন বিষয়ে শিক্ষক প্রয়োজন, সেটি ধরে সেই ক্ষেত্রে যাঁদের কাজ আছে তাঁদের নিয়োগ যদি করা যায়, তাহলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। এখন যেভাবে নিয়োগ করা হয় কেবল রেজাল্ট দেখে, তা’তে নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর পড়ানোর দক্ষতা সম্পন্ন শিক্ষকের চেয়ে সবাই সব জানেন ধরণের মধ্যম মানের শিক্ষাই কেবল নিশ্চিত করা যায়। কেবল শিক্ষাদান যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য, যাদের বলা হয় ‘টিচিং ইউনিভার্সিটি’, সেসব ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি কার্যকর হলেও ‘রিসার্চ ইউনিভার্সিটি’র জন্য বিশেষক্ষেত্রে পারদর্শীদের আনার ব্যাপারে আন্তরিক হতেই হবে। নিয়োগ পদ্ধতিতে পরিবর্তন প্রয়োজন।

কেউ ভালো রেজাল্ট করলেই ভালো শিক্ষক হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। ভালো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেমন দেখেছি, একজন ‘ক্যান্ডিডেট’ যাকে শর্টলিস্ট করা হয় তাকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় সকল ফ্যাকাল্টির সাথে, গ্রাজুয়েট শিক্ষার্থীদের সাথে এবং একদিন তাকে নিজের কাজের উপর ডিফেন্ড করতে বলা হয় গোটা ফ্যাকাল্টির সামনে, সেখানে যে-কেউ যে কোন প্রশ্ন করতে পারেন। তারপর তিনি মুখোমুখি হন ফাইনাল সিলেকশন বোর্ডের সামনে। এভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়াটি অনেক স্বচ্ছ হয়ে উঠতে পারে, নিয়োগপ্রার্থী সম্পর্কেও স্বাভাবিক একটি মূল্যায়ণ থাকে।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টি অনেক বড়। এর পরতে পরতে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে সৃজনশীল মানুষের কাজ আর সংগ্রামের ইতিহাস। আছে ২৯ হাজার শিক্ষার্থী, ১০টি অনুষদ, ১২টি ইন্সটিটিউট, তিন হাজারের উপর শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে আছে হাজার হাজার বই। কাজ করেছেন বিশ্ববরেণ্য পন্ডিতেরা। কাজ করছেন মেধাবী শিক্ষকরা, যাঁরা নিজেদের উদ্যোগে সকল প্রতিকূলতার বিপরীতে আন্তর্জাতিক জার্নালে লেখা ছাপাচ্ছেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে প্রশংসিত হচ্ছেন, সংখ্যায় কম হলেও বিশ্বের নামি প্রকাশনা থেকে বই বের করছেন। নানা রাজনেতিক-অর্থনৈতিক সংকটে গবেষণার জায়গাটি কাংক্ষিতমাত্রায় পৌঁছায়নি একথা মানলেও, সম্ভাবনা রয়েছেই কারণ আমাদের গাঁথুনি খুব মজবুত। সেখানে স্থানে স্থানে অবহেলা জমা হয়েছে মানি, কিন্তু সেই অবহেলাটুকু সরিয়ে ফেলতে পারলেই একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিজেকে প্রমাণ করতে পারবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

একশ বছর পূর্তির আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তার যাত্রা শুরু করবে, সেটিই প্রত্যাশা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি সেই যাত্রায় সামিল হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তির জায়গাটি দৃশ্যমান করে এবং সুনির্দিষ্ট সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে, কেবল ঢালাও সমালোচনা করে নয় সেই প্রত্যাশাও রইলো। এই বিশ্ববিদ্যালয় তাঁদেরও। ব্যক্তিগতভাবে আমি সকল আঁধারের পরেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে স্বপ্নই দেখি। আলোর এই অভিযাত্রা অব্যাহত হোক।

[মূল প্রবন্ধটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির প্রকাশনা ২০১৫-তে ছাপা হয়েছে। এখানে কিছু আপডেটসহ দেয়া হলো।]

তথ্যপঞ্জী:

অজয় রায় (২০১৩)। “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মুক্তবুদ্ধিও চর্চায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়”, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস ২০১৩।

সরদার ফজলুল করিম (২০০১)। সে সেই কাল: কিছু স্মৃতি, কিছু কথা, আধুনিক ভাষা ইন্সটিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

কাবেরী গায়েন (২০০৯)। “কেনো এদেশের ছাত্র সমাজকে বারে বারেই রুখে দাঁড়াতে হয়েছে’’, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ: ঢাকা ও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান (রংগলাল সেন, দুলাল ভৌমিক ও তুহিন রায় সম্পাদিত)। দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড।

এ এম হারুন আর রশীদ। “পরমাণুর অচলায়তন বসু-আইনস্টাইন ঘনীভবন”, স্মরি সত্যেন বসু (শামীমা  চৌধুরী সম্পাদিত)। বোস সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডি: রিসার্চ ইন ন্যাচারাল সাইন্সেস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

একরামুল হক শামীম (২৭ জুন, ২০১৪)। “গবেষণায় বরাদ্দ কমছেই”, সমকাল । যঃঃঢ়://িি.িংধসধশধষ.হবঃ/২০১৪/০৬/২৭/৬৮৭৪৯

M A Rahim. 1981. The History of the University of Dacca, University of Dhaka.

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।