September 18, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

'আমি পচা গম নিয়ে কিছু লিখছি না কেন'

মেহেবুব আলম বর্ণ : এক বন্ধু আমাকে ইনবক্সে প্রশ্ন করেছেন, আমি পচা গম নিয়ে কিছু লিখছি না কেন। আমি তাকে বলেছি, ভাইরে শিশু বেলা থেকেই আমি কম্বল চুরির গল্প শুনেছি। বঙ্গবন্ধু নিজেই নাকি তাঁর ভাগের কম্বলটি পাননি। ছোট বেলায় আব্বা মারা যাওয়ার কারণে রেশন তুলতে হতো আমাকে। এলাকার সব রেশন ডিলাররা ছিলেন আওয়ামী লীগার। তাদের দেখেছি ভালো চাল, গম বাজারে বিক্রি করে খারাপ মাল আমাদের মাঝে দিতে। জন্মকাল যথাযথ না হলে পরবর্তীকালে ভালো কর্ম আশা করলে কষ্ট পেতে হয়। আমি তাদের চিনি তো তাই আর ওসব খাসলত দেখে দুঃখ,কষ্ট পাই না।

এদেশে যারা মন্ত্রী এমপি হন তাঁরা জানেন চুরি, দুর্নীতি করে কোন শাস্তি পেতে হয়না। যতবড়ই চুরির ঘটনা ঘটুক না কেন সাধারণ মানুষ রাজপথে নামেন না। সেইসব দুর্নীতিবাজদের পদত্যাগ বা ফাঁসি দাবী করেন না। তারা খুবই সচেতন যে শুধু ধর্ম নিয়ে কিছু বলা যাবে না। তাই প্রয়োজনের সময় মাথায় টুপি,হিজাব পরে নিলেই ভোটারদের মন পাওয়া যায়। ধর্মের লেবাসের গুরুত্ব কতটা তা মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু তো দেখিয়ে দিয়েছেন। অপরদিকে এদেশে ধর্ম নিয়ে মন্তব্য করার পরিনতি কি হয় তা তো বুড়ো বয়সে এসে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন লতিফ সিদ্দিকী।

এদেশে একজন লতিফ সিদ্দিকীর কথায় ধর্মের যেন যাই যাই অবস্থা ! তখন সারা দেশে তাঁর ফাঁসির দাবী। জেলায় জেলায় কত মামলা। তখন আমাদের ইমানদাররা ভুলে যান পবিত্র কোরানের সুরা আনআম এর আয়াত,” অবশ্য যারা ধর্ম সম্বন্ধে নানা মতের সৃষ্টি করেছে ও বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে তাদের কোনো কাজের দায়িত্ব তোমার নেই, তাদের বিষয় আল্লাহর এখতিয়ারে। আল্লাহ তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে তাদের জানিয়ে দেবেন ।” তখন ধর্মরক্ষাকারীরা ভুলে যান সুরা বাকারার আয়াত,” ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই।” আল্লাহ ধর্মবৈচিত্র ও পরধর্মসহিষ্ণুতা নিয়ে পবিত্র কোরানের সুরা কাফিরুনে বলছেন,” তোমাদের ধর্ম তোমাদের , আমার ধর্ম আমার।” সুরা মাদিয়া তে আল্লাহ বলছেন, ” হে কিতাবিগণ ! তোমরা তোমাদের ধর্ম সম্বন্ধে অন্যায় বাড়াবাড়ি কোরো না।”

এদিকে সুরা মাদিয়াতেই চুরি প্রসঙ্গে আল্লাহর নির্দেশ হলো- চোর, পুরুষ হোক বা নারী হোক, তার হাত কেটে ফেলো। এ আল্লাহর তরফ থেকে তাদের কৃতকর্মের ফল ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।” আমাদের বাংলাদেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থায় যেহেতু চুরির জন্য হাত কাটার বিধান নেই তাই সেটি ঘটে না। কিন্তু এতো ইমানদারদের দেশে প্রচলিত অাইনের মুখেও বড় চোররা ধরা পড়েন না কেন? কখনো বা দুদকের মামলা হলেও তারা পার পেয়ে যান কেন?

পৃথিবীতে এমন কোন গনতান্ত্রিক দেশ আছে যেখানে আমাদের খাদ্যমন্ত্রী যে গম কেলেংকারি ঘটালেন তা করেও মন্ত্রিসভায় টিকে থাকা সম্ভব? কেন সম্ভব হচ্ছে জানেন? ১/১১ এর কথা আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়। সে সময় আমাদের প্রধান দুই নেত্রীর বিরুদ্ধেই দুর্নীতির মামলা হয়েছিলো। সেই মামলা খালেদা জিয়া এখনও টানছেন। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে তা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। জাতীয় সংসদে বসেছিলো সেই বিশেষ আদালত। সে সময় বাংলাদেশের যে কজন সাংবাদিক নিয়মিত সেই বিচার কাজের খবর জাতির সামনে তুলে ধরেছিলেন তাদের মধ্যে আমিও একজন। আমি শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া দুজনকেই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। আমরা সাংবাদিকরা তখন চেয়ারে বসে সে দৃশ্য দেখতাম ! বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে এদৃশ্য দেখা আমার জন্য পরম পাওয়া। তখন শেখ হাসিনার মামলা পরিচালনার জন্য যে কজন আইনজীবী ছিলেন তাঁরা পরবর্তীতে নানান লাভজনক পদ পুরষ্কার হিসেবে পেয়েছেন। অ্যাডভোকট কামরুল ইসলামের মুখটা সেই সময় থেকেই টেলিভিশনের পর্দায় দেখা যায়। তিনি ঐ মামলার এ টু জেড জানেন। তো তাঁর গুরুত্ব না বেড়ে কেন কমবে? পচা গমের রুটি খেয়ে শত শত মানুষ মারা গেলেও কি এদেশে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের পদত্যাগ বা ফাঁসি চেয়ে লতিফ সিদ্দিকী ইস্যুতে যেমন প্রতিবাদ উঠেছিলো তা উঠবে ?

এই গমে সেনাবাহিনীর না, পুলিশও নিবে না। তাহলে কি তা নদী বা সাগরে ফেলে দেওয়া হবে? এই পচা গমের রুটি শেষ পর্যন্ত কাদের গিলতে হবে তা নিশ্চয় আমাকে বলে দিতে হবে না। ও গো আওয়ামী ভাই, বলে দিলেই তো হয় এদেশে যারা বাসি,পচা দুর্গগ্ধ খেতেই জন্মেছে তাদের জন্যই পবিত্র ঈদের এই বিশেষ উপহার। যারা পচাতেই অভ্যস্ত তারা হঠাৎ ভালো খেলে পেট খারাপ হবে, তাই বহুত কষ্ট করে সুদূর ব্রাজিল থেকে তা আনা হয়েছে।

আমাদের ত্রানমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চলছে। পৃথিবীর যে সব দেশে সুশাসন আছে সেখানে এমন পরিস্থিতিতে সুষ্ঠভাবে বিচার পরিচালনায় মন্ত্রী পদত্যাগ করেন। বাংলাদেশে তিনি গলাবাজি চালিয়ে যাচ্ছেন। নারায়নগঞ্জে এক মার্ডারের ঘটনায় তার পরিবারের সদস্যের জড়িত থাকার খবরটিও তো জানা। আওয়ামী লীগের বিশাল বড় এক নেত্রী এমপি পিনু খানের পুত্র যানজটে পড়ে গুলি চালিয়ে দুজনকে মেয়ে ফেললেন। যে দুজন মারা গেছেন তারা ঐ পচা গমের রুটি খাওয়াদের শ্রেণীভুক্ত। পিনু খানকে তার দল এখনো মাথায় তুলে রেখেছে। ‌এই হলো বাংলাদেশ স্টাইলের গনতন্ত্র। যার দক্ষ ব্যবহারে এক শাসক আরেক শাসককে ছাড়িয়ে যান।

লেখক : সংবাদ কর্মী