October 23, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

কারাগারে থেকেই জঙ্গি নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছে !

বিশেষ প্রতিনিধি : কারাগারে বসেই যত নাশকতার পরিকল্পনা জঙ্গি নেতাদের। মোবাইল ও চিঠির মাধ্যমে বাইরে থাকা অনুসারীদের নির্দেশনাও দিচ্ছেন নিয়মিত। কতিপয় কারা কর্মকর্তা-রক্ষীদের ম্যানেজ করে স্বাচ্ছন্দ্যেই দেশে নাশকতার ছক আঁকছেন তারা। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিভাবে কাজ করতে হবে, সেই নির্দেশনাও দিচ্ছেন নেতারা। আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার (একিউআইএস) বাংলাদেশি প্রধান সমন্বয়কারী ও উপদেষ্টাসহ গ্রেফতার হওয়া ১২ জঙ্গির কাছ থেকে র‌্যাব কর্মকর্তারা এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন। কারাগার থেকে দেওয়া একটি চিঠির কপিও উদ্ধার করা হয় তাদের কাছ থেকে।

কারাগার থেকে বাইরের জঙ্গিদের মোবাইলে এমন নির্বিঘ্ন যোগাযোগ ও নাশকতার পরিকল্পনার তথ্য পেয়ে উদ্বিগ্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা। নাশকতা প্রতিরোধে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা। কারাগারে বসেই বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের নেতারা একাট্টা হয়ে তাদের মতাদর্শ-বিরোধীদের নীরবে হত্যার নির্দেশনাও দিচ্ছেন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের (হুজিবি) শীর্ষ নেতা মাওলানা মাঈন উদ্দিন ওরফে আবু জান্দাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। সম্প্রতি কারাগারে বসেই অনুসারীদের কাছে পাঠানো একটি চিঠি র‌্যাবের হস্তগত হয়। বুধবার গ্রেফতার হওয়া একিউআইএস-এর প্রধান সমন্বয়কারী মাওলানা মাইনুল ইসলাম ওরফে মাহিম ওরফে নানা ওরফে বদিউলকে দেওয়া একটি চিঠিতে মাসুম বিল্লাহ অনুসারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছি, জেলখানা থেকে আমরা মোবাইলে যত কথা বলে থাকি, সব গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন শুনে থাকে। এর অনেক প্রমাণও আমরা পেয়েছি। তাই আপনাদের ও আমাদের মঙ্গলের জন্য কিছু বিষয় মেনে চলতে হবে।’

চিঠিতে জান্দাল বলেন, ‘জিহাদি ও সাথীদের কোনও বিষয় মোবাইলে আলাপ করব না। প্রথম থেকেই প্রত্যেকের জন্য একটি ফেক নাম রাখতে হবে। যে নামে আমরা তাদের ডাকব। আপনাদের কয়েকজনের নাম আমি রেখে দিচ্ছি। আলতাফ হলো আল মাসুম, হাবিব হলো ত্বহা, লেনিন হলো ফেদাউল ইসলাম। মুফতি জাফর হলো সালমান। লেলিন ভাইকে বলবেন ‘বাদা’ শব্দ বাদ দিয়ে সে স্থানে ‘খাল’ ব্যবহার করব।’

জঙ্গি নেতা জান্দাল চিঠিতে উল্লেখ করেন, ‘আমরা জেল থেকে বের হওয়ার ইচ্ছা করছি। আর এ কাজে আপনাকে ও হাবিবকে কাজে লাগাবো বলে ভাবছি। আপনারা রাজি থাকলে কী করতে হবে পরে চিঠি দিয়ে জানাবো। এই ব্যাপারটি আপনারা দু’জন ছাড়া যেন আর কেউই না জানে। এমনকি লেলিন ভাইও নয়। তাকে যদি বলতে হয়, আমি বলব। কারণ তাকে মোবাইলে বলতে গেলে খুবই ক্ষতিকর হবে। আপনারা রাজি কি না, তা জানতে আমি শুধু আপনাকে জিজ্ঞাসা করব। হাবিবের সঙ্গে কখনও মোবাইলে কথা বলবেন না। যত দেরি হোক, দেখা করে সরাসরি কথা বলবেন।’

মাওলানা মাইনুল ইসলামকে দেওয়া চিঠিতে জান্দাল আরও বলেন, ‘লেলিনকে যা বলতে বলেছি, তা আপনার মোবাইল ফোন থেকে বলবেন না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আমার সঙ্গে চিঠি দিয়ে শেয়ার করবেন। একটি কাগজের ব্যাগের নিচে আঠা দিয়ে চিঠি রাখবেন। পরে ব্যাগে কিছু একটা দিয়ে কোনও উকিল বা ড্রাইভারের কাছে দেবেন। যেমন- আজ আমি দিয়েছি। আমাদের এই কোর্টে বিভিন্ন বিভাগের গোয়েন্দা থাকে। তাই ওই দিনের মতো ইশারা বা সরাসরি কথা না বলা চাই।’

জঙ্গি প্রতিরোধ কার্যক্রমে নিয়োজিত গোয়েন্দারা জানান, হুজিবি’র শীর্ষ নেতাদের হাত খরচের জন্য কারাগারে টাকাও পৌঁছে দেন বাইরে থাকা অনুসারীরা। কারাগারের পারসোনাল ক্যাশে (পিসি) তারা জমা দিয়ে থাকেন। প্রতিমাসেই ঢাকা ও কাশিমপুর কারাগারসহ বিভিন্ন কারাগারে জঙ্গি নেতাদের পিসি’তে মোটা অঙ্কের টাকা জমা করা হয়। এ সব টাকা জঙ্গিরা নিজেদের পছন্দের খাবার কেনা ছাড়াও কারা কর্মকর্তা-কারারক্ষীদের ম্যানেজ করতে ব্যয় করেন। জঙ্গিদের পরিবারের সদস্যদের খরচের জন্যও নিয়মিত টাকা দেওয়া হয় বলে গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিদের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন গোয়েন্দারা।

র‌্যাবের মিডিয়া উইং-এর পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ বলেন, ঈদের পরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্নস্থানে সিরিজ হামলা চালানোর পরিকল্পনা ছিল জঙ্গিদের। ত্রিশালে জঙ্গি ছিনতাইয়ের মতো বড় ধরনের হামলা চালানোর পরিকল্পনা ছিল তাদের। কারাগারের ভেতরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বাইরে থাকা এসব জঙ্গি। র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়ে যাওয়ায় তাদের পরিকল্পনা আপাতত সফল হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।

এর আগে গত সেপ্টেম্বরে আশুলিয়া থেকে গ্রেফতার হওয়া জামা’তুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) দুই নেতা সিকান্দার আলী নকি ও নাহিদ গ্রেফতার হওয়ার পরও গোয়েন্দারা কারাগারে বসে জঙ্গিদের নাশকতার নানা ছক সম্পর্কে অবহিত হন। জেএমবি প্রধান মাওলানা সাইদুর রহমান ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান জসিম উদ্দিন রাহমানী কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে বসে একসঙ্গে কাজ করার সমঝোতায় পৌঁছেন। কয়েকদিন আগে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া মাওলানা নুরুল্লাহ কাশেমি কাশিমপুর কারাগারে গিয়ে পরিবারের সদস্য পরিচয়ে হুজিবি’র শীর্ষ জঙ্গি নেতা মুফতি জাফরের সঙ্গে বৈঠক করেন।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, জেলে থাকা নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন সমন্বিতভাবে কাজ করার পরিকল্পনা করেছে। এভাবে তারা কথিত খেলাফত বা শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কারাগারে শীর্ষ জঙ্গি নেতারা একাধিক বৈঠকও করেছেন। ওইসব বৈঠক থেকে পাওয়া সিদ্ধান্তগুলো বাইরে থাকা জঙ্গিরা বাস্তবায়নের জন্য সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

অর্ধ্ব শতাধিক জঙ্গি বন্দি রয়েছেন কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে। কারাগার থেকে মোবাইল ফোনে কথা বলা ও চিঠি দেওয়ার বিষয়ে কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মিজানুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিষয়টি আমরা একেবারেই অস্বীকার করছি না। তবে সেটা খুবই সীমিত। কারণ, নানাভাবেই তারা মোবাইল ফোন ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে ও কথা বলছে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা যখন কোর্টে যান, তখন কথা বলার সুযোগটি তারা গ্রহণ করেন।

সিনিয়র জেল সুপার মিজানুর রহমান রহমান বলেন, এসব বিষয়ে তারা খুবই সচেতন। নিয়মিতই ভেতরে ও বাইরে তল্লাশি চালান তারা। তাছাড়া প্রত্যেক জঙ্গির প্রতি তাদের বিশেষ নজরদারিও রয়েছে।