September 19, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

নাসা অর্থায়ন করলে নিউ হরিজনসের আয়ু বাড়বে ১০ বছর

সূর্যের ‘বিতর্কিত সন্তান’ প্লুটোতে ঐতিহাসিক অভিযাত্রায় রয়েছে নাসার নিউ নভোযান হরিজনস। এরই মধ্যে রোমাঞ্চেভরা বামন গ্রহের অনেকখানি উন্মোচন করেছে সে। কিন্তু এই নভোযানের ভাগ্য ও ভবিষ্যত কী? এ নিয়ে মিশনের অন্যতম জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. হেনরি থ্রুপের সঙ্গে দ্য রিপোর্টের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়।

ইমেইলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অ্যারিজোনার প্লানেটরি সায়েন্স ইনস্টিটিউটের এই বিজ্ঞানী বলেন, ‘নাসা যদি অর্থায়ন করে নিউ হরিজনস মিশনের আয়ু অন্তত ১০ বছর বাড়তে পারে।’

হেনরির সঙ্গে ওই আলাপচারিতায় উঠে আসে প্লুটোর নতুন চাঁদ ও বলয় প্রসঙ্গ। বিনিময় হয় মিশন নিয়ে বাংলাদেশের অন্যতম বিজ্ঞানচিন্তক আসিফের দর্শনও।

১৬ জুলাই নেওয়া সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হল।

প্রিয় বিজ্ঞানী, শুভেচ্ছা নিবেন। এরই মধ্যে আপনারা জানিয়েছেন, সৌরজগতের সব বামনের রাজা প্লুটোরও পাহাড় আছে, তার চাঁদের আছে জল। একটা পাহাড় তো নাকি ১১ হাজার ফুট উঁচু।

হেনরি থ্রুপ : ধন্যবাদ । ঠিকই জেনেছেন।

এখন পর্যন্ত আপনাদের কাছে নিউ হরিজনস থেকে কি এমন কোনো সংকেত-বার্তা এসে পৌঁছেছে যা দেখে ইঙ্গিত যাবে, প্লুটোর নতুন কোনো চাঁদ আদৌ আছে কি না?

হেনরি থ্রুপ : নতুন চাঁদের সন্ধানে আমরা কিন্তু এই মাসে প্লুটোরজগতকে ফ্রেমবন্দী করার বেলায় যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়েছি। যাত্রাপথে যদি ঝামেলা পাকিয়ে ফেলে— এই ভাবনা থেকে প্লুটোর অতিনৈকট্য অর্জন করার কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই আমরা এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখি।

কিন্তু নতুন চাঁদের সন্ধান মেলেনি…

হেনরি থ্রুপ : এখন পর্যন্ত অবশ্য তেমন কিছুই খুঁজে পাইনি। এখানে বলে রাখি, প্লুটোর সবচেয়ে ছোট চাঁদ স্টিক্স। এই চাঁদের চেয়েও ছোট কোনো বস্তুকে স্পষ্ট করে দেখার চোখ রয়েছে নিউ হরিজনসের। নভোযানের ক্ষতি ডেকে আনতে পারে ছোট্ট কোনো ধূলিকণা কিংবা নাক্ষত্রিক বর্জ্যও। সে সবেরও সন্ধান পাইনি আমরা।

নির্বাসিত গ্রহটির বলয় কি খুঁজে পাওয়া গেছে?

হেনরি থ্রুপ : এখনো না। তবে প্লুটো থেকে যখন নাকি আমরা দূরে সরে যাচ্ছি, সেই যাত্রাপথেও বলয় ও ধূলিকণার বাড়তি খোঁজ চলছে। এই অনুসন্ধান চলবে জুলাইয়ের শেষাবধি। সে সব দেখে পরিষ্কার হওয়া যাবে বলয়ের অস্তিত্ব। কিন্তু অভিযান থেকে এ রকম লাখো কোটি তথ্য-উপাত্ত আসবে পৃথিবীতে। সুতরাং বলয়ের তথ্যচিত্র আকাশ থেকে মাটিতে নামতে বেশ সময় লাগবে বৈকি।

বলয়ে সেজেছে বামন গ্রহ প্লুটো, শিল্পীর চোখে। সৌজন্যে : ডেভিয়ান আর্ট।

বাংলাদেশের পেশাদার বিজ্ঞানবক্তা আসিফ (এক শব্দের নামেই তিনি সুপরিচিত)। তিনি আপনাদের এই অভিযানকে দেখছেন এভাবে : মহাকাশে অভিযাত্রা সম্প্রসারিত করার মাধ্যমে আসলে সৌরজগতে নিজের শক্তি পরীক্ষা করছে মানুষ। সে যদি দেখে, সৌরজগতে সে-ই শক্তিমান, তাহলে সে স্বপ্ন দেখে— এক দিন এই সূর্যভিটার যত্রতত্র সে ঘুরে বেড়াবে। আসিফ বলছেন, প্লুটোর নতুন চাঁদ কিংবা বলয় খোঁজাই এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য নয়। আসিফকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

হেনরি থ্রুপ : আসিফ পুরোপুরি ঠিক কথাটাই বলেছেন। প্লুটোর চাঁদ কিংবা বলয় খোঁজা নিয়ে তার মন্তব্য যথাপোযুক্ত। আসলে চাঁদ ও বলয়ের সন্ধান আমরা করছি। কিন্তু এটাই আসল লক্ষ্য নয়।

প্লুটোতে যেমন নিউ হরিজনস উড়ছে, আমার মাথার মধ্যেও তেমনি অনেকগুলো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। আমি আন্তরিকভাবে অত্যন্ত দুঃখিত, ব্যস্ততম ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আপনার সামনে বারবার আমি ‘ঝামেলা’ হয়ে এসে পড়ছি। সত্যিই দুঃখিত।

হেনরি থ্রুপ : এমনটা ভাববেন না। আপনার সব প্রশ্নই সত্যিকার অর্থে ভাল প্রশ্ন।

নিউ হরিজনস, যাকে আমি বলতে চাইছি মহাজাগতিক মৌমাছি—তার ভবিষ্যত আমাকে ভাবাচ্ছে বেশ। প্লুটো থেকে দূরে, আর কত দূরে অভিযান চালাবে সে?

হেনরি থ্রুপ : হ্যাঁ, প্লুটোকে পেছনে ফেলে সামনের দিকে এগুচ্ছে নিউ হরিজনস। তার গন্তব্য এখন কুইপার বেল্ট। আশা করছি, সৌরজগতের ওই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি বরফি বস্তুকে— যারা হতে পারে (আবারও নাও পারে) প্লুটো এবং এর বড় চাঁদ শ্যারনের মতো— তাদের পাশ দিয়ে উড়ে যাবে সে।

এ ক্ষেত্রে নাসা যদি অর্থায়ন করে, তাহলে চলতি বছরের শেষের দিকে এ বিষয়ে ঘোষণা দেওয়ার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। আমাদের যে শক্তি-উৎস এবং জ্বালানী তাতে করে নিউ হরিজনস মিশনের আয়ু ১০ বছর বা তারও বেশি বাড়তে পারে।

(প্রচ্ছদ ছবিতে শিল্পীর চোখে কুইপার বেল্টের একটি বরফি বস্তুর ঘাড় ঘেঁষে উড়ছে নিউ হরিজনস)

নেপচুনের পরে বিশাল এলাকা জুড়ে ছোটখাটো অগণিত বরফি বস্তুর রাজ্য কুইপার বেল্ট। শিল্পী : ফিলিপ মার্টিন।

নিউ হরিজনস কি সূর্যের চৌহদ্দি ডিঙিয়ে বহির্জগতে যাত্রা করবে, নাম লেখাবে নভোযান যুগল ভয়েজারের সারিতে?

হেনরি থ্রুপ : হ্যাঁ, সবশেষে তো সৌরজগত ছেড়ে যাবেই নিউ হরিজনস। পাড়ি দেবে অন্য কোনো সূর্যের জগতে। অবশ্য ভিন নক্ষত্রের সীমানা ছুঁতে ওর সময় লাগবে ৫০ হাজার বছর!

সৌরজগতের আনাচে-কানাচে সব জায়গা নিয়ে একটা পরিপূর্ণ মানচিত্র তৈরি করতে কি অবদান রাখবে নিউ হরিজনস?

হেনরি থ্রুপ : আসলে (শ্লথগতিতে চলছে বলে) এই ধরনের অভিযান দিয়ে পুরো সৌরজগতের মানচিত্র হাতে পাওয়া বেশ কঠিনই। বরং পৃথিবীতে বসে আমরা টেলিস্কোপের সাহায্যেই কাজটা সারতে পারি।

ধন্যবাদ ড. হেনরি। আবারও কথা হবে।

হেনরি থ্রুপ : ধন্যবাদ। নিশ্চয়ই কথা হবে।

২০১২ সালের ২৫ আগস্ট সূর্যের মায়া কাটিয়ে বহির্জগতে পাড়ি জমায় নাসার নভোযান ভয়েজার-১। ছবি : স্পেস প্লাজমা।

প্রসঙ্গত, ১৪ জুলাই মঙ্গলবার মহাবিকেলে ‘নির্বাসিত গ্রহ’ প্লুটোর নিঃশ্বাস অনুভব করেছে মানুষ।

তখন প্লুটোর সঙ্গে মানুষের তফাত পাঁচশ’ কোটি কিলোমিটার থেকে কমে মাত্র সাড়ে ১২ হাজার কিলোমিটারে নেমে এসেছিল।

আর এরই মধ্য দিয়ে একে একে সৌরজগতের সবকটি গ্রহ (মিশন শুরুর সময় প্লুটোও গ্রহ ছিল) যন্ত্রসহায়তায় ছুঁয়ে ফেলার ইতিহাস গড়ে মানবজাতি।

এক নজরে হেনরি থ্রুপ

ড. হেনরি থ্রুপ। যুক্তরাজ্যের আরিজোনায় প্লানেটরি সায়েন্স ইনস্টিটিউটে কর্মরত রয়েছেন। নিউ হরিজনস মিশনের অন্যতম জ্যেষ্ঠ গবেষক। সৌরজগতের উৎস নিয়ে কাজ করেছেন নাসায়। এর আগে কলোরাডোর সাউথওয়েস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটে নিযুক্ত ছিলেন। পিএইচডি করেছেন কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

নাসার হয়ে শুধু প্লুটো মিশনেই নয়, এর আগে শনি গ্রহের উদ্দেশে পাঠানো নাসার ক্যাসিনি মিশনেও অন্যতম বিজ্ঞানী ছিলেন হেনরি থ্রুপ।