June 23, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

রক্তাক্ত ঈদ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা :

প্রতিদিন যা হয়, ঈদে যেন তার চেয়ে আরও বেশি ঘটল। ঈদের ছুটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়ে গেল অর্ধশতাধিক প্রাণ। টেলিভিশেনের স্ক্রলে, পত্রিকার অনলাইনে মানুষ নীরবে এসব মর্মান্তিক মৃত্যু দেখেছে। আরও দেখবে।

সিরাজগঞ্জে ঈদের পরদিন দুর্ঘটনায় নিহত ১৭ জনের মধ্যে একজনের মৃতদেহ সামনে রেখে টেলিভিশন রিপোর্টারদের উদ্দেশে একজন বলছিলেন, আমার ভাইয়ের এই রক্তাক্ত দেহ এখানে কেন? কেন চালকদের বেপোরোয়া গাড়ি চালনায় প্রতিদিন মানুষ মরবে? তাহলে রাস্তায় পুলিশ কেন আছে? তাহলে মন্ত্রীরা কেন আছে? এ সব প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই। শুধু আমরা শুনে যাই, কিছু কথাবার্তা হয় একটি বড় ঘটনার পর, আবার সব ভুলে যাই।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় যেভাবে মানুষ মরছে, তাকে গণহত্যা বললে নিশ্চয় অত্যুক্তি হবে না। প্রতি হাজার নাগরিকের বিপরীতে গাড়ির সংখ্যা সবচেয়ে কম হওয়ার পরও সারাবিশ্বের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় সর্বাধিক মানুষ নিহত হচ্ছে বাংলাদেশে। ভয়ানক মহামারীর মতো অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে সড়ক দুর্ঘটনা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা সেন্টারের এক হিসাব অনুযায়ী প্রতি ১০ হাজার যানবাহনে বাংলাদেশে বছরে মৃত্যু হয় ৮৫টি। পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় এ হার প্রায় ৫০ গুণ বেশি। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বাংলাদেশের জিডিপির অন্তত দুই শতাংশ হারিয়ে যায়।

সড়ক দুর্ঘটনা, নিত্য দিনের ঘটনা। প্রতিদিন ঝরে যাচ্ছে বহু তাজা প্রাণ। থমকে যাচ্ছে বহু পরিবার। পঙ্গু হাসপাতালে গেলে এর ভয়াবহতা বোঝা যায়। সড়ক দুর্ঘটনায় বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কে আছে এ সব দেখার? এ দেশের সবচেয়ে উচ্ছৃঙ্খল খাত পরিবহন খাত। কিছুই বলা যায় না এদের। এরা মানুষ মারবে, পুলিশ ধরলে ধর্মঘট ডাকবে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকুক, এ খাতের শ্রমিক ইউনিয়ন বা মালিক সমিতির কর্তারা থাকেন ক্ষমতার কেন্দ্রে, যেমন এ সরকারেও আছেন দুজন মন্ত্রী। ক্ষমতায় এরা এমন অবস্থানে, যেকোনও দুর্ঘটনার এ সব হত্যাকাণ্ডে শেষ পর্যন্ত ভিকটিমরাই আবারও ভিকটিম পরিণত হন।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা সেন্টারের এক হিসাব অনুযায়ী প্রতি ১০ হাজার যানবাহনে বাংলাদেশে বছরে মৃত্যু হয় ৮৫টি। পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় এ হার প্রায় ৫০ গুণ বেশি। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বাংলাদেশের জিডিপির অন্তত দুই শতাংশ হারিয়ে যায়।

বেশিরভাগ দুর্ঘটনার পর এখন আর মামলা হয় না। কারণ, এ সব মামলার কোনও সুরাহা হয় না, বিচার হয় না। বিচারহীনতার কোনও সংস্কৃতি যদি এদেশে পাকাপোক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, তবে তা হবে এই পরিবহন খাত। এখানে আইন কখনোই তার নিজের গতিতে চলে না। সেই এরশাদ জামানায় মালিক শ্রমিকরা ধর্মঘট করে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রহিত করার দাবি আদায়ের পর থেকে দেশের জনসংখ্যা কমানোর একক দায়িত্ব এখন তাদের হাতে।

সিরাজগঞ্জে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে যে বাস দুর্ঘটনায় সেখানে বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা সবাই বলেছেন, তারা বারবার চালককে সাবধান করলেও চালক বেপোরোয়া গতিতেই গাড়ি যাচ্ছিল। এই যে, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নির্দিষ্ট গতিসীমা না মেনে গাড়ি চালানো, তার কারণ হলো, এই চালক মহাশয় জানেন তার কিছুই হবে না। conflict of interest বা স্বার্থের দ্বান্দ্বিকতার চরম দৃষ্টান্ত এখন বর্তমান। পরিবহন খাতের শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা মন্ত্রী, মালিক সমিতির নেতা প্রতিমন্ত্রী। তাহলে তো এই চালকরা ভাবতেই পারে, এদের বিরুদ্ধে নীতি নির্ধারণী জায়গা থেকে কোনও শাস্তির সুপারিশই আসবে না।

কারণ আরও আছে। যেমন, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা; মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী বা পণ্য পরিবহন; গাড়ি চালানোর আইন সম্পর্কে ধারণা না থাকা; বিপজ্জনকভাবে ওভারটেক করা; প্রতিযোগিতা করা, সামনের গাড়ির সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় না রাখা; ত্রুটিপূর্ণভাবে গাড়ি চালানো; চালকের বদলে সহকারী দিয়ে গাড়ি চালানো; ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে অসচেতনভাবে গাড়ি চালানো; যথাসময়ে যথোপযুক্ত সংকেত দিতে ব্যর্থতা; যথাযথ লেনে গাড়ি না চালানো; প্রয়োজনীয় বিশ্রাম না নিয়ে অবসাদগ্রস্ত অবস্থায় একটানা গাড়ি চালানো; নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো; মানসিক অস্থিরতা বা অতিরিক্ত চাপ ও শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে গাড়ি চালানো; দৈহিক অযোগ্যতা নিয়ে গাড়ি চালানো, শিক্ষার স্বল্পতা এবং পেশাগত জ্ঞানের অপর্যাপ্ততা। আর আছে ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তাঘাট। মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগ সড়কগুলো পরিকল্পনাহীনভাবে নির্মিত।

এ সব কারণে সুনির্দিষ্ট করে শুধু এটুকু বলা যায়, সড়ক নির্মাণ, এর রক্ষণাবেক্ষণ, এর ব্যবস্থাপনা, গাড়ির রুট পারমিট, ফিটনেস, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং এ সংক্রান্ত আইন প্রয়োগকারী, প্রায় সবাই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। ফলে এখানে বিচারে আশা করা বাতুলতা মাত্র।

পুলিশের হিসাবে প্রতি বছর বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত তিন হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্র বলছে, প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও অনেক বেশি। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী এই সংখ্যাটি ১২ হাজার থেকে ২০ হাজারও হতে পারে। আর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া শতকরা ৫৪ ভাগই পথচারী। পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর ৪৬ শতাংশই সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত।

পুলিশের সঙ্গে কথা বলবেন, বলবে, দোষ সব পথচারীদের। কারণ, তারা রাস্তা পার হতে জানে না। যত সহজে পথচারীদের দোষ দেন তারা, তার সিকিভাগও চেষ্টা করেন না রাস্তায় গাড়িতে-গাড়িতে রেষারেষি বন্ধ করার দিকে।

ব্র্যাকের চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, নয়টি জাতীয় মহাসড়কের ৫৭ কিলোমিটার এলাকার মধ্যেই দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। ওই গবেষণায় সড়ক-মহাসড়কের ২০৮টি স্থানকেই প্রধানত দুর্ঘটনাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে ২০২০ সালের মধ্যেই দেশে দুর্ঘটনার সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। সংস্থার সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক বৈশ্বিক প্রতিবেদন ২০১৩-এ বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ১.৬ শতাংশ।

বিভিন্ন মহলের বহু দাবির পর দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোকে ঝুঁকিমুক্ত করতে ১৬৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সড়ক বিভাগ। প্রকল্পের আওতায় ২০১৬ সালের জুনের মধ্যে মহাসড়কের বাঁকগুলো সোজা করা, পথচারীর পারাপার ব্যবস্থার উন্নয়ন, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা অপসারণ, সিগন্যাল ও রোড মার্কিং স্থাপন করা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত উন্নতির কোনও লক্ষণ নেই।

নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের প্রধান, চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন সম্প্রতি আমার সঞ্চলানায় এক টক-শোয় বলেছেন, দেশের চালক-পথচারী কেউই ঠিকমতো আইন মানেন না। অপরাধের কোনও শাস্তিও হয় না, তাই এমন মৃত্যু কমানো যাচ্ছে না। সরকার নানা সময় বলে নানা আইনের কথা। কিন্তু এখনও যেসব আইন আছে, সেগুলো প্রয়োগের দিকে কি নজর আছে? তা করলেও দুর্ঘটনা অনেক কমত।

একটি কাজ যদি করা যায়, তাহলেও কিছুটা ফল পাওয়া যেত। প্রতিটা সড়ক দুর্ঘটনার জন্য প্রথমে দায়ী করতে হবে চালককে। ক্রটিযুক্ত গাড়ির কারণে দুর্ঘটনা ঘটলেও এর জন্য দায়ী চালক। কারণ, গাড়ির সবকিছু ঠিক না থাকলে একজন ড্রাইভার সড়কে গাড়ি বের করেন কেন?  বেশি বেপরোয়া দূর পাল্লার বাসের চালকেরা, তেমনি ট্রাকগুলোও। এসব চালক কখনও ভাবেন না যে তাদের ওপর নির্ভর করছে সমস্ত যাত্রীর জীবন, যাত্রীদের পরিবারের সদস্যদের জীবন। বেশির ভাগ চালক লেখাপড়া জানেন না। তাদের রোড সাইন সম্পর্কে তেমন কোনও ধারণা নেই। গাড়ি চালনার সময় কোথায় ওভারটেক করা যাবে এবং কোথায় যাবে না সে বিষয়ে তাদের কোনও ধারণা নেই। অথচ এদেরই বাছবিচার না করে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে হাজার-হাজার।

বড় দুর্ঘটনা ঘটলে মন্ত্রীরা ছুটে যান, সরকারি কর্মকর্তারা ছুটে যান। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় না। কারণ আইনের প্রয়োগ হয় না। প্রতিটি বাস এবং ট্রাকে বিআরটিএ কর্তৃক সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৬০-৭০ কিলোমিটার নির্ধারণ করে দিয়ে গভর্নর সিল সংযুক্ত করে দেওয়া এখনই জরুরি। চালক এই সিল পরিবর্তন করার চেষ্টা করলে অবশ্যই গাড়ি আটকের মাধ্যমে শাস্তি দিতে হবে। একই সঙ্গে জেলা পুলিশ এবং হাইওয়ে পুলিশকে পর্যাপ্ত স্পিড ডিটেক্টর দেওয়া যেতে পারে। আর শাস্তি হতে হবে নগদ-নগদ, সড়কেই, যেন তারা তদ্বিরের সুযোগ না পায়।

বাংলাদেশের রাজনীতি যেমন নৈরাজ্যপূর্ণ, গণস্বার্থবিরোধী, এই পরিবহন খাতও তেমনি। এখানে মানুষের জীবনের মূল্য কখনোই বিবেচনা করা হয়নি। বারবারই দেখা গেছে হত্যাকারীদের বাঁচানোর প্রচেষ্টা। যেদিন মানুষের জীবনের মূল্যায়ন করা হবে, সেদিনই হয়তো সম্ভব হবে এই মৃত্যুর মিছিল কমানোর।

লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন