June 23, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

কোমেনের আঘাতে বিধ্বস্ত উপকূল

কক্সবাজার প্রতিনিধিঃ ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’র আঘাতে বিধ্বস্ত হয়েছে কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলসমূহ।  এর ভয়াল থাবায় চরম উৎকণ্ঠায় দিন পার করছে উপকূলীয় অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ।
এ দিকে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে টেকনাফে কয়েক হাজার বসবাড়ি  লণ্ডভণ্ড হয়েছে। বাস্তুহারা হয়েছে টেকনাফের কয়েক হাজার পরিবার।
‘কোমেন’ এর প্রভাবে কক্সবাজারের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা থেকে বঙ্গোপসাগরের পানির উচ্চতা ৫ থেকে ৭ ফুট প্রবাহিত হয়ে জেলার আট উপজেলার ২৮টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়। কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক জানান, জেলার অধিকাংশ নিম্নাঞ্চলে ৩-৫ ফুট পানি উঠেছে। যার কারণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তবে জেলা প্রশাসনের  পূর্ব প্রস্তুতি থাকায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী মোহাম্মদ সবিবুর রহমান জানান, বাঁকখালী নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে ৩৪ সেন্টিমিটারে প্রবাহিত হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে এই পানির স্তর থাকে এর ১০ সেন্টিমিটার নিচে। তবে মাতামুহুরীর পানির উচ্চতা স্বাভাবিক রয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, জলোচ্ছ্বাসে সদর উপজেলার ছয়টি, রামুর একটি, চকরিয়ার চারটি, পেকুয়ার চারটি, কুতুবদিয়ার সাতটি, মহেশখালীর তিনটি, উখিয়ার একটি ও টেকনাফের দুটি ইউনিয়ন ঘূর্ণিঝড় ‘কোমেন’ এর প্রভাবে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক ড. অনুপম সাহা জানান, পুরো জেলায় আশ্রয়কেন্দ্রে খোলা হয়েছে ৯৬টি। প্রত্যেকটি ইউনিয়নে রয়েছে উদ্ধার বাহিনী।
উদ্ধার ও উদ্ধার-পরবর্তী কাজের জন্য রয়েছে ১০টি স্পিডবোট ও সাতটি বাস ও একাধিক ট্রাক ত্রাণ পরিবহণের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার জেলার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে আশ্রয়কেন্দ্রে হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রতিটি আশ্রযকেন্দ্রে সেবা নিশ্চিত করার জন্য একজন করে প্রতম শ্রেণির কর্মকর্তা রয়েছেন। বর্তমানে আশ্রযকেন্দ্রগুলোতে উপকূলীয় এলাকার লোকজন আশ্রয় নিয়েছে। জেলা প্রশাসনের পূর্ব প্রস্তুতি থাকায় তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
কক্সবাজার সিভিল সার্জন কমল উদ্দীন জানান, আসন্ন দুর্যোগে সার্বিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সকল চিকিৎসক ও নার্সদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। পুরো জেলায় ৮৮টি মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। তার মধ্যে ৭১টি হলো প্রতিটি ইউনিয়নে। আর ১৭টি হলো ভ্রাম্যমাণ মেডিক্যাল টিম।

cox komenপ্রাকৃতিক ঘূর্নিঝড় কোমেনের আঘাতে সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্রায় তিন কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বুধবার রাত ১১টা হতে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত টানা দশ ঘন্টা ধরে বয়ে যাওয়া ভয়ানক কোমেনে ক্ষতবিক্ষত করে দেয় বসবাসরত ১০ হাজার মানুষের সেন্টমার্টিনকে।

এতে ভেঙ্গে যায় প্রায় ৪শত ঘরবাড়ী। নষ্ট হয়ে যায় ঘরে থাকা আসবাপত্রসহ সব প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। ভেঙ্গে পড়ে সব ধরণের গাছ। মরে যায় কয়েকশ গবাদি পশু। হারিয়ে যায় থাকার একমাত্র ঘরের চিহ্নটিও।

উড়ে যায় ঘরের ছাউনি এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। পানিতে তলিয়ে যায় ফসলি জমি। হারিয়ে যায় ২টি ফিশিং ট্রলার, ১টি সার্ভিস বোট, ডুবে যায় বড়-ছোট ৮টি নৌকা। এতে সেন্টমার্টিন দ্বীপে প্রায় তিন কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়।

বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় গাছচাপা পড়ে মরে যায় দিন মজুরী মোঃ ইসলাম(৫০)। তার বাড়িতে গেলে পরিবারের বিলাপের কান্নায় যেন আকাশ ভেঙ্গে মাটিতে পড়ছে।

মৃত্যুর ঘটনা জানতে চাইলে তার স্ত্রী আয়েশা বেগম বলেন, আমার স্বামী ভোর সকালে ফজরে নামাজ পড়ার জন্য ওযুর পানি নিতে ঘরের বাহিরের টিউবওয়েলে গেলে নারিকেল গাছের চাপা পড়ে মারা যান।
অন্যদিকে ঘরবাড়ি ছাড়া হয়েছে ৪শ পরিবারের মানুষ।
সেন্টমার্টিন প্যানেল চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান বলেন,এধরনের বিধ্বস্ত সেন্টমার্টিনে আর ঘটেনি। ক্ষয়ক্ষতির সত্যতা প্রকাশ করেন।
তিনি আরো জানান,ইউনিয়ন পরিষদের  উদ্যোগে ত্রান সহায়তা করা হবে,তবে টেকনাফের সাথে যোগাযোগ বিকল ঘটার কারণে টেকনাফ থেকে ত্রান সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছেনা।
দ্বীপের পুলিশ ফাড়ি ইনচার্য হারুনুর রশিদ বলেন, সেন্টমার্টিনের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে উপরে জানানো হয়েছে। আশা করছি রাতারাতি কাজ হবে।
সরকার এবং বিভিন্ন সহায়তাকারীর প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে আছে পুরো দ্বীপবাসী।

টেকনাফে কৃষিখাতে ১০কোটি টাকারও বেশী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতির পাশাপাশি জীবনযাত্রায় দুর্বিষহ দেখা দিয়েছে। কৃষি ও মৎস্য অধিদপ্তর সুত্র জানায়, ৩০জুলাই বৃহস্পতিবার ভোর রাতের ঘুর্ণিঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট তীব্র বাতাসে মৎস্যঘের ও ধানী জমি পানিতে একাকার হয়ে গেছে। এতে ২৫০টি চিংড়ী খামার ও ২০০টি পুকুরের মাছ পানিতে তলিয়ে যায়। যাতে অন্তত ১০কোটি টাকারও বেশী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে মৎস্য অধিদপ্তর দাবী করছে।

অন্যদিকে ১০৫হেক্টর বীজতলা, ২০হেক্টর শাক সবজি, ৮হেক্টর পান, ৫০ হেক্টর আমন ধান সহ প্রায় ৩০লক্ষাধিক টাকা কৃষিকের ক্ষতি হয়েছে বলে কৃষি অফিস সুত্র জানিয়েছে।

এলিট এ্যাকুয়া কালচারের কর্ণধার শিল্পপতি, সমাজ সেবক আলহাজ্ব এইচ.কে.আনোয়ার সিআইপি জানান, এবছরের ঝড়-বৃষ্টি অতীতকে হার মানিয়েছে। নদীর পানি এবং পাহাড়ী ঢল মৎস্যঘেরের সাথে একাকার হয়ে গেছে। সিনিয়র উপজেলা মৎস্য অফিসার সৈয়দ হুমায়ুন মোর্শেদ মৎস্যখাতে প্রায় ১০কোটি টাকার ক্ষতির কথা স্বীকার করে বলেন, ৭-৮দিন ধরে সিগন্যাল থাকায় জেলেরা নদীতে মাছ শিকার করতে না পারায় তাদের জীবনযাত্রায় অনেকটা দুর্বিষহ দেখা দিয়েছে।