September 19, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

ড. কামালের নেতৃত্বে রাজনৈতিক জোট গঠনের চেষ্টা

ডেস্ক প্রতিবেদন : হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির নেতাদের নিয়ে দুই জোটের বাইরে তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি উত্থানের চেষ্টা করছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। এ লক্ষ্যে দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে শতাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে বৃহস্পতিবার চা-চক্রের মাধ্যমে মতবিনিময় সভা করেছেন তিনি।

নাগরিকদের পক্ষ থেকে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে নাগরিকদের পক্ষ থেকে ‘জাতীয় সনদ’ তৈরির যে প্রক্রিয়া চলছে তাতে চা-চক্রে উপস্থিত নেতাদের সমর্থন থাকবে বলেও জানিয়েছেন ড. কামাল হোসেন।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী নেতা, শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী ও শিক্ষার্থীরা এ চক্রে উপস্থিত ছিলেন। রাজধানীর কাকরাইলে হোটেল ঈশা খাঁতে বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৬টা পর্যন্ত চা-চক্র অনুষ্ঠিত হয়।

চা-চক্রে বক্তব্য রাখেন ’৯০-এর শহীদ ডা. মিলনের মা সেলিনা আকতার, আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, সাবেক বিচারপতি আওলাদ আলী, বিকল্পধারা বাংলাদেশের মহাসচিব মেজর (অব.) মান্নান, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জি এম কাদের, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এস এম কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া, সাংবাদিক মোস্তফা কামাল মজুমদার, আবু সাঈদ খান, তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদক ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, শ্রমিক নেতা মাহবুবুর রহমান ইসমাইল, ফরোয়ার্ড পার্টির সভাপতি আ ব ম মোস্তফা আমিন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের নেতা বজলুর রশিদ ফিরোজ, নাগরিক ঐক্যের উপদেষ্টা এস এম আকরাম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক রতন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. দিলারা চৌধুরী, নটর ডেম ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর বেঞ্জামিন ডি কস্টা, আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী, খসরুজ্জামান, এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন, ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি লিটন নন্দী প্রমুখ।

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও এরশাদের ছোটভাই গোলাম মোহাম্মদ কাদের (জিএম) কাদের চা-চক্রে বলেন, ‘আমাদের এখন আরেকটা সংগ্রাম করার সময় এসেছে। এ দেশে এখন প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি নেই। দেশের জনগণও তাই এখন রাজনীতির সঙ্গে নেই। দেশের মানুষ যে দেশের জনগণ এটাও তারা বলতে পারছেন না।’

তিনি বলেন, ‘আলোচনা করে আর কোনো সমাধান হবে না। যে কোনো আন্দোলনের জন্য একজন নেতা দরকার। ছোট হলেও একটি গ্রহণযোগ্য এজেন্ডা নিয়ে আমাদের বসতে হবে। তারপর আমাদের আন্দোলনে নামতে হবে। আন্দোলনের মাধ্যমেই এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। ড. কামাল চাইলেই আমাদের পাশে পাবেন।’

সূচনা বক্তব্যে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘এ দেশের জনগণ গুম-খুনের ভয়ে ভীত। এভাবে দেশ চলতে পারে না। দেশে এত বিভাজন যে, আমরা একে অন্যের মুখ পর্যন্ত দেখি না। আমরা এখানে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসেছি।’

ড. কামাল বলেন, ‘১৯৫২ সালে আমরা কতগুলো মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্যে এসেছিলাম। এটা সারা জাতির মধ্যে নাড়া দিয়েছিল। এবারও আমাদের ন্যূনতম কিছু বিষয়ে ঐকমত্য হতে হবে। তাহলে ১৯৫২ সালের ঐকমত্যে যেমন ১৯৫৪ সালে আমাদের বিজয় এনেছিল। এবারও আমার বিজয় হবে।’

তিনি বলেন, ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা পেতে না নেওয়া বাংলার চরিত্র। আমরা কখনই অন্যায়ের কাছে মাথা পেতে নেইনি। স্বৈরাচাররা ভাবে, জনগণকে ভয় দেখালেই তারা চুপ হয়ে যাবে। কিন্তু স্বৈরাচাররা জানে না, ব্যতিক্রম ছাড়া তারা কখনই টিকে থাকতে পারে না।’

ড. কামাল বলেন, ‘আমার জীবন থেকে রিটায়ার্ড করার সময় এসেছে কিন্তু আমি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে পারি না। আমাদের দেখে অনেকে বলতে পারেন, এটা ১৯৫২ না, এটা ২০১৫। আমি বলব, ২০১৫ সালের বাংলাদেশ ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে না। এই দেশ কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়। আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই হবে।’

এ সময় ড. কামাল হোসেন আরও বলেন, ‘একদলীয় শাসন যেমন আমরা ঘৃণা করি, তেমনি এক ব্যক্তির শাসনও আমরা ঘৃণা করি। এ থেকে মুক্তির জন্য নাগরিকরা জাতীয় সনদ তৈরি করছে। সেখানে আমাদের সমর্থন থাকবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. বোরহান উদ্দিন খান বলেন, ‘দেশ গড়ার জন্য নীতি, নেতা ও নেতা-নীতির সমন্বয়ের অভাব।’

সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বিএনপির প্রতি আক্রমণাত্মক আর জামায়াতের প্রতি নমনীয়। এটা আওয়ামী লীগ ও দেশের জন্য আত্মঘাতী। আওয়ামী লীগ আপদ আর বিএনপি বিপদ। এ থেকে আমাদের মুক্তির পথ খুঁজতে হবে।’

বিকল্পধারা বাংলাদেশের মহাসচিব মেজর (অব.) মান্নান বলেন, ‘অনেকে মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের কিছু করার নেই। কিন্তু করার অনেক কিছুই আছে। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিভাগীয় ও জেলা শহরে নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ করি তাহলে এই অবস্থার পরিবর্তন হবে। এখন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রধান চ্যালেঞ্জ।’

সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এস এম কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের মানুষ ভয় করে সম্মান করে না।’

ডা. মিলনের মা সেলিনা আকতার বলেন, ‘আমরা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। ’৯০-এ স্বৈরাচারের পতন হয়েছিল কিন্তু এখনো আমরা গণতন্ত্রের সুফল পাইনি। গণতন্ত্রের জন্য আমার সন্তান জীবন দিয়েছে। আমরা চাই দেশে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হোক।’

আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মোহাম্মদ মনসুর বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে এখানে এসেছি। ভোটারবিহীন নির্বাচন, ভোটারবিহীন গণতন্ত্র ও মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে আমরা এখানে এসেছি।’

মনসুর বলেন, ‘দেশের এ অবস্থা চলতে পারে না। এর একটা স্থায়ী সমাধান দরকার। এ জন্য ড. কামাল জাতির বিবেক হিসেবে যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তার সঙ্গে আমরা আছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় ঐক্য দরকার। আমরা যে যেখানে আছি আমাদের সেখান থেকেই যদি আমরা সাদাকে সাদা আর কালো কে কালো বলি তাহলেই এই ঐক্য তৈরি হবে।’

সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, ‘সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে এ জন্য ধন্যবাদ। তাই বলে গণতন্ত্রের গলা টিপে ধরবে এটা হবে না।’

নাগরিক ঐক্যের উপদেষ্টা এস এম আকরাম বলেন, ‘এখন সময় এসেছে নতুন কিছু করার। তবে আমাদের সাবধান থাকতে হবে, সরকার নতুন করে ষড়যন্ত্র করতে পারে। মান্নাকে যেভাবে টেলিফোন সংলাপ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সরকার আটক করেছে আমাদের ওপরও এই খড়গ নেমে আসতে পারে। কারণ, এই সরকার নির্বাচিত স্বৈরাচার।’