June 22, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

বিদেশী শিল্পীদের কর ফাঁকিতে ছাড় নয়

ডেস্ক প্রতিবেদন : বিদেশী শিল্পীরা ঘণ্টাখানেক সময় গান পরিবেশন করেন। বিনিময়ে পারিশ্রমিক নিয়ে থাকেন লাখ লাখ টাকা। এই পারিশ্রমিক কীভাবে পরিশোধ করা হচ্ছে, এর বিপরীতে দেওয়া করের পরিমাণ সঠিক কিনা, চুক্তির কাজগপত্র প্রকাশ না করায় তা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

পাশাপাশি স্টেজ শো, কনসার্টে বিদেশী শিল্পীদের প্রাধান্য দেওয়ায় দেশীয় শিল্পীদের সমৃদ্ধ হওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশেষ দিবস উপলক্ষে দেশের নামকরা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতীয় শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকে। এর বাইরে বছরের বিভিন্ন সময় দেশের অভিজাত ক্লাবগুলো তাদের সদস্যদের মনোরঞ্জনেও শিল্পীদের এনে নাচ-গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এ সব অনুষ্ঠান নির্বিঘ্ন করতে মন্ত্রী-এমপিরাও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে ডিও লেটার পাঠান। বিগত কয়েক বছর যাবৎ এই ধারা বৃদ্ধি পেয়েছে।

সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে অনুমতি ছাড়া ভারতীয় শিল্পী নচিকেতাকে দিয়ে গান পরিবেশন করানোয় বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) ডিজিকে (মহাপরিচালক) চিঠি পাঠানো হয়েছে। কর পরিশোধের তাগাদা দেওয়া চিঠির উত্তরে বিটিভি থেকে জানানো হয়, ‘দেশবরেণ্য এক সাংবাদিকের আমন্ত্রণে ওই শিল্পী ঢাকায় এসেছিলেন। এ জন্য তাকে কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয়নি। তাই কর পরিশোধ সম্ভব নয়।’

নিয়ম অনুযায়ী বিদেশী শিল্পীদের দিয়ে অনুষ্ঠান পরিবেশন করার আগে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, এনবিআর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নেওয়া লাগে। শিল্পীর পাসপোর্ট নম্বর, কোথায়, কখন অনুষ্ঠান হবে, কতদিন অবস্থান করবেন তার বর্ণনাসহ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হয়। এনবিআর পারিশ্রমিকের বিপরীতে কর পরিশোধ ও পুলিশি নিরাপত্তার বিষয়ে অনুমতি দিলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে থাকে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়ার পরই কোনো বিদেশী শিল্পী দেশের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারেন।

জানা গেছে, অনুমতি চাওয়ার সময় ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশী শিল্পীদের সঙ্গে চুক্তির কাগজপত্র দাখিল করে না। শুধুমাত্র পাসপোর্টের নম্বর দিয়ে আবেদন করে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও এনবিআরে প্রায় প্রতিদিনই এ ধরনের আবেদন জমা পড়ে। কর ফাঁকি দিতে শিল্পীর পারিশ্রমিকের অংক গোপন করা হয়। কারণ বিদেশী শিল্পীদের পারিশ্রমিকের ওপর ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানকে কর দিতে হয়। আবার অনেক সময় বিনিয়োগ বোর্ডের অনুমতি নিয়ে টুরিস্ট ভিসায় শিল্পীদের এনে অনুষ্ঠান করানো হচ্ছে।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে বিদেশী শিল্পীদের পারিশ্রমিকের ওপর ৩০ শতাংশ উৎসে কর আরোপ করা হয়েছে। এ ছাড়াও এই তালিকায় রয়েছে বিদেশী খেলোয়াড়, বিদেশী হিসাব ও কর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, প্রাক-জাহাজীকরণ পরিদর্শন সেবা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি।

এনবিআর সূত্র জানায়, বিদেশী শিল্পীরা কত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে আসছেন জানতে চাইলে বলা হয়, শিল্পী প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচিত তাই পারিশ্রমিক নিচ্ছেন না। আবার অনেকেই প্রকৃত পারিশ্রমিক গোপন করে কর ফাঁকি দেন। মাঝেমধ্যে শিল্পীর প্রকৃত পারিশ্রমিক আন্দাজ করতে ওয়েবসাইটের সাহায্য নিয়ে আয়কর আদায় করা হয়। তবে যতটুকু কর আদায় করা হয় তা যৎসামান্য।

সূত্র আরও জানায়, বিদেশী শিল্পীদের পারিশ্রমিক পরিশোধে বড় ধরনের গলদ রয়েছে। ব্যাংক লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে নাকি নগদ দেওয়া হচ্ছে তা আবেদনে বলা হয় না। এ সবের হিসাব চাইলে নানাভাবে অসহযোগিতা করা হয়। প্রভাবশালীদের তদবির তো রয়েছেই। ফলে এ খাতে যে কর আদায় করা হয় তা একেবারেই সামান্য। এক্ষেত্রে মুদ্রাপাচারের আশঙ্কা থাকতে পারে বলে সূত্র জানায়।

এ প্রসঙ্গে এনবিআরের কর প্রশাসন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সদস্য আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘ট্যুরিস্ট ভিসায় বিদেশী শিল্পীদের এনে অনুষ্ঠান করানো হচ্ছে— এ ধরনের কয়েকটি অভিযোগ পেয়েছি। এ সব অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কর ফাঁকির প্রমাণ পেলে পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে না।’

বিদেশী শিল্পীদের দিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজনের ফলে দেশীয় শিল্পীদের সমৃদ্ধ হওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন দেশীয় শিল্পীরা। তারা মনে করেন, বিধিনিষেধের কড়াকড়ি না থাকায় হরহামেশাই বিদেশী শিল্পীরা বাংলাদেশে এসে অনুষ্ঠান করে যাচ্ছেন। এতে দেশী শিল্পীদের উৎসাহ ও প্রণোদনা দেওয়ার মানসিকতাও হারাচ্ছেন পৃষ্ঠপোষকরা। অন্যদিকে এ দেশের শিল্পীদের বিদেশে গিয়ে অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিনিয়তই প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়।

এ প্রসঙ্গে কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, ‘আমাদের দেশে বিভিন্ন সময় বিদেশী শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে। এতে আমাদের তরুণ শিল্পীদের সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগ আছে। তবে আমাদের দেশের শিল্পীরা কোনো অংশেই বিদেশী শিল্পীদের চেয়ে কম নন। ইভেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত তাদের সঠিকভাবে উপস্থাপন করা।’

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান ‘ইভেন্ট সিটি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হাসান ই আহমেদ তমাল বলেন, বিদেশী শিল্পীদের ট্যাক্স নিতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এ ব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। আয়োজকরা অনেকে কৌশলে ট্যাক্স ফাঁকি দেন। তবে এটা ঠিক নয়।

তিনি আরও বলেন, বিদেশী শিল্পীদের ঘন ঘন উপস্থিতি দেশের শিল্পীদের বিকাশের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই যে কোনো আয়োজনেই হুটহাট বিদেশী শিল্পীদের ডেকে আনা ঠিক নয়।

অন্যদিকে সঙ্গীতশিল্পী তপু বলেন, বিদেশী শিল্পীরা এ দেশে এলে তাদের যথাযথ সম্মান দেখাতে হবে। তবে এটা করতে গিয়ে দেশী শিল্পীদের অবমূল্যায়ন করাও ঠিক হবে না। আর কর ফাঁকির বিষয়টি তো দেখবে সরকার। তবে যে সব আয়োজক বিদেশী শিল্পীদের কর ফাঁকিতে সহযোগিতা করেন তাদের দেশপ্রেম নেই।