September 18, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ দুটি নাম একটি ইতিহাস: গভর্নর

নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ৪০তম শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে এক বক্তৃতায় ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ দুটি নাম, একটি ইতিহাস বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান। সোমবার বিকেলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ৪০তম শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বাংলা একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে নিয়ে তিনি বলেন, ‘উভয়ে যেন মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পথিকৃৎ।’

গভর্নর বলেন, ‘১৯৭৫ সালের পনের আগস্ট মানব ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডে সপরিবারে প্রাণ হারান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই আগস্ট বাঙালির শোকের মাস। এর আগে বঙ্গবন্ধুর চল্লিশতম শাহাদাত বার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বাংলা একাডেমি আয়োজিত এমন একটি তাৎপর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানে কিছু বলার সুযোগ পাওয়ায় আমি সত্যিই গর্বিত। শুরুতেই আমি বিনম্র শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকার, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যাঁর বিশাল অস্তিত্ব পড়ে আছে বাংলাদেশের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে, যাঁর জন্ম না হলে স্বাধীন সার্বভৌম ভূখ- হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম হতো না। এ কারণেই একথা বললে ভুল হবে না যে, বাংলাদেশের আরেক নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’

বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কবি রফিক আজাদের ‘এই সিঁড়ি’ কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘এ দেশের যা-কিছু তা হোক না নগণ্য, ক্ষুদ্র তাঁর চোখে মূল্যবান ছিল নিজের জীবনই শুধু তাঁর কাছে খুব তুচ্ছ ছিল; স্বদেশের মানচিত্র জুড়ে পড়ে আছে বিশাল শরীর….।’ বাল্যকাল ও কৈশোর থেকে সংগ্রাম শুরু করা বঙ্গবন্ধু সারাজীবন একটিই সাধনা করেছেন  আর তা হচ্ছে বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করা।

তিনি বলেন, ‘তোমাদের এখানে মুসলিম লীগ করা হয় নাই?’ সোহরাওয়ার্দীর এমন প্রশ্নের জবাবে অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া শেখ মুজিব সেদিন বলেছিলেন, ‘কোনো প্রতিষ্ঠান নাই, মুসলিম ছাত্রলীগও নাই।’ এভাবেই শেখ মুজিব পারিবারিক ও একাডেমিক গণ্ডি ছাপিয়ে স্কুলজীবনেই দেশ ও দশের কাজে জড়িয়ে পড়ে একজন সচেতন রাজনৈতিক কর্মী হয়ে ওঠেন।’

আতিউর বলেন, ‘ভুলে গেলে চলবে না ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্বে নেতৃত্ব দেন শেখ মুজিব এবং তাঁর সহযোগীবৃন্দ। ঐ বছর ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন এবং ১১ মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি’ দিবস ঘোষণা করা হয়। স বাংলা ভাষার দাবিতে সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ১১ মার্চ ধর্মঘট পালনকালে শেখ মুজিবসহ আরো কয়েকজন গ্রেফতার ও কারাবন্দী হন যা ছিল মাতৃভাষার আন্দোলনে প্রথম কারাবরণ। এজন্য বায়ান্নর আগে ১১ মার্চই ছিল ‘ভাষা দিবস’। ১৯ মার্চ জিন্নাহ ঢাকা ত্যাগ করার কয়েকদিন পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় একজন ছাত্র বলে, জিন্নাহ যা বলবেন, তাই আমাদের মানতে হবে। তিনি যখন উর্দুই রাষ্ট্রভাষা বলেছেন তখন উর্দুই হবে। তখন শেখ মুজিব তার প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, ‘কোনো নেতা যদি অন্যায় কাজ করতে বলেন, তার প্রতিবাদ করা এবং তাকে বুঝিয়ে বলার অধিকার জনগণের আছে। বাংলা পাকিস্তানের ছাপ্পান্ন শতাংশ লোকের মাতৃভাষা, সংখ্যাগুরুদের দাবি মানতেই হবে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা না হওয়া পর্যন্ত আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাব।’

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর কথা এবং বক্তৃতায় প্রায়ই উদ্ধৃত হতো বাঙালি কবিদের কবিতার চরণ। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল ছিলেন তাঁর অভয়মন্ত্র। দীর্ঘ নয় মাস চৌদ্দ দিন কারাবাসের পর পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে ১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারি রেসকোর্সের ঐতিহাসিক গণসমুদ্রে তিনি বলেন, ‘সাত কোটি বাঙালিরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি।’ অশ্রুসিক্ত নয়নে উচ্চকিত হন এই বলে, ‘কবিগুরু, তুমি এসে দেখে যাও, তোমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে, তুমি ভুল প্রমাণিত হয়েছো, তোমার কথা আজ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে…।’

জাতির পিতা সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য এবং নির্লজ্জ মিথ্যাচার করে নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন ‘আমি বিশ্বাস করি, স্বাধীনতার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করে কিংবা জাতির পিতাকে অস্বীকার করে বাংলাদেশে কেউ টিকে থাকতে পারবে না।’

বক্তব্যে তিনি আরো জানান, ‘গত ছয় বছরে আমদানি বেড়েছে ৭৫ শতাংশ, রপ্তানি বেড়েছে দ্বিগুণ, রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তিনগুণের বেশি বেড়ে ২৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। বৈদেশিক অর্থনৈতিক খাতের এই শক্তির জোরেই আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করে চলেছি। বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি মন্দার পরিবেশেও গড়ে ৬.২ শতাংশেরও বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে বাংলাদেশ। মাথাপিছু আয় দ্বিগুণের বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩১৪ ডলার। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে একটি উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত একটি সমৃদ্ধ জাতি গড়ার পথে বাংলাদেশের তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনহিতৈষী পদক্ষেপ, উন্নত রাষ্ট্রচিন্তা, স্থিতিশীল অর্থনীতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা উজ্জীবিত করার মাধ্যমে দেশকে জোরকদমে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার কাজে তিনি তাঁর ধ্যান, মন, প্রাণ পুরোপুরি সঁপে দিয়েছেন। দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে ঐক্যবদ্ধভাবে আরো শক্তিশালী করবো এবং সকল ষড়যন্ত্রকারীকে প্রতিহত করবো এটাই হোক আমাদের আজকের শপথ।’