December 6, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

‘বাছাদের খোঁজও নাই আর পেটে ভাতও নাই’

মাদারীপুর প্রতিনিধি : একমাত্র আল্লার ওপর চেয়ে চেয়ে দিন কাটে মোর’ ‘মোর বাছাদের কোনো খোঁজও নাই আর এখন পেটে ভাতও নাই। প্রশাসনের সাহায্য তো দূরের কতা, হ্যারা কেও এহনও মোর খবর-টবর নিতে আহে নাই। মুই এহনও প্রায় দিনই না খেয়েই দিন কাটাই।

লঞ্চ দুর্ঘটনায় শুধু ছেলে-মেয়ে নয়, হারিয়েছেন মেয়ের স্বামী ফরহাদ ও নাতি ফাহিমকে। গত এক বছরেও তাদের কোনো খোঁজ না পেয়ে তিনি এখন পাগলপ্রায়।

২০১৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানী ঢাকার উদ্দেশে মাদারীপুরের শিবচরের সন্ন্যাসীরচর ইউনিয়নের সন্ন্যাসীরচর গ্রামের মৃত আনোয়ার মুন্সীর ছেলে বেল্লাল মুন্সী (২৩), মেয়ে শিল্পী আক্তার (২৬), একই এলাকার চানমিয়া মাতুব্বরের ছেলে ও শিল্পীর স্বামী ফরহাদ মাতুব্বর (২৮) ও ফরহাদের ছেলে ফাহিম (১) রওনা দেন। নিজ বাড়ি থেকে কাওড়াকান্দি লঞ্চঘাটে এসে এমভি পিনাক-৬ লঞ্চে ওঠেন সবাই। বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল ঢেউয়ে প্রায় আড়াই শ’ যাত্রী নিয়ে মাঝপদ্মায় ডুবে যায় লঞ্চটি। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৪৯টি লাশ উদ্ধার করা গেলেও খোঁজ মেলেনি ওই পরিবারের চারজনের। ওই সময় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, নিখোঁজদের পরিবারের সহযোগিতায় প্রশাসন এগিয়ে আসবে। কিন্তু এক বছর কেটে গেলেও এখন পর্যন্ত নিখোঁজ ৬৪ জনের পরিবারের কেউই আর্থিক সাহায্য তো দূরের কথা, প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা তাদের সঙ্গে দেখা করে সান্ত্বনার বাণী পর্যন্ত শুনাতে আসেননি।

নিখোঁজ শিল্পী ও বেল্লালের মা সুতারুন নেছা বলেন, ‘লঞ্চডুবির পর নিজেরাই তল্লাশির জন্য প্রায় এক লাখ টাকা খরচ করেছি। কিন্তু আমার ছেলে-মেয়ে, মেয়ের জামাই ও নাতির কোনো সন্ধান পায়নি। বেল্লাল ও শিল্পী ঢাকার খিলক্ষেতের মোহাম্মাদিয়া গার্মেন্টসে চাকরি করত। আর জামাই নবাবপুরে একটি পাইপের কারখানায় কাজ করত। তাদের আয়ের টাকা দিয়ে সংসার চলত। কিন্তু এখন মোরে দেখার মতো কেউ নাই। বড় ছেলে ক্ষেতে-খামারে কাজ করে। এখন সংসার চালাতে খুবই কষ্ট হয়।’

নিখোঁজ শিল্পী ও বেল্লালের বড় ভাই হুমায়ুন মুন্সী বলেন, ‘প্রতিবছর ঈদ কতই না আনন্দে কাটছে। কিন্তু এ বছর চোখের অশ্রু ও মনের জ্বালা নিয়ে কেটেছে ঈদের দিনগুলো। লঞ্চ দুর্ঘটনায় স্বজনদের লাশও পেলাম না আর সরকারি কোনো সহযোগিতাও পেলাম না। আদৌ কোনো সহযোগিতা পাব কিনা, তাও জানি না।’

শিল্পীর বড় খালা ফিরোজা বেগম বলেন, ‘উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের হারানোর পর বোনের সংসার চলছে নিদারুণ কষ্টে। বোনের চুলায় এখন আগুন জ্বলে না। সরকার কি কোনোই সহযোগিতা করবে না?’

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরান হোসেন বলেন, ‘যে কেউ এসে তো বলতে পারেন, তার স্বজন হারিয়েছেন, এমনকি নিখোঁজ রয়েছেন। তবে প্রকৃতপক্ষে নিখোঁজদের পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই সরকারিভাবে সহযোগিতা করা সম্ভব নয়। আর যাদের লাশ পাওয়া গেছে তাদের প্রত্যেক পরিবারকেই এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা করে এরই মধ্যে দেওয়া হয়েছে।’

লঞ্চডুবির ওই ঘটনায় সরকারি হিসাবে ৪৯ জনের লাশ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়। আর নিখোঁজ থাকেন ৬৪ জন।

উদ্ধার লাশের মধ্যে ২১ জনকে মাদারীপুর শিবচরের পৌর কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। এক বছরেও তাদের কারও পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। হদিস পাওয়া যায়নি দুর্ঘটনার শিকার পিনাক-৬ লঞ্চটিরও।

পিনাক-৬ লঞ্চডুবির ঘটনায় মামলা দায়ের হয় মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থানায়। লঞ্চের মালিক আবু বকর সিদ্দিক (কালু মিয়া) এবং মালিকের ছেলে ওমর ফারুক লিমনকে র‌্যাব গ্রেফতার করে থানায় হস্তান্তর করে।

লঞ্চমালিক আবু বকর সিদ্দিক কারাগারে আটক থাকলেও ছেলে ওমর ফারুক লিমন বর্তমানে জামিনে আছেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকতা উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবু জাফর বলেন, এটি চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে গণ্য হচ্ছে। ইতোমধ্যে পাঁচজনের সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাক্ষীদের বাসা অন্য জেলায় হওয়ায় বেগ পেতে হচ্ছে। তবে আমাদের আন্তরিকতার কোনো অভাব নেই।