September 18, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

আমরা পিছিয়েছি মানবিকতা চর্চায়।

আমাদের প্রিয় দেশটিতেএকের পর এক নৃসংশ ঘটনা ঘটে চলেছে । মানুষ পুড়িয়ে মারা, স্ত্রীর পরকীয়ায় স্বামী খুন, স্বামীর পরকীয়ায় স্ত্রী খুন, হত্যা, ধর্ষণ, গুলি, মানুষকে পিটিয়ে মারা ইত্যাদি, ইত্যাদি। বলছি না আগে কোনো হত্যা-ধর্ষণ ও নির্মমতা ঘটত না। ঘটত কিন্তু দিনকে দিন যেন তা একদিকে যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে এই ঘটনাগুলোর নৃসংশতা দিন দিন ভয়াবহ আকারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 রক্তপিচ্ছিল দীর্ঘপথ বেয়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। স্বাধীনতার পর ৪৪ বছর পার করলাম। এরমধ্যে আমাদের অনেক অর্জনও হয়েছে।  প্রযুক্তি, যোগাযোগসহ নানা দিকে আমরা বেশ এগিয়েছি। অর্থনৈতিক দিক দিয়েও আমরা এগিয়েছি। শিক্ষার ক্ষেত্রে । কিন্তু আমার কেন যেন মনে হয়, আমরা কেবল যান্ত্রিক বা যন্ত্র-প্রযুক্তিক বিষয়েই কেবল এগিয়েছি — আর পিছিয়েছি মানবিকতা চর্চায়। যদি তা-ই না হয়ে থাকবে তবে আজ তো এমন হবার কথা নয়।

rajon

মায়া, মমতা, স্নেহ, দয়া, সহনশীলতা, ন্যায়, সততা, নিষ্ঠা, মানবিকতা— এইগুলি কি আজ ক্রমে ক্রমে কেবলই লিখিত শব্দ বা অভিধানে ধারণকৃত শব্দে পরিণত হচ্ছে না? অনেকে হয়ত বলবেন, ‘একমত নয়’। আমি বলতে চাই, আমিও আপনাদের মতের সাথে থাকতে চাই এবং জোর গলায় বলতে চাই, ‘একমত নয়’। কিন্তু বাস্তবতা তো বলছে, (হোক সে গুটিকয়েক মানুষের অপকর্ম) সমাজে-রাষ্ট্রে অন্যায়-অবিচার বেড়ে গেছে। এবং সেই ক্রমবৃদ্ধিমাণ চরম অন্যায়কে কেবল ‘অন্যায়’ বললে যেন সত্যের উপর নরম প্রলেপ দেওয়া হয়। কেননা কখনো কখনো তা যে চরম বর্বরতা, চরম নৃসংশতা, চরম নিষ্ঠুরতা।

যে শিশুটি জন্মের আগে সন্তানের শ্রেষ্ঠ আশ্রয় মাতৃগর্ভে থাকতে গুলিবিদ্ধ হয়— সেই গুলিটি কি মানুষ বলে পরিচয় দেওয়া এই সমাজেরই কারো করা নয়? রাজন নামের যে শিশুটিকে আঘাতের পর আঘাতে যারা পৃথিবী থেকে বিদায় দিল চরম নিষ্ঠুরতায়, সেই দু’পায়ে জীবগুলি কি এ দেশের কেউ নয়? যে স্ত্রী পরকীয়ার নেশায় তার যুগ যুগের সাথী স্বামীকে খুন করছে বা যে স্বামী পরকীয়ার নেশায় তার জীবনসাথীকে হত্যার মাধ্যমে চরম অবিশ্বাসের উদাহরণ হয়ে উঠছে এই বিশ্বে— সে কি এই দেশের কেউ নয়? ঐশী নামের যে যুবতী নেশার উপকরণ সংগ্রহ করতে বা অনিয়ন্ত্রিত কুৎসিত জীবনযাপনকে ‘বাধাহীন’ করতে তার পুলিশ পিতা-মাতাকেও খুন করতে পিছপা হচ্ছে না, সেই মেয়েটি কি এই আলো-বাতাসেই বড় হয়নি?… তবে এমন কেন হচ্ছে? ফলে আমাদের আজ ভাবতে হবে, অনেক বেশী ভাবতে হবে— কেন বা কী কী কারণে এই ঘটনাগুলি একের পর এক ঘটছে এবং কোন্ কোন্ বিষয়ে আমাদের নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে?

আসলে সমাজে ও রাষ্ট্রে আজ সবক্ষেত্রে-সব জায়গায় শুধু ভোগের উৎসাহ, পাওয়ার নেশা, আত্মকেন্দ্রিক প্রবণতা, লোভ আর ঈর্ষার আগুন। মানুষকে সেবা করার, মানুষকে দেওয়ার, আত্মত্যাগ করার, দশের তরে নিজের স্বার্থকে বিসর্জন করার, সততা ও ন্যায্যতার জন্য কষ্টকে হাসিমুখে মেনে নেওয়ার উৎসাহ-প্রেরণা বা শিক্ষা কি আমাদের সেভাবে আছে? আছে কি নিজেদের সন্তান-সন্ততির উপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ বা তাদের দেখভাল করার সময়? তারা কীভাবে তাদের ২৪টি ঘণ্টা ব্যয় করছে— কখন কী করছে তা কি আমরা মাঝে-মধ্যে যাচাই করে দেখি? তাদের পরিবর্তনগুলি কি আমরা গভীরভাবে লক্ষ্য করি কখনো? তারা কী দেখছে, কাদের সাথে মিশছে অথবা তারা কীভাবে এটা-ওটা পাচ্ছে তা কি আমরা খেয়াল করি?

এ তো গেল একদিক। অপর দিকে তথ্যপ্রযুক্তির এই জোয়ারের দিনে অশালীনতা ও অপসংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে তাদেরকে বাঁচাতে আমরা কি প্রস্তুত? তাদের এ বিষয়ে আমাদের কী কী পদক্ষেপ বা কী কী সতর্কতা রয়েছে আমাদের? আর শুধু আমরা সতর্ক হলেও কি চলবে? সরকারেরও কি এ বিষয়ে কিছু করার নেই? অবশ্যই আছে— ঢের আছে। এই অশালীনতা ও অপসংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে নবপ্রজন্মকে দূরে রাখতে এবং তাদেরকে মানবিকায় জাগ্রত করতে অন্যতম প্রধান ভূমিকা রাখবে তো সরকার। সরকার কি তা ঠিক মতো করছে? এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলি, সিভিল সোসাইটি ও গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবী যারা ধারণ করে আছেন তাদের কি কোনো কিছু করার নেই? এ বিষয়ে কি আমরা সরকারের কাছে দাবী করতে পারি না? সরকারকে আরও উদ্যোগী করতে আমরা কি চাপ সৃষ্টি করতে পারি না?

আমরা যদি কোনো কাজ না করি, কোনো উদ্যোগ গ্রহণ না করি, সতর্ক না হই এবং সরকারকে আরও উদ্যোগী হতে চাপ সৃষ্টি করতে না পারি— তবে এক একটা নৃসংশতা, এক একটা বর্বরতা বা এক একটা চরম নিষ্ঠুরতার পর দু’-একদিন আমাদের হা-হুতোশের কোনোই মূল্য আছে কি?