September 17, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

ব্লগে কি লিখতেন নিলয় ?

ডেস্ক প্রতিবেদন : নিজ বাসায় খুন হওয়া ব্লগার নিলাদ্রি চট্টপাধ্যায় ওরফে নিলয় নিজের জীবন নিয়েশঙ্কা জানিয়ে আসছিলেন বেশ কিছুদিন আগে থেকেই।

নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করতে গিয়েছিলেন পুলিশের কাছে। তবে পুলিশ জিডি না নিয়ে তাকে দেশ ত্যাগের পরামর্শ দিয়েছিল। গত ১৫ মে (২০১৫) ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে নিলয়নিজেই এই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন।

উদ্বেগ জানানোর পর তিন মাসও পার হতে পারেনি, ২ মাস ২৩ দিনের মাথায় নিলাদ্রি চট্টপাধ্যায়ের আশংকাই সত্যে পরিণত হলো। নিজ বাসায় তাকে খুন হতে হলো। রাজধানীর খিলগাঁও থানার উত্তর গোড়ান এলাকায় বাসার ভেতর প্রবেশ করে ব্লগার নিলাদ্রি চট্টপাধ্য্যায় ওফরে নিলয়কে (৪০)গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।শুক্রবার দুপুরে ওই এলাকার ১৬৭ নম্বর বাসার ৫ম তলার একটি ফ্ল্যাটে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। ওই বাসায় স্ত্রী ও বোনকে নিয়ে থাকতেন নীলাদ্রি।

ব্লগার নিলয় ধর্মের নানা অসঙ্গতি নিয়ে প্রায়ই তার ফেসবুক ও ব্লগে লিখতেন। শুধু ধর্মই নয়, তার দৃষ্টিতে সমাজ, রাষ্ট্র ও দেশের যেখানেই কোন অসঙ্গতি মনে হতো তা নিয়েই লিখতেন তিনি। তবে, অন্যান্য ধর্ম নিয়ে কালেভদ্রে লিখলেও তার দৃষ্টিতে ইসলাম ধর্মে যেসব ত্রুটি ছিল সেগুলো নিয়েই নিলয় বেশি লিখতেন। এ কারণে তার ওপর কারো কারো ক্ষোভ থাকতে পারে বলে নিলয় নিজেই বিভিন্ন সময়ে তার ফেসবুকে লিখেছেন।

এবার পাঠকদের জন্য নিলয়ের বিভিন্ন সময়ে ফেসবুকে লেখা কিছু মন্তব্য হুবহু তুলে ধরা হলো:





উল্লেখ্য, নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কা জানিয়ে গত ১৫ই মে নিলাদ্রী চট্টপাধ্যায় ওরফে নিলয় তার ফেসবুকে যে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন সেখানে তিনি লিখেছেন, আমাকে দুজন মানুষ অনুসরণ করেছে গত পরশু। অনন্ত বিজয় দাশ হত্যার প্রতিবাদে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে যোগদান শেষে আমার গন্তব্যে আসার পথে এই অনুসরণটা করা হয়।

ঘটনার বর্ণনায় তিনি লেখেন, প্রথমে পাবলিক বাসে চড়ে একটা নির্ধারিত স্থানে আসলে তারাও আমার সাথে একই বাসে আসে। এরপর আমি লেগুনায় উঠে আমার গন্তব্যস্থলে যাওয়া শুরু করলে তাদের মধ্যে একজন আমার সাথে লেগুনায় উঠে। লেগুনায় বসে আমার মনে পড়ে বাসে তো এই ব্যক্তিই ছিলো কিন্তু তারা তো দুইজন ছিল। মনে মনে ভাবি হতেই পারে, একজনের গন্তব্য অন্যদিকে তাই সে চলে গেছে।
এ পর্যন্ত ব্যাপার স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে লেগুনায় বসে সেই যুবক ক্রমাগত মোবাইলে টেক্সট করছিল যা দেখে আমার সন্দেহ হয়। আমি আমার নির্ধারিত গন্তব্যস্থলের আগেই নেমে গেলে আমার সাথে সেই তরুণও নেমে পড়ে। আমি বেশ ভয় পেয়ে সেখানের একটি অপরিচিত গলিতে ঢুকে যাই। পরে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি ওই তরুণের সাথে বাসে থাকা আরেক তরুণ এসে যোগ দিয়েছে এবং তারা আমাকে আর অনুসরণ না করে গলির মুখেই দাড়িয়ে আছে।
এ ঘটনার পর থানায় জিডি করতে গেলে পুলিশ জিডি নেয়নি উল্লেখ করে নিলয় লিখেন, তারা জিডি নিলো না, তারা বললো আমাদের থানার অধীনে না, এটা অমুক থানার অধীনে পড়েছে ওখানে যেয়ে যোগাযোগ করুন, আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশ ছেড়ে চলে যান।
এদিকে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল শুক্রবার (৭ আগস্ট ২০১৫) ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় হত্যার প্রতিক্রিয়ায় এক বিবৃতিতে বলেছে, বাংলাদেশে ভিন্ন মতের কণ্ঠরোধে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে, সেগুলো বন্ধে বাংলাদেশের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত এবং কোনোভাবেই এগুলো সহ্য করা উচিত নয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইটে দেওয়া এক বিবৃতিতে সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের গবেষণা পরিচালক ডেভিড গ্রিফিথ বলেন, এ ধরনের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড এখানেই শেষ হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের কণ্ঠরোধ করতেই যে পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে, এ নিয়ে সামান্য সন্দেহই রয়েছে এবং এটি অগ্রহণযোগ্য।
গ্রিফিথ বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীন চর্চাকে কোনোভাবেই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া যাবে না। এ ধরনের আক্রমণ যাতে আর না হয়, সেটি বন্ধে বাংলাদেশ সরকারের জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। স্বাধীন, কার্যকর ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এসব ঘটনার তদন্ত করা উচিত। আর যারা এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে তাদের নিরপেক্ষ বিচারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। উল্লেখ্য, এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মোট চারজন ব্লগার হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন। নীলাদ্রি ছাড়া হত্যাকাণ্ডের শিকার অন্যরা হলেন, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান ও অনন্ত বিজয় দাস।