June 25, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

যন্ত্রণার এপিঠ আর ওপিঠ

মিনার রশিদ : এই জাতির যন্ত্রণার কথা বলে শেষ করা যাবে না । আগে ছিল শুধু এনালগ যন্ত্রণা। এখন যোগ হয়েছে অনেক ডিজিটাল যন্ত্রণা।
মরার উপর খাড়ার ঘা হিসাবে ব্লগার নামক নতুন এক জ্বালাতনের সৃষ্টি হয়েছে। এরা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বোধ বিশ্বাস নিয়ে কোন ধরনের একাডেমিক সমালোচনা নয় – কোটি কোটি ধর্মবিশ্বাসীর বিশ্বাস ও আবেগের বিষয়গুলি নিয়ে কুৎসিততম মন্তব্য ও ঠাট্টা মশকরা করে । যে ধরনের গালি বা কটুক্তি একজন সাধারন মানুষের জন্যেও অবমাননাকর সেই ধরনের অশ্রাব্য গালি এরা বিলিয়ন মানুষের শ্রদ্ধার পাত্রের উপর প্রয়োগ করে। বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের একটা অংশ থেকে এসব অশ্লীল গালাগালিকে গ্যালিলিও, নিউটনের সমতুল্য বিজ্ঞানবিষয়ক রচনা বলে সার্টিফাই করা হয়। এটা হলো যন্ত্রণার এক পিঠ ।

যন্ত্রণার অন্য পিঠটি হলো ধর্মের পক্ষ নিয়ে অন্য একটি দল এদেরকে কিছুদিন পর পর কতল করে। খুন করার পর ধর্মীয় শ্লোগান দেয়। নিজস্ব ব্র্যান্ড বা স্টাইল সৃষ্টি করার জন্যে একই কায়দায় খুন করে। প্রকাশ্য দিবালোকে খুন করার পর কয়েক স্তর পুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টনি থেকে বীর দর্পে বেরিয়ে যায়। ফেইস বুক, টুইটার থেকে সেই খুনের দায়িত্ব স্বীকার করে নেয় । গর্ব সহকারে নিজেদের সংগঠণের একটা আরবী নাম প্রকাশ করে। নিজেদের ক্যান্টনমেন্ট চিনাতে হাটহাজারির মত জায়গা থেকে ইমেইল পাঠায়। অর্থাৎ খুনের পর এমন কিছু আলামত রেখে যায় যাতে আমাদের চৌকশ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা উৎসাহী মিডিয়া তাদেরকে সহজেই চিনে নিতে পারে।

যুগের এই গ্যালিলিও,নিউটন,আর্কিমিডিসরা জাতিকে যতটুকু যন্ত্রণা দেয় তারচেয়েও বেশি বেকায়দায় ফেলে যুগের এই সালাহউদ্দীন আয়ূবিরা। জাতিসঙ্গ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি পাঠানো হয়। তখন এদেশের গণতন্ত্র নিয়ে বহির্বিশ্বের সকল উদ্বেগ চাপা পড়ে যায়। মিশন ২০৪১ আরো সহজ হয়ে যায়।

জন্মের পর থেকেই নাস্তিক্যবাদসহ অনেক বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে পবিত্র ধর্ম ইসলামকে । এই অভিজ্ঞতা মুসলিম বিশ্বের জন্যে নতুন নয়। যুগ যুগ ধরে মুসলিম মনীষীগণ তাদের মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে এই চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করে এসেছেন । তজ্জন্য কখনই সহিংসতার আশ্রয় নেন নি। কলমের জবাব দিয়েছেন কলম দিয়ে, কথার জবাব দিয়েছেন কথা দিয়ে। বুদ্ধিবৃত্তিক শঠতার জবাব দিয়েছেন প্রজ্ঞা দিয়ে। বুদ্ধিবৃত্তিক অসহিষ্ণুতার জবাব দিয়েছেন ধৈর্য্য দিয়ে।

কাজেই ইসলামের নামে (যদি) খুন করা হলেও তাতে প্রজ্ঞা, মানবতা ও শান্তির ধর্ম ইসলাম কতটুকু লাভবান হচ্ছে তা তলিয়ে দেখা দরকার। এর ফলে সৃষ্ট ঘোলা জল থেকে ফায়দা নেয়া ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোন কার্যকর উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে না।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক হচ্ছে এই ধরনের ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পরপরই এক শ্রেণীর মিডিয়া বিশেষ কোন গ্রুপ বা দলকে টার্গেট করে ঘটনার বর্ণনা দিতে থাকে। হত্যাকান্ডের পর কী শ্লোগান দিয়েছিল, কোন জায়গা থেকে ই মেইল পাঠিয়েছে, অন্য কোন হত্যা প্রক্রিয়ার সাথে মিল এই ধরনের বর্ণনার মাধ্যমে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।
অপরাধ বিজ্ঞান বলে, একজন খুনী কোনভাবেই নিজের আইডেন্টিটি প্রকাশিত হয়ে পড়বে এমন কোন নমুনা বা চিহ্ন রেখে যাবে না । কাজেই মূল অপরাধীকে খুঁজে পেতে এই সব বর্ণনা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা ছাড়া অন্য কোন কাজে আসে না। এসব প্রোপাগান্ডামূলক প্রচারণায় মূল খুনীরা সহজেই নিজেদের আড়াল করে ফেলতে পারে। কাজেই এই খুনীদের চেয়েও এই মতলববাজ মিডিয়া আরও বড় অপরাধী।

ব্যক্তিগতভাবে আমি কোন কিছু অনুসন্ধান ব্যতিরেকে গ্রহণ করতে রাজি নই। ইন্ডিয়ার একটি অন লাইন পত্রিকা তিন মাস আগেই নিলয়ের হত্যাকান্ডের খবর প্রকাশ করেছে বলে অন লাইনে ছড়িয়ে পড়েছে । বিষয়টি সত্য হয়ে থাকলে তা অবশ্যি গুরুতর এবং আমাদের নিরাপত্তার স্বার্থেই বিষয়টি নিয়ে আরো গবেষণা ও অনুসন্ধানের দাবি রাখে।

পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক জীবনের শেষ দিকে টের পেয়ে গিয়েছিলেন যে কারা তাকে হত্যা করতে পারে। তজ্জন্যে খুব সাবধানে চলাফেরা করতেন। তার শেষ বিমানযাত্রায় তাই সঙ্গী করেছিলেন আমেরিকান রাষ্ট্রদূতকে। তারপরেও শেষ রক্ষা হয় নি। সেই আমেরিকান রাষ্ট্রদূতসহই তাকে জীবনটি দিতে হয়েছিল।
কাজেই হত্যার কুটনীতি খুবই নির্মম ও জটিল হয়ে থাকে। অন্যকে পদানত করার জন্যে কিংবা ফাঁসানোর জন্যে এই হোমোসেপিয়ান প্রজন্ম অত্যন্ত ভয়ংকর ও নিষ্ঠুর হয়ে পড়তে পারে। এদের কাছে মানুষের জীবন আসলেই খুব সস্তা। পথের কাঁটা সরাতে নিজের দেশের রাষ্ট্রদূতকেও সেক্রিফাইস করতে কুণ্ঠিত হয় না। এক রাষ্ট্রদূত গেলে অন্য রাষ্ট্রদূত পাবে। কিন্তু এক সুযোগ হাত ছাড়া করলে অন্য সুযোগ পাবে না।

জন্মের পর থেকে একজন মানুষের অনেক কিছিমের শত্রু সৃষ্টি হতে পারে। কেউ শত্রু হয় সামাজিক কারণে, কেউ রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থে। আবার কেউ শত্রু হয় নেহায়েত পারিবারিক বা ব্যক্তিগত রেষারেষিতে। নিজ দলের প্রতিদ্বন্দ্বী হাসপাতালে ভর্তি হলেই অনেকেই মিষ্টি বিলানো শুরু করে। নিজের টাকা খরচ করে প্রেমিককে দিয়ে খুন করায় নিজের স্বামীকে।
পরকিয়ার সম্পর্ক প্রকাশিত হয়ে পড়বে এই ভয়ে খুন করে নিজের সন্তানকে। নিজের ভোগের পথে কাঁটা গণ্য করে নিজ হাতে খুন করে নিজের বাবা মাকে।

কাজেই কোন হত্যা সংঘটিত হওয়ার পর সন্দেহের তীর যদি শুধুমাত্র একদিকে তাক করা হয়, তবে বাদবাকিরা এই ধরনের অপকর্মে আরো উৎসাহিত হয়। এর ফলে আমরা সবাই নিজেদেরকে আরও অনিরাপদ করে তুলছি এবং সমাজটিকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলছি।
এই কৌশলে নিজ দল বা গোষ্ঠীর লাভ হলেও পিতৃদত্ত জীবনটি যাবে তো নিজের। এই শুভ বুদ্ধির উদয় হওয়াতেই গণ জাগরন মঞ্চের কর্মীরা সরকারকে দোষারূপ শুরু করেছেন।
গণ জাগরণ মঞ্চের কর্মীদের মত সব জায়গায় এই শুভ বোধটি জেগে ওঠুক। শুধু ব্লগার বা শিশুহত্যা নয়, সব
ধরনের হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিরোধ গড়ে ওঠুক ।
আর যারা ধর্মের পক্ষে কিংবা ধর্মের বিপক্ষে এই জ্বলন্ত অঙ্গার নিয়ে খেলছি এবং যারা পাশে বসে তামাশা দেখছি – সবার মাঝেই এর সম্ভাব্য পরিণতিটুকু স্পষ্ট হয়ে ওঠুক।

লেখক : কলামিস্ট