September 18, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

টেলিকমিউনিকেশন প্রকল্প থেকে জাইকার ২শ' কোটি টাকার ঋণ প্রত্যাহার

বিশেষ প্রতিনিধি : বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপন প্রকল্প লট-বি’র জন্য দেওয়া ২০০ কোটি টাকা ঋণ ফেরত নিয়েছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি বা জাইকা। টাকা ফেরত নেওয়ার কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, গত ৭ মে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সিনিয়র সচিবকে দেয়া এক চিঠিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত জাইকার প্রধান মিকিও হাতাইদা জানান, বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও বিটিসিএল লট-বি বাস্তবায়নে ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় জাপান সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রকল্পে ঋণের টাকা ফেরত নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য এই সিদ্ধান্ত থেকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং বিটিসিএলকে শিক্ষা নিতে বলা হয়েছে। এর ফলে বিটিসিএল-এর এই প্রকল্পটি অন্ধকারে ডুবতে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে দেশের শীর্ষ একটি গোয়েন্দা সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে জানায়, আকস্মিক প্রাক্কলন ব্যয় বাড়ানোর উদ্দেশ্য শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা করার প্ল্যান করা হয়। এতে প্রকল্প পরিচালকসহ বিটিসিএলের কিছু কর্মকর্তা, বিদেশি পরামর্শক এবং দুই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তার আর্থিক সুবিধার সংশ্লিষ্টতা পায় সংস্থাটি। প্রমাণ হিসেবে কথোপকথনের রেকর্ডও প্রতিবেদনের সঙ্গে জমা দেয়া হয়। এভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে সময়ক্ষেপণের কারণে বিরক্ত হয় জাইকা। মে মাসে ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করলে ঋণ ফেরত নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তারা।

এর আগে গত ২ জুন জাইকার সঙ্গে সরকারের ঋণচুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এই অর্থ ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে। বিটিসিএল এবং ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ মাস ধরে সরকার স্বাক্ষরিত ঋণচুক্তি এবং জাইকার নির্দেশনা ভঙ্গ করে বিভিন্ন অনিয়ম থেকে সৃষ্টি হওয়া দীর্ঘসূত্রতায় বিরক্ত হয়ে জাইকা বিটিসিএলকে নিয়ম মেনে চলতে তাগাদা দিয়ে আসছিল। আলোচিত লট-বি টেন্ডারের বিপরীতে যোগ্য এবং সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়নি বিটিসিএল। বরং তৃতীয় দফা দরপত্র আহ্বানের চেষ্টা করে তারা। এ নিয়ে গত ১৮ জানুয়ারি বিটিসিএল, ২২ জানুয়ারি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ১৬ ফেব্রুয়ারি ইআরডির সচিবকে চিঠি দেয় জাইকা। তাতেও বিহিত না হওয়ায় ঋণ প্রত্যাহার করে নেয়। এসব চিঠির অনুলিপি ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে দেয়া হয়। এরপরও বিটিসিএলের ক্ষমতাধর সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে বিষয়টি সুরাহা হয়নি।

টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের ভেতর এবং আন্তর্জাতিক প্রবেশপথগুলোর মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ স্থাপনের জন্য টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পটি (লট-বি) হাতে নেয়া হয়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে এক বা একাধিক ক্যাবল কাটা গেলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিকল্প পথে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখা সম্ভব হতো। মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ সুদে ৩০ বছরে পরিশোধযোগ্য ঋণের মাধ্যমে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল জাইকা। এর ভিত্তিতে ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে লট-বি প্রকল্পের প্রাক-যোগ্যতার দরপত্র আহ্বান করা হয়। পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে উচ্চমূল্যে কাজ দিতে প্রাক-যোগ্য দরপত্রে নেটাস নামে তুরস্কের একটি প্রতিষ্ঠানকে যাচাই পর্যায়ে বাদ দেয় বিটিসিএল। এরপর থেকেই সমস্যা শুরু হয়। প্রাক-যোগ্যতায় বাদ পড়ার পর নেটাস সরকার-গঠিত রিভিউ প্যানেলের কাছে এর প্রতিকার চায়। বিচারে রিভিউ প্যানেল নেটাসকে প্রাক-যোগ্য ঘোষণা করে আদেশ দেয়। এরপরও বিটিসিএল নমনীয় হয়নি। তাদেরকে প্রাক-যোগ্য ঘোষণা করেনি। এরই মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করে। দুদকের হাত থেকে বাঁচতে বিটিসিএল রিভিউ প্যানেলের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট এবং পরে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে। বিচারে হাইকোর্ট রিভিউ প্যানেলে রায় সঠিক বলে নেটাসের পক্ষে রায় দেয়। পরে সুপ্রিম কোর্টও আপিল খারিজ করে দিয়ে নেটাসকে প্রাক-যোগ্য ঘোষণা করে পুনঃদরপত্রের নির্দেশ দেয়। এভাবে পুনঃদরপত্র আহ্বানের নামে সময় পেরিয়ে গেছে তিন বছর। এরপর সুপ্রিম কোর্টের আদেশ আমলে না নিয়ে কার্যাদেশ না দেয়ার চেষ্টায় কেটে গেছে আরো এক বছর। এভাবেই প্রকল্পের সময় ৪ বছর খেয়ে ফেলা হয়।

টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শুরুতে এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ঠিক করা হয়েছিল ১ কোটি ৩৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার বা ১১১ কোটি টাকা। নেটাসকে প্রাক-যোগ্যতায় বাদ দিয়েই তড়িঘড়ি করে প্রকল্পের ব্যয় ১ কোটি ১১ লাখ ৭ হাজার ডলার বাড়িয়ে ২ কোটি ৪৭ লাখ ৩০ হাজার ডলার (২০০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা) করে বিটিসিএল। এরপর জাপানের এনইসি এবং কোরিয়ান কেটির মধ্যে দরপত্র ডাকে বিটিসিএল। ততক্ষণে এ প্রকল্পের সাথে না থাকারও সিদ্ধান্ত নেয় জাইকা। ফলে চার বছর অপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি অন্ধকারে মুখ থুবড়ে পড়তে যাচ্ছে।

এদিকে, ‘টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পের লট-বি অংশের কাজ থেকে ঋণ সহায়তা প্রত্যাহার করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

জাতীয় সংসদ ভবনে মঙ্গলবার কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়। একই সঙ্গে বৈঠকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে এবং বিটিসিএলের টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ডেভলপমেন্টের (লট-বি) কার্যক্রম সম্পর্কে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনাও হয়।

কমিটি সুত্রে জানা যায়, জাইকার অর্থায়নে ২০১০ সালের ৭ জানুয়ারি ১৪.৭ মিলিয়ন ডলারের ‘টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পটি একনেকে পাস করা হয়। ওই বছর ৬ মে অশোক কুমার মাধবকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং জাইকার পরামর্শক্রমে ওই বছর ২৮ নভেম্বর প্রকল্পটিতে জাপানী পরামর্শক নিয়োগ করা হয।

২০১১ সালের ১৬ মে প্রাক-যোগ্যতার দরপত্র আহ্বান করা হলে মোট পাঁচটি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠান মেসার্স কে.টি করপোরেশন, কোরিয়া এবং মেসার্স এনইসি করপোরেশন, জাপানকে জেটিইসি এবং টিইসি কমিটি প্রাকযোগ্য হিসেবে বিবেচিত করে। পরবর্তীতে জাইকার সম্মতিতে এই দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দরপত্র আহ্বান করা হয়। অন্যদিকে প্রাকযোগ্য তালিকা থেকে বাদ পড়া কানাডিয়ান ও তুরস্কের যৌথ প্রতিষ্ঠান মেসার্স নরটেল নেটওয়ার্স নেটাস টেলিকমিউনিকেশন এ.এস সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) রিভিউ প্যানেল-২ এর কাছে অভিযোগ করে যে, তাদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রাক-যোগ্যতার দরপত্রে তাদের বাদ দেয়া হয়েছে। সিপিটিইউ’র রিভিউ প্যানেল-২ বিষয়টি বিটিসিএলকে অবহিত করে এবং এ বিষয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলে।

বিটিসিএলের লিখিত জবাবের পর ২০১২ সালের ৬ মার্চ বিটিসিএলকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে রিভিউ প্যানেল তাদের রায়ে যৌথ অংশিদারী প্রতিষ্ঠানটিকে প্রাক-যোগ্যতার দরপত্রে অন্তর্ভুক্তের রায় দেয়। এ রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিবের নির্দেশে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিকের মতামত গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে জাইকা, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং বিটিসিএলের ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১২ সালের ৭ মে সিপিটিইউ’র রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়। এর দুই দিন পর ৯ মে তুরস্ক ও কানাডিয়ান যৌথ অংশিদারী প্রতিষ্ঠানটি হাইকোর্টে আরেকটি রিট পিটিশন দায়ের করে। পরে শুনানি শেষে ওই বছর ৭ আগস্ট সিপিটিইউ’র রায় বহাল রাখে হাইকোর্ট। হাইকোর্টের এমন রায়ের পর তৎকালীন টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের সচিব ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার মৌখিক নির্দেশ দিলে বিটিসিএল ২০১২ সালে ২৩ আগস্ট আপিল বিভাগে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। ২০১৩ সালের সাত ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে বিটিসিএলের আপিল খারিজ করে দেয়। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পরও বিটিসিএল নরটেল-নেটাস প্রতিষ্ঠানটিকে প্রাক-যোগ্যতার দরপত্রে অন্তর্ভুক্ত করেনি।

অন্যদিকে আপিল বিভাগের রায়ের পর কানাডিয়ান মেসার্স নরটেল নেটওয়ার্ক এবং তুরস্কের নেটাস টেলিকমিউনিকেশন প্রতিষ্ঠান দুটি আলাদা হয়ে যায়। পরবর্তীতে নরটেল নেটওয়ার্ক নাম পরিবর্তন করে নেটাস নামকরণ করে জাইকা ও বিটিসিএলকে অবহিত করে। পরর্বতী জাইকার পরামর্শে কোরিয়ার মেসার্স কে.টি করপোরেশন, জাপানের মেসার্স এনইসি করপোরেশন এবং তুরস্কের নেটাস কমিউনিকেশনের মধ্যে দরপত্র আহ্বান করে। পরে কে.টি করপোরেশন ও নেটাস কমিউনিকেশন দরপত্রে অংশগ্রহণ করে এবং কারিগরিভাবে রেসপনসিভ ঘোষণা করে জাইকা সম্মতি দেয়। পরে প্রতিষ্ঠান দুটির দরপত্র উন্মুক্ত করা হলে দেখা যায় প্রকল্পটির প্রক্কলিত মূল্যের চাইতে ২২ শতাংশ বেশি দর দেয় নেটাস কমিউনিকেশন এবং কে.টি করপোরেশনের দর প্রক্কলিত মূল্যের চাইতে ৩৯ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি হয়। বিষয়টি নিয়ে বিটিসিএলের পরিচালনা পর্ষদে আলোচনা হলে পুনঃদরপত্র আহ্বান এবং ২১ ডিসেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত ঋণচুক্তি বাড়ানোর জন্য জাইকাকে চিঠি প্রদানের সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাইকাকে বার বার চিঠি দেয়ার পর চলতি বছর ৭ মে ঋণচুক্তির মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না বলে জানিয়ে দেয় জাইকা। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ করে প্রকল্পের কাজ শুরু করতে না পারায় জাইকা তাদের ঋণচুক্তি প্রত্যাহারও করে নেয়।

কমিটি সূত্রে আরো জানা যায়, সিপিটিইউ, হাইকোর্ট এবং আপিল ডিভিশনের আদেশ বিটিসিএল অনুসরণ না করাই ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায় সংসদীয় কমিটি। কমিটি তৎকালীন মন্ত্রীর এমন মৌখিক আদেশকে আইন সম্মত নয় বলেও মন্তব্য করে। এ বিষয়ে কথা বলা হলে, কমিটির সভাপতি ইমরান আহমেদ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অন্যদিকে গঠিত সাব-কমিটির আহ্বায়ক কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘যে কোনো ঋণচুক্তি প্রত্যাহারই দেশের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর। আমরা কমিটিতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। কেন জাইকা তাদের ঋণচুক্তি প্রত্যাহার করে নিয়েছে সে ব্যাপারে আমরা একটা প্রতিবেদনও পেয়েছি। প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করার জন্য আমাকে আহ্বায়ক করে একটি সাব-কমিটিও গঠন করা হয়েছে। আমরা প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে দেখব গাফিলতির জন্য কারা দায়ী। এই মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়। যদি তৎকালীন মন্ত্রী কিংবা সংশ্লিষ্ট কেউ দায়ী হন তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমরা সুপারিশ করব।’