September 18, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

রাজাকার সিরাজের ফাঁসি, আকরামের আমৃত্যু কারাদণ্ড

আদালত প্রতিবেদক : একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাগেরহাটের রাজাকার সিরাজ মাস্টারকে মৃত্যুদণ্ড ও খান আকরাম হোসেনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সকালে এ রায় ঘোষণা করেন।

সিরাজ মাস্টারের বিরুদ্ধে ছয়টি ও আকরামের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

রায় পড়া শুরুর আগে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান এম ইনায়েতুর রহিম বলেন, “আজ বাগেরহাটের শেখ সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টার ও খান আকরাম হোসেন মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। তবে এ মামলার অপর আসামি আব্দুল লতিফ তালুকদার মৃত্যুবরণ করায় তার মামলার বিষয়ে প্রয়োজনীয় আদেশ দিয়েছি।”

এর আগে গত ৫ আগস্ট ট্রাইব্যুনাল এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য ১১ আগস্ট দিন ধার্য করেন।

উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) উপস্থাপনের মধ্যদিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর ২৩ জুন মামলাটি রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমান (সিএভি) রাখেন ট্রাইব্যুনাল।

গত বছরের ২ ডিসেম্বর থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত তিন আসামির বিরুদ্ধে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) হেলাল উদ্দিনসহ ৩২ জন সাক্ষি প্রসিকিউশনের পক্ষে সাক্ষ্য দেন। আসামিপক্ষ সাক্ষিদের জেরা করে। এর পর ৬, ৭ ও ২১ এপ্রিল আসামিপক্ষে সাক্ষ্য দেন পাঁচজন সাফাই সাক্ষী। প্রসিকিউশন সাক্ষিদের জেরা করে।

গত বছরের ৫ নভেম্বর রাজাকার কমান্ডার ‘বাগেরহাটের কসাই’ নামে কুখ্যাত রাজাকার সিরাজ মাস্টার এবং তার দুই সহযোগী লতিফ তালুকদার ও খান আকরাম হোসেনের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংগঠিত সাতটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ গঠন করা হয়। এর মধ্যে সিরাজ মাস্টারকে ছয়টিতে এবং আকরাম ও লতিফ তালুকদারকে তিনটিতে অভিযুক্ত করা হয়।

এর মধ্যে রয়েছে বাগেরহাটের শাঁখারিকাঠি বাজার, রণজিৎপুর, ডাকরা ও কান্দাপাড়া গণহত্যাসহ আট শতাধিক মানুষকে হত্যা-গণহত্যা, আটক, অপহরণ, নির্যাতন এবং শতাধিক বাড়ি-ঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ।

গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর এ তিন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরুর পর ২০০৯ সালে নিমাই চন্দ্র দাস নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি বাদী হয়ে এ তিন আসামিসহ ২০-৩০ জনের বিরুদ্ধে বাগেরহাটের আদালতে একটি মামলাটি দায়ের করেন। বাগেরহাটের আদালত এ মামলাটি ট্রাইব্যুনালে পাঠিয়ে দেয়। ট্রাইব্যুনাল মামলাটি আমলে নিলে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে তদন্তকারী টিম প্রতিবেদন দাখিল করে।

এ মামলার তিন আসামির মধ্যে আব্দুল লতিফ তালুকদার ২৮ জুলাই কারাবন্দি অবস্থায় মারা গেছেন।

সাত অভিযোগ

অভিযোগ ১: ১৯৭১ সালের ১৩ মে দুপুর ২টার দিকে রাজাকার বাহিনীর বাগেরহাট সাব ডিভিশনের তৎকালীন ডেপুটি কমান্ডার শেখ সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টার ও রজব আলী ফকিরের নেতৃত্বে ৫০-৬০ জন রাজাকার এবং বেশ কিছু স্বাধীনতাবিরোধী বাগেরহাট জেলার রঞ্জিতপুর গ্রাম ঘিরে ফেলে। তারা বিভিন্ন বাড়িতে লুটপাট চালিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়।

ওই সময় সিরাজুল হক এবং তার সহযোগীরা প্রায় ৪০-৫০ জন হিন্দুকে হত্যা করে। এ ঘটনায় সিরাজ মাস্টারের বিরুদ্ধে গণহত্যা, হত্যা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।

অভিযোগ ২: স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে বাগেরহাট জেলার রামপাল থানার ডাকরার কালী মন্দিরে ভারতের শরণার্থী শিবিরে যাওয়ার জন্য জড়ো হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের দুই-তিন হাজার লোক। এ খবর পেয়ে তাদের হত্যার জন্য সিরাজ মাস্টার ও রজব আলী ফকিরের নেতৃত্বে ৪০-৫০জন সশস্ত্র রাজাকার ডাকরা গ্রামে যায় এবং নির্বিচারে গুলি চালায়।

এরপর কালী মন্দিরে গিয়ে সেখানে জড়ো হওয়ার মানুষদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ছয় থেকে সাতশ জনকে হত্যা করে তারা। ১৯৭১ সালের ২১ মে বেলা ৩টা থেকে ৫টার মধ্যে এ ঘটনা ঘটে।

সে সময় সিরাজ মাস্টার ও সহযোগীরা ওই এলাকার বিভিন্ন বাড়িতে লুটপাট চালায় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ঘটনায় সিরাজ মাস্টারের বিরুদ্ধে গণহত্যা, হত্যা, লুটপাট ও অগ্নি সংযোগের অভিযোগ আনা হয়।

অভিযোগ ৩: একাত্তরের ১৮ জুন সকাল ১০টার দিকে সিরাজ মাস্টারের নেতৃত্বে ২০-২৫ জন পাকিস্তানি সেনা সদস্য এবং ৩০-৩৫ জন সশস্ত্র রাজাকার বেসরগাতী, কান্দাপাড়া গ্রাম এবং কান্দাপাড়া বাজার থেকে ২০ জনকে অপহরণ করে।

তাদেরকে কান্দাপাড়া বাজারে আটকে রেখে নির্যাতন করে সিরাজ মাস্টার ও তার সহযোগীরা। তাদের নির্যাতনে ১৯ জন নিহত হন। অপহৃত শেখ সুলতান আলী ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান, যিনি পরে ১৯৮৪ সালে মারা যান।

এ ঘটনায় সিরাজ মাস্টারের বিরুদ্ধে খুন, অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।

অভিযোগ ৪: একাত্তরের ১৪ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে সিরাজ মাস্টার ও রজব আলী ফকিরের নেতৃত্বে ১০০-১৫০ জন সশস্ত্র রাজাকার সদর থানার চূলকাঠি গ্রাম, চুলকাঠি বাজার, গণশেমপুর ও আশপাশের এলাকায় হামলা করে এবং প্রায় ৪২টি বাড়িতে লুটপাট চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।

এরপর সিরাজ মাস্টার ও তার সহযোগীরা ওইসব এলাকা থেকে সাত ব্যক্তিকে অপহরণ করে তাদেরকে চুলকাঠি বাজারে আটকে রাখে। পরে তাদের নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।

এ ঘটনায় সিরাজ মাস্টারের বিরুদ্ধে হত্যা, অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতনসহ অন্যান্য অমানবিক কাজের অভিযোগ আনা হয়।

অভিযোগ ৫: মুক্তিযুদ্ধের সময় ৫ নভেম্বর দুপুর ৩টার দিকে সিরাজ মাস্টার, স্থানীয় রাজাকার নেতা খান আকরাম হোসেন ও আবদুল লতিফ তালুকদারসহ ৫০-৬০ জন রাজাকার সদস্য মিলে কচুয়া থানার শাঁখারিকাঠি হাটে হামলা চালায়।

সেখানে তারা ৪০ জন হিন্দু এবং দুই স্বাধীনতা সমর্থককে আটক করে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে এবং গুলি করে হত্যা করে।

এ ঘটনায় তিনজনের বিরুদ্ধে অপহরণ, হত্যাসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।

অভিযোগ ৬: একাত্তরের ২২ অক্টোবর সকাল ১০টা থেকে বিকাল আনুমানিক ৫টা মধ্যে সিরাজ মাস্টার, স্থানীয় রাজাকার নেতা খান আকরাম হোসেন ও আবদুল লতিফ তালুকদার পরিকল্পনা করে স্বাধীনতার পক্ষের লোক হিসেবে পরিচিত টেংরাখালী গ্রামের সতিশ চন্দ্র মণ্ডল, কচুয়া গ্রামের বাবু খান, হাজরাখালী গ্রামের নজরুল ইসলাম শেখ, বারুইখালী গ্রামের মনিন্দ্রনাথ সাহা, চর-টেংরাখালী গ্রামের হাশেম আলী শেখকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে কচুয়া সদরের রাজাকার ক্যাম্পে আটকে রাখে।

এরপর সিরাজ মাস্টার তাদের হত্যার নির্দেশ দিলে থানা পরিষদের পাশে নদীর উত্তরপাড়ে নিয়ে গুলি করে তাদের হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

এ ঘটনায় তিনজনের বিরুদ্ধে অপহরণ, হত্যাসহ অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়।

অভিযোগ ৭: মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে ১৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টার দিকে মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান শিকদার অন্য চার মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে ভাটখলি ক্যাম্প থেকে বাড়ির দিকে যাওয়ার সময় মোড়েলগঞ্জ থানার তেলিগাতীতে খান আকরাম হোসেন ও আবদুল লতিফ তালুকদারসহ রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের হাতে আটক হন।

তারা মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের ওপর নির্যাতন চালায় এবং নদীর কাছে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

এ ঘটনায় খান আকরাম হোসেন ও আব্দুল লতিফ তালুকদারের বিরুদ্ধে অপহরণ ও খুনের অভিযোগ আনা হয়।