September 19, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

‘আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প ভারতকেও হুমকিতে ফেলবে’

ডেস্ক প্রতিবেদক : ভারতীয় আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তা শুধু বাংলাদেশের জন্যই ক্ষতি নয়, ভারতের অখণ্ডতাকেও হুমকির মুখে ফেলে দেবে বলে মন্তব্য করেছেন ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ-আইডিইবি’র সাবেক সভাপতি শাফিউদ্দিন সরকার। সম্প্রতি রাজধানীর পরীবাগের সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে ‘ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প’ শীর্ষক অবস্থানপত্রের ওপর আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন।

সমসাময়িক বিষয় হিসেবে এ অবস্থানপত্রটি তুলে ধরে ‘দেশপ্রেমিক জনগণের মঞ্চ’ নামের একটি সংগঠন। এটি তাদের ৩১৮ নম্বর অবস্থানপত্র।

শাফিউদ্দিন বলেন, ‘ভারতের অনেক অলস টাকা আছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য তাদের টাকার অভাব হবে না। তবে ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে ভারতের লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে। দুই শ’ থেকে পাঁচ শ’ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে তাদেরকে ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। ওই সময়ের আগে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পে যে খরচ হবে তা ফেরত পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশাল অর্থ ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে গেলে ভারতের রাজ্যে রাজ্যে বিরোধ বেধে যাবে। এই বিরোধ ভারতকে ভাঙ্গনের মুখেও ফেলে দিতে পারে।’

অবস্থানপত্রে ‘ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প’ এর ওপর লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন সংগঠনটির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক।

গত ১৩ জুলাই ভারত সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর জারি করা এক প্রেস রিলিজের বরাতে অবস্থানপত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ভারতের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অধ্যাপক সানোয়ার লাল জাট পানি সমৃদ্ধ রাজ্যগুলোকে সদিচ্ছা ও সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার প্রতি আগ্রহী হতে বলেছেন। তিনি নয়াদিল্লিতে আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনার বিশেষ কমিটির পঞ্চম সভায় বলেন, এই মেগা প্রকল্পটি বহুদূর পথ পাড়ি দিয়ে দেশের পানি ও খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি জোরদার করবে।’

ভারতীয় পানিমন্ত্রী বলেন, এই প্রকল্পটি আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারকে শুধু সেচ এবং পানি সরবরাহের সুবিধাই নয়, দক্ষিণের রাজ্যগুলোকেও ব্যাপক পানি সরবরাহ করতে পারবে।

ইনামুল হক আরও বলেন, ‘স্বাধীনতার পর ১৯৫০ দশকের শুরুতে ভারতের পরিকল্পনাবিদরা দেশব্যাপী আন্তঃনদী সংযোগের প্রস্তাব করেন। ১৯৬০ সালে ভারত ও পাকিস্তানের পশ্চিম অংশে Indus Waters Treaty স্বাক্ষরিত হয়।’

তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পাকিস্তানের পূর্ব অংশে গঙ্গা নদীর পানি নিয়ে সমঝোতা ছাড়াই ভারত গঙ্গার ওপর ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণ শুরু করে। ১৯৭৫ সালে ব্যারেজটি চালু করে পানি প্রত্যাহার শুরু হলে বাংলাদেশ বিশেষভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘পাকিস্তান আমলের শুরুতে হার্ডিঞ্জ সেতুর কাছে শুকনা মৌসুমে গঙ্গা নদীতে পানির গড় প্রবাহ ছিলো প্রায় ১ লাখ কিউসেক। ১৯৭৭ সালের গঙ্গা পানি বন্টন চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য ন্যূনতম ৩৪ হাজার ৫০০ কিউসেক পানি সরবরাহের গ্যারান্টি ছিল। ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে সর্বনিম্ন ২৭ হাজার ৬৩৩ কিউসেক পানি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু কোনো গ্যারান্টি দেওয়া হয়নি। ১৯৯৯ সালে ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় এলে আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনাটি আবারও জেগে ওঠে।’

অবস্থানপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, মোট ৩০টি ক্যানাল সিস্টেমের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পে বৃষ্টিপ্রধান উত্তর-পূর্ব ভারত (বাৎসরিক গড় বৃষ্টিপাত ৩৫০০ মিলিমিটার) থেকে খাল কেটে পানি সরিয়ে পশ্চিম ভারতে (বাৎসরিক গড় বৃষ্টিপাত ৭০০ মিলিমিটার) এবং দক্ষিণ ভারতে (বাৎসরিক গড় বৃষ্টিপাত ১০০০ মিলিমিটার) পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। প্রকল্পটি রাজস্থান, গুজরাট ও দক্ষিণ ভারতের জনগণকে লাভবান করবে বিধায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জনগণ এতে বাধা দেবে।

ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা- আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের শুরু আসামের ব্রহ্মপুত্র নদ ও এর উপনদ মানস থেকে। এই নদ দু’টির পানি অন্যত্র সরাতে হলে গৌহাটি অথবা গোয়ালপাড়াতে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর ব্যারেজ নির্মাণ করতে হবে। এই ব্যারেজ আসামের বন্যার পানি দ্রুত সরে যাওয়াকে বাধাগ্রস্ত করে পরিস্থিতি আরও খারাপ করবে। এ ছাড়া মানস নদ সংযোগ প্রকল্পের ১৪নং খালটির মাধ্যমে পানি সরাতে আসামের বরপেটা, কোকড়াঝড় ও ধুবড়ী জেলায় নদীর মতো খাল কাটতে হবে, যা এই এলাকার কোনো উপকারে তো আসবেই না বরং লাখ লাখ লোককে বাসভূমি থেকে উচ্ছেদ করবে এবং পরিবেশ বিপর্যয় ঘটাবে।

পশ্চিমবঙ্গ- আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের ১নং খালের মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে পানি এই অঞ্চল দিয়ে নিতে হলে প্রায় ১০০ মিটার উঁচুতে তুলে ডুয়ার্সের উচ্চভূমি দিয়ে পার করতে হবে। এ ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, উত্তর দিনাজপুর ও মালদহ জেলায় নদীর মতো খাল কাটতে হবে যা লাখ লাখ লোককে বাসভূমি থেকে উচ্ছেদ করবে এবং পরিবেশ বিপর্যয় ঘটাবে। ব্রহ্মপুত্র থেকে গঙ্গায় আনা পানি ১০নং সংযোগ খালের মাধ্যমে বীরভূম, বাঁকুড়া, উত্তর এবং দক্ষিণ মেদিনীপুর জেলার উপর দিয়ে খাল কেটে দক্ষিণ ভারতে নেয়া হবে, যা লাখ লাখ লোককে বাসভূমি থেকে উচ্ছেদ করবে এবং পরিবেশ বিপর্যয় ঘটাবে। এ ছাড়া দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে সংগৃহীত পানির সিংহভাগই বাষ্পীভবন হয়ে উড়ে যাবে।

বিহার সমভূমি- বিহারের নদীগুলোতে যে পানি আছে তা ওই এলাকার জন্য যথেষ্ট। আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের ১২ ও ২নং খালের মাধ্যমে মেচি ও কোশী নদীর পানি বিহারের তরাই অঞ্চল দিয়ে এবং ৩নং খাল দিয়ে গন্ডক নদীর পানি সমভুমির উপর দিয়ে গঙ্গায় ফেলা হবে। এতে ওইসব নদীর অববাহিকায় অবস্থিত জেলাগুলোতে নদীর মতো খাল কাটতে হবে যা এই এলাকার লাখ লাখ লোককে বাসভূমি থেকে উচ্ছেদ করবে এবং পরিবেশ বিপর্যয় ঘটাবে।

বাংলাদেশ – বাংলাদেশে শুকনা মৌসুমে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি শতকরা ৮০ ভাগ চাহিদা পূরণ করে। যার ওপর নির্ভর করে বাংলাদেশের কৃষি ও জীব পরিবেশ গড়ে উঠেছে। এর একটা বিরাট অংশ ভারতের পশ্চিমে চালান করলে বাংলাদেশে ব্যাপক পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে। সমুদ্রের লবণাক্ততা পদ্মার গোয়ালন্দ, মধুমতির কামারখালী, ধলেশ্বরীর মানিকগঞ্জ এবং মেঘনার ভৈরব ছাড়িয়ে যাবে। সমগ্র যমুনা নদীর নাব্যতা হারিয়ে যাবে। সারা দেশের নদী ও অভ্যন্তরীণ জলাভূমির প্রায় অর্ধেক এলাকার জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। মিষ্টি পানির অভাবে সারা দেশের প্রায় অর্ধেক এলাকার ভূতল জীব এবং জনজীবন মারাত্মক বিপদের মুখে পড়বে। মোহনা এলাকার জীববৈচিত্র্য, মৎস্য ও জলসম্পদ বিপর্যস্ত হবে।