December 6, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

ডেস্ক ফাঁকা রেখে তারা ব্যস্ত খোশ গল্পে

ডেস্ক প্রতিবেদন : শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে স্থাপিত ‘কোয়ারেন্টাইন’ বিভাগে কাজের নামে চলে ‘ফাঁকিবাজি’। ডেস্ক খালি রেখে কর্মকর্তা-কর্মচারিরা ব্যস্ত থাকে নিজ কাজে। তাদের বেশিরভাগ সময় কাটে ‘খোশ গল্পে’। এমনকি এ বিভাগের জন্য খোলা ফ্রন্ট ডেস্কটিও প্রায় ফাঁকা পড়ে থাকে।

বিভাগের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার (উপপরিচালক) এসব নিয়ে নেই কোনো মাথা ব্যাথা। এমনকি বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট কেউও জানেনা এ বিভাগের কার‌্যক্রম সম্পর্কে। ফলে ‘অপাত্রে ঘি ঢালার’ মতোই কোয়ারেন্টাইন বিভাগের পেছনে সরকারের খরচ হচ্ছে বিপুল অর্থ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আধীনে ১৯৯৮ সালে তৎকালীন জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে (পরবর্তীতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) কোয়ারেন্টাইন বিভাগ খোলা হয়। এ বিভাগের কাজ হচ্ছে সব ধরনের উদ্ভিদ জাতের পরীক্ষা করা। অর্থাৎ বিদেশ থেকে বাংলাদেশে যেসব উদ্ভিজ্জ পণ্য আমদানি হবে সেগুলোতে কোনো ধরনের রোগ সংক্রামক বা ক্ষতিকারক পোকামাকড় রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা।

একইভাবে দেশ থেকেও বিদেশে রফতানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন উদ্ভিদজাত পণ্য পরীক্ষা করার দায়িত্ব এ বিভাগের। উদ্ভিদজাত হিসেবে চাল, ডাল, গম, আটা, বিভিন্ন ফল ও গাছপালা পরীক্ষা করে এ বিভাগ। এজন্য এখানে নিয়োজিত আছেন ২২ জন কর্মকর্তা কর্মচারি।

‘কোয়ারেন্টাইন কী’ জানেন না সংশ্লিষ্টরা

দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বিমানবন্দরে কাজ করলেও এ বিভাগ সম্পর্কে সংশ্লিষ্টরা কিছুই জানে না। এমনকি কারও কোনো ধারণাই নেই এ বিষয়ে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ বিমানের অনেকের সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে এসেছে এমন তথ্য।

সম্প্রতি কোয়ারেন্টাইন বিভাগ নিয়ে অভিযোগ ওঠে। সেটি যাচাই করতে প্রথমে যোগাযোগ করা হয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অফিসে। সেখানকার বেশ কয়েকটি বিভাগে এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেউই কিছু জানাতে পারেননি। বেশ কয়েকদফা খোঁজ নেয়ার পরে এক কর্মকর্তা সদয় পরামর্শ দিলেন, “বিভাগটি হয়তো বাংলাদেশ বিমানের। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখতে পারেন।”

তার পরামর্শ অনুযায়ী যোগাযোগ করা হয় বাংলাদেশ বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে। তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, “এটি বিমান সংশ্লিষ্ট কোনো বিভাগ নয়।” তবে বিভাগটি কাদের? এমন প্রশ্নের সঠিক কোনো উত্তর তিনিও দিতে পারেননি।

পরে যোগাযোগ করা হয় বিমানবন্দরের দুজন স্বাস্থ্য পরীক্ষকের সঙ্গে। তাদের একজন ডা. আশরাফুল হক বললেন, “আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না।” পরে অপরজন ডা. আবদুল খালেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও একই কথা বলেন।

বিমানবন্দরের পরিচালক হাসান জাকিরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার ব্যক্তিগত সহকারী সেলিমের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, “আমরা যতদূর জানি, এ বিভাগটি কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন।”

এভাবে দফায় দফায় বিমানবন্দরের বিভিন্ন শাখায় খোঁজ নিয়েও এ বিভাগ সম্পর্কে সুর্নির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

গল্পে কাটে সময়
বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ এ বিভাগে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে বেশিরভাগ কর্মকর্তা কর্মচারীর সময় কাটে গল্পে। অনেকেই নিজ আসন ছেড়ে ঘুরে বেড়ান। এমনকি ফ্রন্ট ডেস্কেও অনেকসময় কারও দেখা পাওয়া যায়নি। তবে এমন অভিযোগ তারা মানতে রাজি নন। তাদের মতে, কাজের সময় পুরোদমেই কাজ করেন তারা। অবসর পেলে নিজেরা গল্প করতে দোষ কোথায়?

২৪ ঘণ্টার বিভিন্ন সময়ে ফ্লাইট থাকে বলে ২৪ ঘণ্টাই বিভিন্ন শিফটে দায়িত্ব পালন করার কথা কোয়ারেন্টাইন বিভাগের লোকজনের। এজন্য এ বিভাগে ১৮ জন কর্মকর্তাসহ ২২ জনের টিম রয়েছে। দুইজন পরীক্ষক ও পর‌্যবেক্ষকও রয়েছেন। সেই সঙ্গে রয়েছে একটি পরীক্ষাগার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।

কিন্তু এসবের অনেককিছুই সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। কর্মকর্তাদের খামখেয়ালির কারণে এমন দশা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণকারী এক যাত্রী অভিযোগ করে বলেন, “আমি প্রায়ই এই বিমানবন্দর দিয়ে বিদেশে আসা যাওয়া করি। এ বিভাগের লোকজনকে কর্মব্যস্ত থাকতে খুব কম দেখেছি। অথচ বিভাগটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের অবহেলার কারণে বিদেশ থেকে অনেক মার্স, সার্স, ইবোলাসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ও ক্ষতিকারক পোকামাকড় আমাদের দেশে ঢুকে যেতে পারে। যেটা দেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে। তখন এটা নিয়ে হয়রান-পেরেশান হওয়ার চেয়ে এখনি এতে নজর দেওয়া উচিৎ।”

তিনি বলেন, “আমার মনে হয়েছে এ বিভাগের লোকজনকে কাজ ফেলে গল্প করার জন্যই রাখা হয়েছে। এমনটি হওয়া কাম্য নয়।”

‘আমরা বসে নেই, সারাক্ষণ কাজ করছি’
কোয়ারেন্টাইন বিভাগের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ‘নাকচ’ করে দিয়েছেন এ বিভাগের প্রধান তথা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, “আমরা কেউই বসে নেই। সারাক্ষণই কাজ করছি। আজও থাইল্যান্ড থেকে আসা পঁচিশটি গাছ আটক করেছি। পরীক্ষা শেষে ছাড়পত্র দেওয়ার উপযোগী হলে সেগুলো বিমানবন্দর পেরোতে পারবে।”

প্রায়শ ফ্রন্টডেস্ক খালি থাকার বিষয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, “সবসময়ই ওই ডেস্কে লোক থাকে। কিন্তু জরুরি প্রয়োজনে কেউ খানিক সময়ের জন্য বাইরে যেতেই পারেন। এতে দোষের কিছু নেই।”

তার সঙ্গে কথা হয় বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে। তখন তিনি একটি সেমিনারে ছিলেন বলে জানান। এসব বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ওই সময়েও কোয়ারেন্টাইন বিভাগের ফ্রন্ট ডেস্ক খালি ছিলো। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে হাফিজুর রহমান বলেন, “এখন খালি আছে কারণ ওই দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি আমার সঙ্গে আছেন। তাছাড়া এখন কোনো ফ্লাইটও নেই। ফ্লাইটের সময়ে ওই ডেস্ক খালি থাকে না।”

কোয়ারেন্টাইন মানে
অনলাইন গুগল ট্রান্সলেটরে quarantine শব্দের অর্থ দেওয়া হয়েছে সঙ্গরোধ, ব্যক্তিকে পৃথককরণ, রোগ অন্তরণ, সঙ্গরোধ করিয়া রাখা প্রভৃতি। আর শব্দটির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে- a state, period, or place of isolation in which people or animals that have arrived from elsewhere or been exposed to infectious or contagious disease are placed. অর্থাৎ এমন একটি অবস্থা, সময় বা স্থান যাতে বাইরে থেকে আসা বা ছোঁয়াচে রোগসংক্রমিত এলাকা থেকে আসা কোনো  মানুষ অথবা জীবকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। লক্ষণীয়, এখানে প্রথমেই বলা হয়েছে, মানুষ, এরপর বলা হয়েছে জীবের কথা। তবে শাহজালাল বিমানবন্দরের কোয়ারেন্টাইন বিভাগের মতে, শুধুমাত্র উদ্ভিদ বা উদ্ভিজ্জ পণ্য পরীক্ষা করাই তাদের কাজ।