June 18, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

যানজট নিরসনে ফ্লাইওভারের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

ডেস্ত প্রতিবেদন : রাজধানীর যানজট নিরসনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে ফ্লাইওভার বা উড়াল সেতু। বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করে নির্মিত হচ্ছে অধিকাংশ ফ্লাইওভার। এ সব ফ্লাইওভার যানজট নিরসনের কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত বিশ্বে অকার্যকর হিসেবে বাতিল হওয়া ফ্লাইওভার পরিকল্পনাটি বাংলাদেশের জন্য বিলাসিতা ছাড়া কিছু না। যানজট না কমিয়ে বৈদেশিক দেনার বোঝা বাড়াচ্ছে এ সব প্রকল্প।

উড়াল সেতুর সঙ্গে রাজধানীবাসীর পরিচয় মহাখালী ও খিলগাঁও ফ্লাইওভারের মাধ্যমে। ১১৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে দেশের প্রথম রেলওভার উড়াল সেতু নির্মাণ করা হয় মহাখালীতে। ৬৬৭ দশমিক ৭৮ মিটার দীর্ঘ এই ফ্লাইওভারটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয় ২০০৫ সালে।

ফ্লাইওভারটি মহাখালী রেলক্রসিং থেকে কাকলী পর্যন্ত সংযোগ স্থাপন করেছে। ফলে এটির মাধ্যমে শুধু উত্তরা, বিমানবন্দর, খিলক্ষেতগামী গাড়িগুলো মহাখালী রেলক্রসিংয়ের দীর্ঘ সিগন্যাল থেকে রক্ষা পেয়েছে। তবে তা ফার্মগেট বিজয় সরণী হয়ে মহাখালী, গুলশান-১, বনানী, বাড্ডা রুটে চলাচলকারী পরিবহনের জন্য কোনো সুফলই বয়ে আনতে পারেনি। এ সব রুটে চলাচলকারী গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত যানবাহনগুলোকে ব্যবহার করতে হচ্ছে আগের পথ। আর এ সব পরিবহনকে মহাখালী রেলক্রসিংয়ে দীর্ঘ যানজট মোকাবিলা করতে হচ্ছে আগের মতোই। যার ফলে মহাখালী এলাকার চিরচেনা যানজট এখনো পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। অন্যদিকে যে সব যানবাহন ফ্লাইওভারটি ব্যবহার করছে তারাও যে যানজট থেকে রক্ষা পাচ্ছে তা নয়। মহাখালী রেলক্রসিংয়ের যানজট থেকে রক্ষা পেলেও কাকলী সিগন্যাল পয়েন্টের জটে আটকে থাকতে হচ্ছে দীর্ঘক্ষণ।

২০০৫ সালে ১ দশমিক ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ খিলগাঁও বাসাবো ফ্লাইওভার খুলে দেওয়া হয় যান চলাচলের জন্য। ৮১ দশমিক ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই উড়াল সেতুর উপর দিয়ে সকল প্রকার যান চলাচল করলেও ২০১১ সালে ফ্লাইওভারটিতে ফাটল দেখা দেয়। এরপর বাস, ট্রাকসহ ভারী যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়। কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবারও তা ভারী যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। তবে ফ্লাইওভারটির নকশাগত ত্রুটির কারণে খিলগাঁও রেলক্রসিংয়ের যানজটে পড়তে হচ্ছে অধিকাংশ যানবাহনকে। ফ্লাইওভারটি দিয়ে পশ্চিম দিক অর্থাৎ রাজারবাগ-খিলগাঁও হয়ে সায়েদাবাদ- যাত্রাবাড়ী এবং অন্যদিকে মালিবাগ ও রামপুরা রুটে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু রামপুরা-মালিবাগ হয়ে রাজারবাগের দিকে আসতে ফ্লাইওভারটিতে কোনো লেন রাখা হয়নি। এতে করে এই রুটের যানবাহনগুলো আগের মতোই খিলগাঁও রেলক্রসিংয়ের যানজটে আটকে থাকছে।

বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে নেওয়া তেজগাঁও বিজয় সরণী রেলওভার ফ্লাইওভারটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয় ২০১০ সালে। নির্মিত ফ্লাইওভারটি কার্যত কোনো যানজট নিরসন তো করেইনি বরং বিজয় সরণীতে সৃষ্টি করেছে দীর্ঘ যানজটের। রেলওভার এই ফ্লাইওভারটি যান চলাচলের জন্য চালু করার পর তেজগাঁও পয়েন্ট থেকে বিজয় সরণী চলাচলকারী যানবাহনের দীর্ঘ জট ফ্লাইওভারটির উপর পর্যন্ত ছাপিয়ে যায়।

খিলগাঁও, মহাখালী ফ্লাইওভার যেখানে যানজট নিরসনে ব্যর্থ হয়েছে সেখানে নতুন করে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে উড়াল সেতু প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। রাজধানীর সবচেয়ে বড় ফ্লাইওভারটি নির্মাণ করা হয়েছে যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার। ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভারটি নির্মাণে ব্যয় হয় দুই হাজার ১০০ কোটি টাকা। চার লেনের এই ফ্লাইওভারটিতে মোট ৬টি এন্ট্রি ও ৫টি একজিট র‌্যাম্প রয়েছে। সম্পূর্ণ বেসরকারি খাতে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারটি ২০১৩ যান চলাচলের জন্য আংশিক খুলে দেওয়া হয়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালে এ ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ হাতে নেয় চারদলীয় জোট সরকার। প্রকল্পটি সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের পরিবর্তে বিল্ট-ওন-অপারেট এ্যান্ড ট্রান্সফার (বিওওটি) পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এ ব্যাপারে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আনসার আলী বলেন, ‘২০০৩ সালে গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার প্রকল্প হাতে নেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। ৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই প্রকল্পটির প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়ায় ব্যয় ধরা হয় ৬৭০ কোটি টাকা। প্রায় দুই বছর পর ২০০৫ সালের ২১ জুন ফ্লাইওভারটি নির্মাণে ওরিয়ন গ্রুপের সঙ্গে ঢাকা সিটি করপোরেশনের চুক্তি হয়। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে এ প্রকল্পের সকল কার্যক্রম স্থগিত করে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে ২০১০ সালের ২২ জুন এ ফ্লাইওভারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে। পরবর্তী সময়ে ফ্লাইওভারটির দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি ও নির্মাণ ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১০৮ কোটি টাকা।’

আনসার আলী আরও বলেন, ‘ফ্লাইওভারটি নির্মাণে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে এ প্রকল্প সম্পন্ন করেছে ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড। কোম্পানিটিই সম্পূর্ণ অর্থায়নের ব্যবস্থা করেছে। ফ্লাইওভারটির ডিজাইন করেছে কানাডীয় কোম্পানি লি কানাডা। এটি নির্মাণ করছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান সিমপ্লেক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল লিমিটেড।’

সিটি করপোরেশনের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘নির্মাণ কাজের ব্যবস্থাপনা করছে লাসা নামে ভারতের আরেকটি কোম্পানি। নির্মাণ ব্যয় লাভসহ তুলে নিতে ওরিয়ন গ্রুপ নিজেই ফ্লাইওভারটির ব্যবস্থাপনা, টোল আদায় ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয়। এরই অংশ হিসেবে ফ্লাইওভারটি চালু হওয়ার পর থেকে ২৪ বছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি টোল আদায় করবে এবং আদায়কৃত টোলের ৫ ভাগ দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তহবিলে জমা দিবে।’

পিপিপি ভিত্তিতে নির্মাণ করা ফ্লাইওভারটির মালিকানা কার্যত ওরিয়ন গ্রুপের হাতেই রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আর এতে করে বেসরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি জনস্বার্থের কথা চিন্তা না করে নিজস্ব লাভের কথা চিন্তা করবে বলে মনে করেন তারা।

এদিকে ৭৭২ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৮ দশমিক ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রাজধানীর মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছে। অপরদিকে ৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মিরপুর-এয়ারপোর্ট ফ্লাইওভার প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৯১ কোটি টাকা। এখন তা বাড়িয়ে ৩৬০ কোটি করা হয়েছে। এই টাকার মধ্যে বনানী রেলক্রসিং ওভারপাসও (সংশোধিত) নির্মাণ করা হচ্ছে।

এ ছাড়া কুড়িল বিশ্বরোড, বনানী, প্রগতি সরণী ও নিউ এয়ারপোর্ট এলাকার সঙ্গে সংযুক্ত করতে ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজ চলছে।

হাজার হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক অনুদান ও বেসরকারি অর্থায়ন নির্ভর এ সব ফ্লাইওভার কতটুকু কাজে আসবে তা নিয়ে সন্দিহান বিশেষজ্ঞরা। তাদের অনেকেই মনে করছেন এ সব ফ্লাইওভার শুধু দেনাই বাড়াবে। নগরীর যানজট নিরসনে কোনো ভূমিকা রাখবে না।

রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ফ্লাইওভার প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ ও সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজের (সিইউএস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে যখন ফ্লাইওভার অকার্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়ে বাতিল করা হয়েছে, ঠিক তখন ধার-দেনা করে আমরা ফ্লাইওভার বিলাসিতায় মেতেছি। এক প্রকার কংক্রিটের জঞ্জাল তৈরি করছি। শরীরের কোথায় সমস্যা সেটা নির্ণয় না করে আমরা ইচ্ছামত ট্রিটমেন্ট চালাচ্ছি। এমন একটা সময় আসবে যখন ফ্লাইওভারের উপরও যানজট সৃষ্টি হবে। যা মহাখালী, তেজগাঁও ফ্লাইওভারে ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে।’

নজরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘বিশ্বের কোনো মেগাসিটিতে নাগরিকের সুযোগ-সুবিধা প্রদানের জন্য বেসরকারি উদ্যোগে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হয় না। ঢাকাতে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার প্রকল্পটি একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। অন্যান্য দেশে গণপরিবহনের জন্য জ্বালানিতে ভর্তুকি দেওয়া, চলাচল নির্বিঘ্ন করতে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। আর এ সব প্রকল্প ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয় একটি মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকার গণপরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য এখনো পর্যন্ত কোনো ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যান গ্রহণ করা হয়নি। আবার রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কে করবে তাও নির্ধারিত নেই। কখনও রাজউক, কখনও সিটি করপোরেশন আবার কখনও সড়ক পরিবহন অধিদফতর বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। যানজটের মূল কারণ অনুসন্ধান না করে একেক সময় একেক প্রকল্প একেক কর্তৃপক্ষ প্রস্তাব করছে এবং তা বাস্তবায়নও হচ্ছে। কিন্তু ফলাফলটা আগের মতোই। ইতোমধ্যে রাজধানীতে পাঁচটি ফ্লাইওভার চালু হয়েছে, কিন্তু ফলাফলটা কি হয়েছে তা সবার জানা। আরও কয়েকটি ফ্লাইওভারের কাজ চলছে। এক সময় দেখা যাবে পুরো রাজধানী ফ্লাইওভারে ঢেকে গেছে।’

বৈদেশিক সহায়তা ও পিপিপির ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে এই নগর বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির নামে যদি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়া হয় তাহলে অবশ্যই তা নগরবাসীর জন্য সুফল বয়ে আনবে না। আবার বৈদেশিক অনুদান ব্যয়ের প্রবণতা থেকে অনেক সময় বুঝে না বুঝে অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে দেখা যায় এ সব প্রকল্প নগরবাসীর জন্য কোনো সুফল বয়ে আনছে না।’

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম-সম্পাদক পরিবহন বিশেষজ্ঞ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘যে কোনো মেগাসিটিতে ফ্লাইওভার প্রকল্প যানজট নিরসনে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু দেখতে হবে প্রকল্পগুলো পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্রহণ করা হচ্ছে কিনা। ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যান (পরিবহন মহাপরিকল্পনা) অনুযায়ী ফ্লাইওভার প্রকল্প গ্রহণ করলে তা অবশ্যই ফলপ্রসূ হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের দেশে যে সব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে তার সবই ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী হচ্ছে না।’

ইকবাল হাবিব আরও বলেন, ‘একটি উদাহরণ দিলেই বুঝতে পারবেন কতটা অপরিকল্পিতভাবে এ সব ফ্লাইওভার করা হয়েছে। যেমন ২০০৫ সালে মহাখালী রেলক্রসিংয়ের উপর দিয়ে কাকলী পর্যন্ত একটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়। তখনও নীতি নির্ধারকদের জানা ছিল না যে কুড়িল বিশ্বরোড, মিরপুর এয়ারপোর্ট ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রয়োজন হবে। কিন্তু দেখা গেল পরবর্তী সময়ে এ সব প্রকল্পের কাজও শুরু করা হল। খণ্ড খণ্ড এ সব ফ্লাইওভার যানজট নিরসন তো করছেই না বরং বিশেষ বিশেষ পয়েন্টে অসহনীয় যানজট সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে মহাখালী ফ্লাইওভারের জাহাঙ্গীর গেট প্রান্ত থেকে যে সব পরিবহন উত্তরার দিকে যাচ্ছে তারা মিলিত হচ্ছে কাকলী-বনানী সিগন্যাল পয়েন্টে। আবার কুড়িল-বিশ্বরোড, মিরপুর-এয়ারপোর্ট ফ্লাইওভারটি ব্যবহার করা পরিবহনগুলো মিলিত হচ্ছে একই পয়েন্টে। এতে এই পয়েন্টটিতে একটা জটলার সৃষ্টি হচ্ছে। অনেকটা পানির মতো। যেখানে ঢালু সেখানেই জমছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অপরিকল্পিতভাবে গ্রহণ করা এ সব প্রকল্প দেখে মনে হয় শুধু বৈদেশিক টাকা খরচের জন্যই এগুলো করা হচ্ছে। আমাদের ভাবতে হবে এ সব ফ্লাইওভার কাদের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে। এগুলোর উপর দিয়ে কোন ধরনের পরিবহন চলাচল করছে। আসলে এ সব ফ্লাইওভার দিয়ে প্রাইভেটকার ছাড়া অন্য কোনো পরিবহন চলাচল করবে না। এর কারণ হচ্ছে গণপরিবহনগুলোকে প্রতি আধা কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে যাত্রী ওঠানো-নামানো করতে হয়। ফলে ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে কখনই এ সব গণপরিবহন চলাচল করবে না। যদি দূরপাল্লার পরিবহন হত তাহলে এ সব ফ্লাইওভার ব্যবহার করা সম্ভব ছিল।’

নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব আরও বলেন, ‘বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের এক গবেষণা অনুযায়ী দেখা যায়, মাত্র ১৭ শতাংশ জনগোষ্ঠীর জন্য এ সব ফ্লাইওভার করা হচ্ছে। বাকি ৮৩ শতাংশ মানুষকে পোহাতে হবে দুর্বিষহ যানজট।’

তিনি আরও বলেন, ‘যত টাকা ব্যয় করে এ সব ফ্লাইওভার করা হচ্ছে তার অর্ধেক টাকায় বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ও মাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের মতো জনকল্যাণকর প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল। অন্যদিকে মেগাসিটির মধ্যে কোনো ফ্লাইওভারে চলাচলের জন্য টোল আদায় এবং তা যদি কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে হয় তাহলে এখানে জনস্বার্থ প্রাধান্য পাবে না। প্রতিষ্ঠানটি তাদের ইচ্ছামত টোল আদায় করবে আর এতে করে গণপরিবহনগুলোর ভাড়া বৃদ্ধি পাবে। কিছুদিন পর দেখা যাবে ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়ায় গণপরিবহনগুলো ফ্লাইওভার ব্যবহার ছেড়ে দিচ্ছে। ফলে যে যানজটের ধকল জনগণকে পোহাতে হয়েছে তা কমবে না।’