October 23, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

প্রবীর সিকদারের মুক্তি চাই না

প্রভাষ আমিন :

প্রবীর সিকদার শহীদ পরিবারের সন্তান। এই পরিবারের ১৪ জন একাত্তরে দেশমাতৃকার জন্য জীবন দিয়েছেন। তার পিতার মরদেহও পাওয়া যায়নি। তার পিতার রক্তমাংস মিশে গেছে এই বাংলায়। তাই বাংলাদেশটাই যেন তার পিতা। পূর্বসূরীদের ধারাবাহিকতায় প্রবীর সিকদারও বয়ে চলেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পতাকা। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অক্লান্ত যোদ্ধা প্রবীর সিকদার। আমাদের মতো ভার্চুয়াল যোদ্ধা নয়, তার যুদ্ধ মাঠে-ময়দানে। তার সাংবাদিকতার শুরু ফরিদপুরে, সেখানে দৈনিক জনকণ্ঠের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে কাজ করেন দৈনিক সমকাল ও দৈনিক কালের কণ্ঠে। এখন তিনি নিজেই বাংলা ৭১ নামে একটি দৈনিক ও উত্তরাধিকার ৭১ নিউজ একটি অনলাইন সম্পাদনা করেন। গোটা ক্যারিয়ারেই তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে লেখালেখি করে গেছেন। জনকণ্ঠে ‘তুই রাজাকার’ শিরোনামে ধারাবাহিকে লেখার অপরাধে হামলার শিকার হন। মরেই যেতেন। বর্তমা্ন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চেষ্টায় উন্নত চিকিৎসায় প্রাণে বেঁচে গেছেন। তবে হারিয়েছেন একটি পা, কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন এক হাতের। এখন শরীরে অসংখ্য বোমার স্প্লিন্টার বয়ে বেড়ান। তীব্র ব্যথা নিয়ে চলতে হয় তাঁকে। কিন্তু যুদ্ধে একটুও ছাড় দেননি। যুদ্ধাপরাধীদের বিপক্ষে আর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লিখেই যাচ্ছেন।

ধনকুবের মুসা বিন শমসেরের একাত্তরের ভূমিকার কথা লিখে একবার মরতে বসেছিলেন। আবারও লিখেছেন। আবারও হুমকি এসেছে। থানায় গিয়েছিলেন নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করতে। পুলিশ জিডি নেয়নি। সম্প্রতি তিনি ফরিদপুরে ‘দয়াময়ী ভবন’ নামে একটি ভবনের বিক্রি নিয়ে লিখছিলেন। ইঙ্গিত ছিল, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ জোর করে হিন্দু পরিবার থেকে ভবনটি কিনে নিয়েছেন। যদিও মন্ত্রীর পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে, ন্যায্য দামেই তারা ভবনটি কিনেছেন। এইসব লেখালেখির কারণেই বারবার হুমকির মুখে পড়েন প্রবীর শিকদার। থানায় জিডি করতে না পেরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দ্বারস্থ হন তিনি। গত ১০ আগস্ট ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাসে তিনি তার জীবন সংশয়ের কথা লিখেছিলেন। তিনি তার মৃত্যুর জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ, মুসা বিন শমসের এবং ফাঁসির দন্ড পাওয়া পলাতক আসামী আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার এবং তার অনুসারীদের দায়ী করেন। এতেই কাল হয়েছে। নিজের জীবন সংশয়ের কথা প্রকাশ করার অপরাধে তিনি এখন কারাগারে।

রোববার রাতে শেরেবাংলানগর থানা পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে তাঁকে তার অফিস থেকে ডেকে নেন। পরে রাস্তায় গাড়ি বদল করে তাকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে রাতেই তাকে ফরিদপুর নিয়ে যাওয়া হয়। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আইসিটি আইনে মামলা হয়েছে। সে মামলাতেই তাকে আটক করা হয়।

তার বিরুদ্ধে করা মামলার অভিযোগ শুনে আমি রীতিমত শঙ্কিত। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার অপরাধে যদি মামলা হয়, আর সেই মামলা আমলে নিয়ে যদি পুলিশ গ্রেপ্তার করা হয়, তবে আমরা হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তারের ঝুঁকির মধ্যেই বাস করছি। প্রতিদিন আমরা কত স্ট্যাটাস দেই। তার অনেকগুলোই কারো না কারো বিপক্ষে যায়। কে, কখন মামলা করে দেয় কে জানে। শঙ্কাটা আরো বেশি, কারণ প্রবীর সিকদারকে যদি এভাবে তার অফিস থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে অন্যদের কী হবে?

প্রবীর সিকদার কট্টর আওয়ামী লীগ সমর্থক। একজন পেশাদার সাংবাদিকের যতটা নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ থাকা উচিত, ততটা তিনি নন। ‘আমার বোন শেখ হাসিনা’ নামে একটি বই লিখেছেন তিনি। গত ১০ আগস্ট ফেসবুকে তিনি লিখেছেন ‘যে কেউ একজন আওয়ামী লীগ করতেই পারেন। কিন্তু তাদের সকলেই আওয়ামী লীগার হতে পারবেন না। আওয়ামী লীগার তারাই হতে পারবেন, যাদের রক্তে আওয়ামী লীগ আছে।’ ১৫ আগস্ট তিনি লিখেছেন ‘আজ সারাদিন কোথাও যাইনি। বাসার বারান্দায় ফোটা একটি ছোট সাদা ফুল ঘরের দেয়ালে বঙ্গবন্ধুর ছবিতে লাগিয়ে শুধু একটা প্রণাম করেছি।’ ১৬ আগস্ট লিখেছেন ‘একাত্তরে পিতা হারিয়েছি। সেই থেকে বঙ্গবন্ধু মুজিবই আমাদের পিতা।’

তার এতটা দলীয় আচরণ আমার পছন্দ নয়। একজন পেশাদার সাংবাদিকের অবশ্যই দলীয় রাজনীতির উর্ধ্বে থাকা উচিত। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতে তার মতো একজন কট্টর দলীয় সাংবাদিককেও যখন ঠুনকো অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে যেতে হয়, তখন শঙ্কিত না হয়ে উপায় আছে?

হায়, এই দেশে কি আজ নিরাপত্তা চাওয়াও অপরাধ? যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে লেখাও অপরাধ?

তবে প্রবীরদা নিরাপদেই আছেন। কারাগারই এখন তার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ। বাইরে থাকলে ২০০১ সালের মতো আবারও হামলার শিকার হতে পারতেন। ফেসবুকে যে শঙ্কা প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, তা সত্যি হয়ে যেতেও পারতো। তাই প্রবীরদার মুক্তি চাই না।

লেখক: সহকারি বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ