January 28, 2022

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

সহমর্মিতা না দেখানোটাই যে নির্যাতন

বাংলাদেশে ঘরে যে সব শিশু , কিশোরী এবং বৃদ্ধা কাজ করে, তাদের সাথে সব চেয়ে অমানবিকতা যেইটা আমরা করি সেইটা শুধু বেতন কম দেয়া বা খাবারে বৈষম্য নয়- বরং সেইটা তাদের সাথে ব্যবহারে কোন এম্প্যাথি বা সহমর্মিতা না দেখানোতে।

একটা গ্রাম থেকে আশা শিশু বা কিশোরী বা বৃদ্ধা – তার পরিবারকে ফেলে একটা সম্পূর্ণ অপরিচিত পরিবেশে এসে থাকে। তার মজুরিও যতসামান্য।
তার বাবা মা ভাই বোন কারো সাথে দেখা করার সুযোগ নেই।

কখনো পরিবারের জন্যে খারাপ লাগলে কারো সাথে শেয়ার করার সুযোগ নেই।
এই পেশাতে তার ভবিষ্যতের কোন স্বপ্ন নাই, সম্ভাবনা নাই।
প্রতি মুহূর্তে তার মানবিক অস্তিত্ব বিপন্ন থাকে।
তার কাজে কোন আনন্দ নাই।
কিন্ত, তাদের সাথে সামান্য সহমর্মিতা দেখানো হয়না ।
আমাদের ওদের প্রতি মনোভাব থাকে, দাসের সাথে মালিকের। কর্মচারীর সাথে কর্মকর্তার নয়।
পরিবারের একজন হিসেবে মর্যাদা দেয়া তো অনেক দুরের বিষয়।

হুমায়ুন আহমেদের বহুব্রীহি নাটকে আফজাল যখন, ঘরের কাজের মহিলাকে, মা মনে করে, সালাম করে ফেলেছিল, সেইটা আমাদের মধ্যবিত্ত সেন্সিবিলিটিতে চরম কমেডি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এখনো কোন বাসায় ঘরের বিছানায় কাজের লোকদের বসার অনুমতি নাই, কারন সে নোংরা।

তারা নিজেদের অস্তিত্বকে প্রতি মুহূর্তে অপমানিত হতে দেখে। এই জন্যেই, অনেক অসুবিধা সত্ত্বেও অনেকে, পোশাক শিল্পে কাজ করা প্রেফার করে কারন সেই খানে অনেক নির্যাতনের রিস্ক থাকলেও, তার মানবিক মর্যাদা নিয়ে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ফুটবল খেলা হয়না।

অবশ্যই সর্ব নিম্ন মজুরির রাষ্ট্রীয় প্রটেকশান না থাকাতে, তাদেরকে আর্থিক ভাবে নির্যাতনের সুযোগটা রাষ্ট্রই খুলে দিয়েছে। কিন্তু, ব্যক্তি হিসেবে আমরা কার সাথে কি ব্যবহার করবো, সেইটা রাষ্ট্র নির্ধারণ করে দেয় না। সেইটা আমরা নিজেরাই নির্ধারণ করি।

বাচ্চারা একদম ছোটকাল থেকেই শেখে, আমি মালিক সে দাস। একদম ছোট ৫ বছরের বাচ্চা, তার চেয়ে বড় কাজের ছেলেকে তুমি বলে ডাকে। তার ড্রেস পরিয়ে দেয় একটা কাজের ছেলে বা মেয়ে। তাকে স্কুলে দিয়ে আসে।
এই তাকে এই ছোট বাচ্চাটাও শিখে যায়, এই পৃথিবীতে সমতা দেখানোর দরকার নাই। একটা গ্রুপ হলো বস, আরেকটা গ্রুপ দাস। আমাদের যে চারিদিকে অনাচার দেখে চোখ সয়ে যায়, তার ট্রেনিং শুরু হয় এই বয়স থেকেই।

সব চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, আমাদের শ্রমিক আইন হইতে শুরু করে সকল আইন এবং বামপন্থী হতে, শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে সকল পক্ষের হিসেবে, তাদের অস্তিত্ব স্বীকারও করা হয়না।আমাদের শ্রম আইনে, ডমেস্টিক হেল্প বা ঘরোয়া শ্রমিকদের কোন স্ট্যাটাস নেই। তাই সে চাকুরিচ্যুত হলে, বা কম বেতন পেলে বা নির্যাতনের স্বীকার হলে- তার কোন যাওয়ার জায়গা নেই। এর কারন, আমরা জাতি হিসেবে নাখাস্তা জাতি। আমাদের সকল প্রগতি হয় বিদেশীদের ফান্ডে বা বিদেশীদের ভাবনা থেকে অথবা ভাঙচুর করে কেউ আদায় করে নেয়। গৃহস্থ শ্রমিকদেরকে যেহেতু কেউ প্রতিনিধিত্ব করেনা, তাই তাদেরকে দেখার কেউ নাই।

আমরা রানা প্লাজার ধ্বংসে আপ্লুত হই, রাজনের হত্যায় আমরা ক্ষুব্ধ হই, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়াকে সকাল বিকাল গালি দেই, কিন্তু নিজের বাসায় কাজের মানুষের প্রতি সামান্য দায়িত্ব পালন করি না।পরিবার থেকে দূরে থাকা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন বিবর্জিত একটা পেশায় তার প্রতি সহমর্মিতা না দেখানোটাই যে নির্যাতন, এইটা বোঝার ক্ষমতা আমাদের নেই।

হয়তো এই রাষ্ট্র একদিন মানবিক হবে। তার আগে, এই রাষ্ট্র যদি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় তবে তাতে আসলে আপত্তির খুব কোন কারন নাই। হয়তো তাহলে ধ্বংসাবশেষ থেকে উঠে দাঁড়ানো সহজ হবে।