June 30, 2022

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

ঢাকা আইসিইউতে থাকা রোগীর মতো: আনিসুল হক

নিজস্ব প্রতিবেদক : যানজটকে রাজধানীর প্রধান সমস্যা হিসেবে অভিহিত করেছেন মন্ত্রী, মেয়র, নগরপরিবহন বিশেষজ্ঞসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। তারা মনে করেন, যানজটের কারণে ঢাকা শহরের এখন ‘মুমূর্ষু অবস্থা’। এই অবস্থার অবসান হওয়া জরুরি।
রোববার রাজধানীর ‘স্যারিনা হোটেলে’ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) আয়োজিত ‘নগর ঢাকার যানজট: উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এমন অভিমত ব্যক্ত করেন। বৈঠকে যানজট সমস্যার সমাধান নিয়ে নগর পরিবহন বিশেষজ্ঞরা তাদের মতামত তুলে ধরেন।
এ সময় ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি)-এর সভাপতি অধ্যাপক শামিম জেড বসুনিয়া রাজধানীতে একের পর এক ফ্লাইওভার নির্মাণকে ‘ভুল সিদ্ধান্ত’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এর প্রতিবাদ জানান নগর পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন বোর্ডের সাবেক নির্বাহী পরিচালক তানভীর নেওয়াজ। পরে একজন আরেকজনের সঙ্গে আলোচনা করে ভুল সংশোধনের কথা বলেন।
যানজটের কারণে ঢাকা শহরকে আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) থাকা রোগীর সঙ্গে তুলনা করেন মেয়র আনিসুল হক। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ঢাকা শহরের অবস্থা হাসপাতালের আইসিইউতে থাকা রোগীর মতো। এর ডাক্তার হচ্ছেন মেয়র, যিনি কখনো ডাক্তারি পড়েননি। নগরবাসী মনে করেন, এসব সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব মেয়রের। অথচ মেয়রের হাতে সেই ক্ষমতা নেই। অথচ রোগী মরে যাচ্ছে। সবাই শুধু গবেষণা করছে। এটা না করে কীভাবে রোগীকে বাঁচানো যায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে।’
মেয়রের বক্তব্যের সূত্র ধরে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এক ঝুড়িতে বেশি ডিম রাখলে হবে না। আগে ছোট ছোট পরিকল্পনা করতে হবে। সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।’
মন্ত্রী রাস্তা ও ফুটপাতকে আগে দখলমুক্ত করার পরামর্শ দেন মেয়র আনিসুল হককে।
এ প্রসঙ্গে আনিসুল হক বলেন, ‘সবাই ফুটপাত থেকে হকার তুলে দেয়ার কথা বলেন। রাস্তা দখলমুক্ত করার কথা বলেন। কিন্তু কাজটা এত সহজ না। ফুটপাতে যারা ব্যবসা করেন তারা পুলিশ ও প্রভাবশালীদের টাকা দিয়ে ব্যবসা করতে বসেন। তাদের পেছনে অনেক শক্ত হাত আছে।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘যানজট নিরসনের দায়িত্ব ট্রাফিক বিভাগের। কিন্তু নগরবাসী মনে করেন, এই সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব মেয়রদের। মেয়ররাও এ সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখতে চান। এজন্য তারা কাজও করছেন।’
তবে একবারে ঢাকা শহরের সকল যানজট নিরসনের মতো আকাশকুসুম কল্পনা না করে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি প্রধান সড়ককে আগে যানজটমুক্ত করার জন্য কাজ শুরু করা উচিত বলে মন্তব্য করেন সাঈদ খোকন। তিনি গাড়ির নম্বরের জোড়-বিজোড় সংখ্যা অনুযায়ী রাস্তায় চলাচলের ব্যাপারেও নিয়ম চালুর দাবি জানান।
স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘রাজধানীতে মেট্রো রেলের কাজ শুরু হয়েছে। মগবাজার এলাকায় ফ্লাইওভার নির্মাণের কারণে যে রকম সমস্যা হচ্ছে, মেট্রো রেলের এলাকাতেও কাজ করতে গেলে ওই রকম যানজট তৈরি হতে পারে। এ বিষয়টিও মাথায় রেখে পরিকল্পনা হাতে নিলে নগরবাসীর ভোগান্তি কমবে।’
বৈঠকে অধ্যাপক শামিম জেড বসুনিয়া বলেন, ‘মগবাজার ফ্লাইওভার নির্মাণের পর ঢাকা শহর অচল হয়ে পড়বে। সব গাড়ি গিয়ে সাতরাস্তায় জমা হবে। সেগুলো যাওয়ার জায়গা পাবে না। আর এটা যে হবে তার প্রমাণ বনানী ও মহাখালী ওভারপাস। বনানী ওভারপাস থেকে নামার পরই এক ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়। মহাখালীর ক্ষেত্রেও তাই। তিনি বিদ্যমান রেলপথের নিচ দিয়ে মেট্রো রেল ও রেলপথের ওপর দিয়ে এক্সপ্রেসওয়ে বা মেট্রো রেল করার প্রস্তাব দেন। কারণ রেললাইনের নিচের জায়গা নিষ্কণ্টক।’
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, ‘উন্নত দেশের নগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য একটি পরিকল্পনা করে কাজ করা হয়। ঢাকা শহরে পরিকল্পনা ছাড়াই কাজ করা হচ্ছে। যখন যে স্থানে কোনো কিছু করতে মন চায়, সেটাই করা হয়। এতে মূল সমস্যার সমাধানের কাজ এগোচ্ছে না।’
সাবেক সংসদ সদস্য মেজর অব. আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘৩৪টি স্থানে ইউপাস করা হলে রাজধানীর যানজট থাকবে না। একেকটি নির্মাণ করতে সময় লাগবে তিন মাস। এটা করতে সরকারকেও টাকা দিতে হবে না।’
এ রকম একটি প্রস্তাব তার কাছে আছে জানিয়ে তিনি সেটা ডিএনসিসি মেয়র আনিসুল হকের কাছে উপস্থাপনের আশ্বাস দেন।
তানবীর নেওয়াজ রাজধানীর বাসগুলোকে কয়েকটি কোম্পানির আওতায় আনার দাবি জানিয়ে বলেন, ‘কয়েকটি কোম্পানিকে ফ্রাঞ্চাইজ করে দিয়ে সেগুলোকে একই রঙ দিয়ে দিলে বাসচালকদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা থাকবে না। কোনো চালক রাস্তার মধ্যে বাসকে আড়াআড়ি করে রাখবে না। এটা করার জন্য সরকারের অর্থের প্রয়োজনও পড়বে না। যাত্রীরাও নির্দিষ্ট স্থানে লাইনে দাঁড়িয়ে গাড়িতে উঠতে পারবেন।’
তিনি গাবতলী-আজিমপুর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ দ্রুত শুরু করার পক্ষেও মত দেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার গোলাম ফারুক রাজধানীর যানজটের কারণ স্লাইড শোর মাধ্যমে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘কয়েকটি রাস্তা রিকশামুক্ত করা গেলে যানজট কমত। কিন্তু সেটার অনুমতি তারা পাচ্ছেন না।’
তিনি বলেন, যারা উল্টোপথে গাড়ি ঢুকিয়ে দেন তারা অনেক প্রভাবশালী। তাদের গাড়ি ঠেকাতেও ট্রাফিক সদস্যদের ভয় হয়।
আলোচনায় আরও অংশ নেন অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন, পরিবহন মালিক সমিতির নেতা খন্দকার এনায়েত উল্লাহ, স্থপতি ইকবাল হাবিব, নগর পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মুহম্মদ সালেহউদ্দিন প্রমুখ।