June 30, 2022

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

এক টুকরো ছেলেবেলা

জাহীদ রেজা নূর :

একটা ছোট ঘটনাই এ মুহূর্তে ভরিয়ে দিল মন।
আব্বা মারা যাওয়ার পর ওলোট–পালট হয়ে গিয়েছিল আমাদের জীবন। হঠাৎ করেই বিশাল ভূবনটা হয়ে আসছিল সংকীর্ণ। আমরা যারা সব পেয়েছির দেশে ছিলাম, তারা আবিস্কার করলাম, জীবনটা আসলে স্বপ্নের মতো নয়, প্রতি মুহূর্তে আঘাত পেয়ে পেয়ে এগোতে হয় পথ।
টাকা–পয়সা  তখন ছিল না আমাদের। কায়ক্লেশে হেঁসেল ঠেলছেন আম্মা। এরই মধ্যে আমাদের আট ভাইয়ের বন্ধুরাও দুপুরের খাবারের টেবিলে নিত্যদিন। ডাল আর কোনো এক তরকারি দিয়ে কীভাবে কীভাবে যেন চলে যাচ্ছিল অলৌকিক এ সংসার।
ঠিক সে সময়, বাইরে থেকে ফিরে এসেছিলেন চামেলীবাগের ভুলু মামু। আমার জন্য নিয়ে এসেছিলেন ছোট ছোট কাঁটা চামচের একটি সেট। কীভাবে তার সদ্ব্যবহার করা যায়, সেই ছিল ভাবনা।
তখন শাহীন ভাই (মেজ ভাই) চাকরি করছেন। মাঝে মাঝে উদ্ভট অংকের টাকা দিয়ে দিতেন আমাদের। আমরা বিস্মিত হয়ে সে টাকায় কী করব, ভাবতাম। সে রকমভাবেই সে সময় শাহীন ভাই আমাকে আট আনা পয়সা দিলেন। আমি তখন সেই পযসা নিয়ে গেলাম বাড়ির সামনের মোল্লার দোকানে। কিনলাম একটা ডিম। বাড়ি এসে দুটো আলু জোগাড় করলাম। তারপর ছোট্ট এক হাড়িতে তা সিদ্ধ করতে দিলাম। বাড়ির কোনো মানুষ আমার এই উদ্ভট কাজের দিকে লক্ষ্য রাখছে কি না, সেদিকে আমার খেয়াল নেই। আমি তখন অপার্থিব এক জগতে ঢুকে গেছি। এই জগতে একমাত্র আমি আর আমি। আমি সেখানে পাঁচতারা হোটেলের মূল শেফ, আমি সেখানে ওয়েটার, আমি সেখানে বিশাল বড় লোক এক অতিথি। ছোট্ট টেবিল ছিল আমাদের। ছিল ছোট্ট চেয়ার। তা দিয়েই লাল কার্পেটের ওপর আমার এই পাঁচ তারা হোটেলের রেস্তোরাঁ।
প্রথমে ওয়েটার সেজে এসে ফাঁকা চেয়ারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার জন্য কী আনব?’
চেয়ারে বসে উত্তর দিলাম, ‘সকালে ভারি কিছু খাব না। ডিম হবে?’
দাঁড়িয়ে উঠে ওয়েটার জবাব দিল, ‘নিশ্চয়ই হবে। আপনি কি বয়েলড এগ উইথ পট্যাটো খাবেন?’
বসে, গম্ভীরমুখে বললাম, ‘হতে পারে।’ তারপর বললাম, ‘সঙ্গে অরেঞ্জ জ্যুস হবে?’
ওয়েটার এদিক–ওদিক মাথা নাড়ল। বলল, ‘না স্যার, ওনলি ওয়াটার।’
বাড়িতে অরেঞ্জ জ্যুস আসবে কোথা থেকে? ওয়েটার ব্যাটা দিব্যি তার খবর রাখে। সুতরাং সাদা পানির কথাই সে বলে। সঙ্গে এক কাপ গরম চা দেবে কিনা জানতে চায়। একটু আগে আম্মা আমাদের সবার জন্য চা বানিয়েছেন দেখেছি, তাই ওয়েটারকে বলি, পানির পর চা দিতে।
এরপরের ঘটনা রান্নাঘরে। মানে পাঁচতারা হোটেলের রান্নাঘরে। ইতিমধ্যে ডিম আর আলু সিদ্ধ হয়ে গেছে। ধোঁয়া ওঠা আলু আর ডিম থেকে খোসা ছাড়াই। ছুরি দিয়ে ছোট ছোট করে কাটি। লবণ আর গোলমরিচ ছিটিয়ে দিই। এবার একটি কাচের হাফ প্লেট বের করি। সে প্লেটে ডিম আর আলু রেখে সুন্দর দুটি কাঁটা চামচ বসিয়ে দিই। শেফের কাজ শেষ।
এবার ওয়েটার সে খাবার বয়ে নিয়ে আসে রেস্তোরাঁয়। আকাশী রঙের তেপায়া টেবিলটার মনেও যেন আনন্দ ভর করে। একটু পর ওয়েটার এক গ্লাস পানি আর এক কাপ দুধের চা দিয়ে যায়। আমি এক এক টুকরো আলু বা ডিম মুখে পুরি আর যেন স্বর্গসুখ লাভ করতে থাকি।
আমার তখন দশ বছর বয়স।

লেখক : সাংবাদিক। (লেখাটি ফেসবুক থেকে নেয়া)।