July 1, 2022

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

স্বাধীনতা ছড়িয়ে পড়ুক হৃদয়ে

santunu শান্তনু চৌধুরী:  স্বাধীনতা—হৃদয়ের গভীর বোধ থেকে উৎসারিত হলে শিহরণ জাগে। শামসুর রাহমানের ভাষায় ‘যেমন ইচ্ছে লেখা আমার কবিতার খাতা’র মতো। কিন্তু সেই কবিতার খাতা কি এখন আর খোলা হয়? তরুণ প্রাণ কি উপলব্ধি করতে পারে সেদিনের সেই ভয়ংকর, বীভৎসতা। নাকি বিষয়টি এমন, ‘যার যায় সেই জানে, হারানোর কী বেদনা।’ সেদিনের সেই সময়ের রণাঙ্গনের যাঁরা প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন, অনেকে এখন বয়সী বটের ঝিলমিল পাতা। কিন্তু তাঁদের ছায়ায় যখন বসে বর্ণনাগুলো শুনি, পাশে প্রিয়জন হারানোর বর্ণনা অবলীলায় দিতে দিতে বা সম্মুখযুদ্ধে কিছুক্ষণ আগেও যে বন্ধুটির সঙ্গে কথা হচ্ছিল, শত্রুর বুলেটের আঘাতে সে যখন লুটিয়ে পড়ে, তাঁর বর্ণনা শুনতে শুনতে মুক্তিযোদ্ধা বা স্বজনদের মতো ভিজে ওঠে দুই চোখ। ভাবি, এই মানুষগুলোর জীবন কত না বৈচিত্র্যপূর্ণ।

আমাদের জীবন কত না সাদামাটা। আর অতিরিক্ত সাদামাটা বলেই কি আমাদের তরুণ প্রজন্ম ঠিক উপলব্ধি করতে পারে না স্বাধীনতার মূল্য? নাকি সেটা পারিবারিক দায়বদ্ধতা থেকে উৎসারিত বা উচ্চারিত হয়নি বলেই মননে গেঁথে যায়নি, ‘শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক এলো, দানবের মতো চিৎকার করতে করতে, ছাত্রাবাস বস্তি উজাড় হলো। বিকয়েললেস রাইফেল আর মেশিনগান খই ফোটাল যত্রতত্র, ছাই হলো গ্রামের পর গ্রাম।’ উত্তর প্রজন্মের কাছে এসব বীরত্বগাথা তুলে দেওয়ার দায়ও কিন্তু পূর্ব প্রজন্মের। আর সেটা হয়তো অনেক ক্ষেত্রে হয়ে ওঠেনি বলেই এখন প্রতিটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস বা বিজয় দিবসের পর ইউটিউবে এসব দিবস নিয়ে তরুণ বা কিশোরদের না জানা বা ভুল জানা নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক ক্লিপ বের হয়। অনেক টেলিভিশনও সেটা প্রচার করে। এই যে শেষ হলো গ্রন্থমেলা।

সেখানে শুক্র, শনিবার শিশুপ্রহরে কয়েকজন শিশুকে বলতে শোনা গেল, ‘আজ তো হলিডে, তাই বাবাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি বুকফেয়ারে।’ না! সাদা চোখে তারা তো ভুল কিছু বলেনি। ‘বন্ধের দিন’ আর ‘বইমেলার’ ইংরেজি তো ‘হলিডে’ ও ‘বুকফেয়ার’ই। এ প্রসঙ্গে ভবানী প্রসাদ মজুমদারের একটি কবিতার কথা মনে পড়ল, “বাংলা যেন কেমন-কেমন, খুউব দুর্বল প্যানপ্যানে। শুনলে বেশি গা জ্বলে যায়, একঘেয়ে আর ঘ্যানঘ্যানে। কীসের গরব? কীসের আশা? আর চলে না বাংলা ভাষা। কবে যেন হয় ‘বেঙ্গলি ডে’, ফেব্রুয়ারি মাসে না? জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।”

হয়তো আমাদের চিন্তার মগজে-মননে ঘুণ ধরেছে, আর সেই নিঃশব্দ ঘুণপোকা খুঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে তরুণ প্রজন্মের অনেককে। তাই হয়তো জাতীয় স্বাধীনতা ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে। হচ্ছে স্খলন? এর পরও আশার কথা, জিন্স, টি-শার্ট, ব্যান্ডেনা, বেসলেট আর টয়লেট টিস্যু ব্যবহার করা তরুণ সমাজ পোশাকে ফুটিয়ে তুলছে লাল-সবুজে মিশ্রণে বৃত্ত, মানচিত্র বা বিজয় ’৭১। যে কিশোর বা তরুণটি ফুল নিয়ে শহীদ মিনার বা স্মৃতিসৌধে যাচ্ছে, সে কিছু জানুক বা না জানুক আগ্রহটা তো বাড়ছে আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি পোস্ট করেই বা ছড়াচ্ছে তো এই ‘লাল-সবুজের ক্ষমতা’। গুগল সম্মান জানিয়ে ডুডল বদলে দিচ্ছে বাংলাদেশের বিশেষ দিনগুলোতে। কিন্তু এরপরও বলব—ঘুরে দাঁড়াতে হবে, জানতে হবে, আজকের তরুণরা জাগলেই ভোর হবে।

শান্তনু চৌধুরী : সাংবাদিক ও লেখক