July 1, 2022

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

বীরাঙ্গনাদের আপনজন সুরমা জাহিদ

সুমন বর্মণ:  বীরাঙ্গনা শব্দের সঙ্গে তাঁর পরিচয় অল্প বয়সেই। কিন্তু অন্য আট-দশটি শিশুর মতোই বীরাঙ্গনা কী তা বুঝতে পারেননি তিনি। কৌতূহলী সুরমা জাহিদকে বীরাঙ্গনা শব্দটি আলোড়িত করত। পরে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র থেকে তিনি প্রথম বীরাঙ্গনা সম্পর্কে জানতে পারেন।

স্বামী জাহিদ হোসেন সরকারি চাকরিজীবী হওয়ার সুবাদে মফস্বলে থাকতে হতো সুরমাকে। ১৯৯৭ সালে জাহিদ হোসেন লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা। সেখানে একজন বীরাঙ্গনা আছেন এমন খবর পেয়ে সুরমা দেখা করেন তাঁর সঙ্গে। সেই বীরাঙ্গনার মুখে তাঁর জীবনের করুণ কাহিনী শুনে সুরমা জাহিদের হৃদয়ে এমন তোলপাড় হয় যে তিনি সেদিনই সিদ্ধান্ত নেন এই দুর্ভাগাদের নিয়ে কাজ করবেন।

২০০১ সালে ময়মনসিংহের ভালুকায় বিমলা নামে এক বীরাঙ্গনাকে দিয়ে তিনি কাজ শুরু করেন। তিনি দেশের যে প্রান্তেই বীরাঙ্গনাদের খোঁজ পেয়েছেন, সেখানেই ছুটে গেছেন। এরই মধ্যে ধারাবাহিকতায় তিনি প্রায় ৩০০ বীরাঙ্গনার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন। দীর্ঘ এই পথচলায় সুখকর স্মৃতির সঙ্গী হয়েছে দুঃস্মৃতি। অনেক ক্ষেত্রেই লোকজন বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কাজ করার বিষয়টি ভালো চোখে দেখত না। আর স্বাধীনতাবিরোধী পক্ষ তো সহ্যই করতে পারে না। একবার জামালপুরে বীরাঙ্গনাদের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে চারজনের সঙ্গে কথা বলার পর পঞ্চম জনের ক্ষেত্রে ঘটে বিপত্তি। কারণ এরই মধ্যে গ্রামের প্রচুর লোকজন তাঁদের পিছু নিয়েছে। পরিবেশ প্রতিকূল দেখে ওই নারী সুরমাকে গ্রামের একটি চায়ের দোকানে সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হন। কিন্তু চায়ের দোকানে বীরাঙ্গনার সাক্ষাৎকার শুরু করার আগেই গ্রামের লোকজন ভিড় জমায়। তাদের কোনোভাবেই সরানো সম্ভব হচ্ছিল না। উল্টো গ্রামের লোকজন জানতে চাচ্ছে, কী এমন কথা যে আমাদের সামনে বলতে পারবে না। তখন ওই নারী সুরমাকে রাতে গ্রামের একটি নির্জন স্থানে আসতে বলেন, ওই স্থানে তিনি সাক্ষাৎকার দেবেন। কথামতো, সুরমা রাতে নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হন। কিন্তু বিষয়টি টের পেয়ে যায় স্থানীয় লোকজন। তারা ওই স্থানেও সাক্ষাৎকার গ্রহণে বাধা দেয়। এমন পরিস্থিতিতে ওই নারী সবার সামনে স্বীকার করেন, একাত্তরের যুদ্ধের একজন বীরাঙ্গনা তিনি। কিন্তু গ্রামের লোকজন তা মিথ্যা দাবি করে। ওই মহিলার স্বামীও বীরাঙ্গনা স্বীকার করলে গ্রামের লোকজন উত্তেজিত হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তিনি কোনোমতে প্রাণ নিয়ে শহরে আসতে সক্ষম হন।

এমনই আরেকটি ঘটনা ঘটে কক্সবাজারের টেকনাফে। সখিনা নামের এক বীরাঙ্গনার সাক্ষাৎকার শেষে বেরিয়ে পড়ার সময় বাধা দেয় তাঁর মেয়ে। মায়ের সাক্ষাৎকার নেওয়ায় সে উত্তেজিত হয়ে সুরমাকে ছবি ও রেকর্ড মুছে ফেলতে নির্দেশ দেয়। তার দাবি অনুযায়ী ছবি মুছে ফেললেও রেকর্ড নষ্ট না করায় চিৎকার শুরু করে। এতে আশপাশের লোকজন জড়ো হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরে বীরাঙ্গনার ছেলে এসে সুরমাকে নিরাপদে স্থান ত্যাগ করার ব্যবস্থা করে দেন।

আবার কখনো বা ভুল বুঝেছেন বীরাঙ্গনাদের কেউ কেউ। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে এক হিন্দু বীরাঙ্গনার সন্ধান পেয়ে ছুটে যান সুরমা। তাঁকে বুঝিয়ে বলার পর কথা বলতে রাজি হন। কিন্তু পরিবারের লোকজনের সামনে নয়, হাওরে গিয়ে কথা বলবেন তিনি। কথামতো চৈত্রের তপ্ত দুপুরে বীরাঙ্গনাকে নিয়ে জনশূন্য হাওরে যান তিনি। সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে হঠাৎ করেই প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ওই নারী। তিনি চিৎকার শুরু করলেন, ‘আরেকবার যুদ্ধ হচ্ছে, আমাকে রক্ষা করো।’ এ কথা শুনে কৃষকরা গ্রামের লোকজনকে খবর দেয়। লোকজন জড়ো হয়ে সুরমাকে ঘিরে ফেলে। পরে তাদের বুঝিয়ে কোনো রকমে ফিরে আসেন তিনি। সুরমা পরে ব্যাপারটার একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন নিজের কাছে। ওই বীরাঙ্গনা হয়তো ভেবেছেন, একাত্তরে যারা তাঁকে নির্যাতন করেছে, সুরমা তাঁদেরই লোক। তা না হলে তিনি কেমন করে তাঁর নির্যাতনের কথা জানলেন?

বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি মিশেছেন তাঁদের সঙ্গে। একাত্তরের নৃশংসতার শিকার সেই মানুষগুলো এখন জীবনযুদ্ধে লড়ছেন। ইতিমধ্যে জীবনযুদ্ধে পরাজিত হয়ে অনেকেই আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন। এ বিষয়টি ব্যথিত করে সুরমাকে। তাই তিনি নিজের অবস্থান থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁদের পাশে দাঁড় করিয়েছেন বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে।

সুরমা জাহিদের উদ্যোগ ও আমেরিকা প্রবাসী জালাল উদ্দিনের সহযোগিতায় কুমিল্লার বীরাঙ্গনা ফুলবানুকে এক লাখ টাকার ব্যাংক তহবিল করা হয়েছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও ফুলবানুর যৌথ অ্যাকাউন্টে ওই টাকা রাখা হয়েছে। প্রতি তিন মাস পর পর মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্চিত টাকার লভ্যাংশ ফুলবানুকে দিয়ে আসেন। এই টাকা দুস্থ ও অসহায় ফুলবানুকে কিছুটা হলেও উপকৃত করছে। তা ছাড়া তিনি যখনই বীরাঙ্গনাদের দুর্দশার কথা শোনেন তাঁদের কাছে ছুটে যান। এই যে এই নিরন্তর চেষ্টা, বীরাঙ্গনাদের জন্য এই ভালোবাসা- এর পেছনের প্রেরণাটা কী? সুরমা জাহিদের উত্তর, ‘আমি চেষ্টা করেছি কিভাবে তাঁরা সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং কিভাবে সমাজে টিকে আছেন, জনসমক্ষে তা উপস্থাপন করতে। ইতিহাসের সেই অনাবিষ্কৃত, অকথিত, অনিবন্ধিত কাহিনী আমি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায়। পুরনো সহিংসতা, নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা নতুন করে বর্ণনা করা খুব বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ এ ধরনের স্মৃতিচারণা সামাজিক কলঙ্কের। নতুন করে পুরনো যন্ত্রণা প্রকাশের শঙ্কা তো থেকেই যায়। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে চরম প্রতিকূল অবস্থায় পড়ে। বহু সংগ্রামের পর ঘাত-প্রতিঘাত বুকে চেপে ধরে নীরবে-নিভৃতে বেঁচে আছেন তাঁরা। এক জীবনে ঘৃণা, দুঃখ-কষ্ট, বেদনা নিয়েই বীরাঙ্গনাদের পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেক বীরাঙ্গনা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তাই যেখানেই বীরাঙ্গনার খোঁজ পাই সেখানেই ছুটে যাই।’ আর এভাবে তাঁদের গল্প শুনে, তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন তাঁর আপন একজন। যে দায়িত্ব পালনে সমাজ লজ্জা পায়, সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে ছুটতে ছুটতে যে অভিজ্ঞতা জমা হয়েছে তাঁদের নিয়ে লিখেছেন তিনটি বই। প্রকাশের অপেক্ষায় আরো কয়েকটি। আর এখন যুদ্ধশিশুদের নিয়েও।

সুরমা জাহিদের জন্ম নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার রাজাবাড়ী গ্রামে। শিক্ষাজীবন শুরু করেন লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী উচ্চবিদ্যালয় থেকে। আর শেষ করেন কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে।

মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের কীর্তির, ত্যাগের তবুও কিছুটা মূল্য পেয়েছেন। কিন্তু এসব হারানোরা পাননি কিছুই। উল্টা সঙ্গী হয়েছে অবহেলা-তিক্ততা। সমাজের-দেশের এই দায়টা দূর করতেই একজন সুরমা জাহিদের এমন সদর্প ছুটে চলা।

সুত্র : সুমন জাহিদ