October 7, 2022

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

চারুকলার লিচুতলায় চলছে মঙ্গল শোভাযাত্রার কর্মযজ্ঞ

ডেস্ক প্রতিবেদন : ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’-রবীন্দ্রনাথের চিরায়ত বাঙালি চেতনার এই গানের সাথে চির নতুনের ডাকে পয়লা বৈশাখের ভোরে জেগে উঠবে নগর-বন্দর-গ্রাম-গঞ্জের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। সব ধর্মের সব শ্রেণি-পেশার বাঙালি বাংলা নববর্ষ বরণে জেগে উঠবে প্রাণের আনন্দে আর আবেগের উচ্ছলতায়।

baishak2

রমনার বটমূলে ‘ছায়ানট’-এর বর্ষবরণ আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের মঙ্গল শোভাযাত্রার পাশাপাশি রাজপথে থাকবে মানুষের ঢল। আনন্দের ঢেউ আছড়ে পড়বে গ্রাম থেকে নগরে, শহর থেকে বন্দরে। এদিন বৈশাখ ও বাঙালিয়ানার উন্মাদনায় মেতে উঠবে সমগ্র বাঙালি।

সারাদেশের সাথে জাতিসত্তা প্রকাশের সবচেয়ে বড় এই উৎসবের রং ছড়িয়েছে রাজধানী শহর ঢাকাতেও। তাই বাঙালির এ মহা উৎসবকে ঘিরে প্রতিবারের মতো এবারও সেই রঙের বর্ণিল আভায় এখন স্নিগ্ধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট।

প্রতি বছরের মতো এবারও তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশের নববর্ষ উদযাপনের অন্যতম জাতীয় অনুষঙ্গে পরিণত হওয়া ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র। এ নিয়েই এখন সেখানে চলছে বর্ষবরণের কর্মযজ্ঞ। চারুকলার আঙিনাজুড়ে শিল্পকর্ম নির্মাণে ব্যস্ত চারুকলার বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।দিন যতই এগিয়ে আসছে ততই বাড়ছে তৎপরতা। বৈশাখের দুই-চার দিন আগে তারা নির্ঘুম রাত কাটাবেন প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ বরণকে সফল করতে।

baishak1

চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেনের সঙ্গে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা নির্দেশনা দিচ্ছেন চারুকলার বর্ষবরণ আবাহনের শিল্পকর্ম গড়ার। বর্তমান চারুশিক্ষার্থীদের সঙ্গে মনের টানে যোগ দিচ্ছেন সাবেক শিক্ষার্থীরাও। সরাচিত্র সৃজন, কাগজ কেটে নানা প্রক্রিয়ায় নির্মিত মুখোশ, কাগজের ম্যাশের মুখোশ, জলরঙের চিত্রকর্ম সৃজন ও শোভাযাত্রার মূল অনুষঙ্গ কাঠামো নির্মাণ; এ পাঁচটি ভাগে প্রায় ৫ শতাধিক শিক্ষার্থী সম্পৃক্ত রয়েছে এই কর্মযজ্ঞে।

ঐতিহ্য ও শেকড়ের বার্তাবহ নিজস্বতা ও স্বকীয়তাকে বজায় রেখে বাংলা সংস্কৃতির শৈল্পিক উপস্থাপনায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নিজেদের তৈরি শিল্পকর্ম বিক্রি করেই প্রতিবারের মতো এবারও এই আয়োজনের তহবিল গঠন করছে। চারুশিক্ষার্থীদের নিরলস শ্রম ও মেধার সংমিশ্রণে তৈরি হচ্ছে নানা শিল্পকর্ম। এসব শিল্পকর্ম বিক্রি করে মঙ্গল শোভাযাত্রার তহবিল গড়া হচ্ছে।

১৬ মার্চ বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাবি চারুকলা অনুষদের এবারের এই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র প্রস্তুতি পর্বের উদ্বোধন করেন প্রখ্যাত দুই শিল্পী রফিকুন নবী ও মনিরুল ইসলাম। এরপর থেকে সমগ্র শোভাযাত্রার মূল কাজ শুরু হয়।

এ বছরের মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য কাজ করছে চারুকলা অনুষদের মাস্টার্স দ্বিতীয়বর্ষের ১৭তম ব্যাচ। এই ব্যাচের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন খালিদ হাসান রবিন। তার নেতৃত্বে অনুষদের সাবেক ও বর্তমান প্রায় পাঁচশত শিক্ষার্থী বিশাল এ কর্মযজ্ঞে কাজ করছে।

এবারের বৈশাখ উদযাপন কমিটির অন্যতম কর্মী জিয়াউল হাসান জানান, প্রত্যেক বছরই একটি শুভ কামনা নিয়ে বের করা হয় এই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। এ বছরও তার ব্যত্যয় হচ্ছে না। প্রতিবছরের মতো এবারও চলমান সময়ের বিবেচনায় একটি বিশেষ বিষয় বা ভাবনা এই শোভাযাত্রার প্রধান অনুষঙ্গ। প্রাথমিকভাবে এ বছরের শোভাযাত্রার ভাবনায় উঠে এসেছে মূল্যবোধের অবক্ষয়, এসেছে মা ও শিশুর সম্পর্ক। সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে মায়ের হাতে সন্তানের মৃত্যু কিংবা সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের অযত্ন অবহেলার প্রেক্ষাপটে নির্ধারিত হয়েছে এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল বিষয়।

অপার মানবিক মূল্যবোধের সাথে শান্তি ও সুপথে চলার বিধানসম্বলিত মানুষের জন্য যে ধর্ম সেই অপব্যাখ্যা করে কিছু ধর্ম ব্যবসায়ী ধর্মের নামে দেশকে এখন এক অন্ধকারময়তায় নিমজ্জিত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। যা এখনো বিরাজমান আছে। দেশের মুক্তচিন্তার মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটছে। সাংস্কৃতিককর্মীরা খুন হচ্ছে। আমরা এ থেকে মুক্তি পেতে চাই। আলোর দিকে যেতে চাই।

তাই এবারের স্লোগানে রবীন্দ্রনাথের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। ‘অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে’। চারুকলা অনুষদে দেখা যায়, করিডোরের উন্মুক্ত জায়গায় অস্থায়ীভাবে স্থাপিত বিশাল টেবিলে উপর ছড়িয়ে আছে সারি সারি সরা। সেগুলোর ওপর রঙের প্রলেপ দিয়ে নানা অবয়ব ফুটিয়ে তুলছে চারুশিক্ষার্থীরা। আর সেসব সরাচিত্রে উদ্ভাসিত হচ্ছে পল্লীবধূর মুখচ্ছবি, সাপুড়ে, কাকতাড়ুয়া, হরেকরকম পাখি, হাতি, লক্ষ্মীপ্যাঁচা, বিড়াল, বাঘ, রাখালসহ বৈচিত্র্যময় লোকজ নানা বিষয়। সরাচিত্র সৃজনের পর সেগুলো ঠাঁই পাচ্ছে পাশের দুটি টেবিলে। বিভিন্ন আকৃতির এসব সরাচিত্র বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে হাজার টাকায়। সরাচিত্রের সঙ্গে রয়েছে তুহিন পাখি, কাগজের ফুল, বাঘের ছোট মুখোশ। পঞ্চ প্রদীপের সেটগুলো বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা থেকে হাজার টাকায়।

আরেক অংশে দেওয়ালজুড়ে সাজিয়ে রাখা চারুশিক্ষার্থীদের চিত্রিত জলরঙের নানা বিষয়ভিত্তিক চিত্রকর্ম। এই অংশের তত্ত্বাবধান করছে নাহিদা নিশা ও অমিত নন্দীসহ একঝাঁক শিক্ষার্থী। নিশা জানান, ৮০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি ছোট আকৃতির চিত্রকর্মগুলো। আর বড় আকৃতিরগুলো বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকায়।

আর চারুকলার লিচুতলায় চলছে মঙ্গল শোভাযাত্রার কর্মযজ্ঞ। সেখানে গেলে দেখা হয় চারুকলার শিক্ষার্থী ও এবারের বৈশাখ উদযাপন কমিটির ভাস্কর্য বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক মহিবুল ইসলাম আরিফের সাথে। তিনি জানান, আমাদের দেশে ‘মা ও শিশু’র সম্পর্কটি সব সময়ই মধুময়-অনেক আবেগ আর ভালোবাসার। এই সম্পর্কটা সবসময় আমাদের সমাজে ইতিবাচক বিষয় হিসেবে বিবেচিত ছিল, এখনো আছে। কিন্তু কেন যেন এখন মূল্যবোধের ক্ষয়িষ্ণুতার প্রভাবে এই সম্পর্কটি ঠিক আগের মতো অটুট নেই। বেশ কিছুদিন ধরেই দেখছি, মা ও সন্তানের সম্পর্কটা ফিকে হয়ে পড়ছে। বন্ধনটি কোথায় যেন আলগা হয়ে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি ক্রমাগত ঘটছে শিশু নির্যাতনের ঘটনা। পত্রিকার পাতায় এসব সংবাদ দেখে আঁতকে উঠি। এসব বিষয়কে সামনে রেখেই এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য তৈরি হচ্ছে নানারকম ভাস্কর্য।

পাশাপাশি আমাদের চিরায়ত সংস্কৃতির ঐতিহ্য অনুসারে বরাবরের মতো এবারও থাকছে হাতি, ঘোড়া, হরিণ, ময়ূর পাখির কাঠামো। এই সব ভাস্কর্যের কাঠামো তৈরি শেষ হলেই তাতে লাগানো হবে কাগজ। এ জন্য চারুকলার বিভিন্ন বিভাগের প্রায় ১০০ শিক্ষার্থী প্রতিদিন নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। কাঠামোগুলোর নির্মাণ শেষে রং-তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হবে পরিপূর্ণ অবয়ব।

অপরদিকে চারুকলার জয়নুল গ্যালারির একটি কক্ষের ভেতরে চলছে কাগজ কেটে অবয়ব তৈরি ও রঙের প্রলেপে তা ফুটিয়ে তোলার কাজ।

১৯৮৯ সালে চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো বের করা হয়েছিল মঙ্গল শোভাযাত্রা। সে বছরই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় এই আনন্দ শোভাযাত্রা। প্রথম শোভাযাত্রায় ছিল পাপেট, ঘোড়া ও হাতি। তারপরের বছরে চারুকলার সামনে থেকে আনন্দ শোভাযাত্রা বের হয়। এ শোভাযাত্রায়ও নানা ধরনের শিল্পকর্মের প্রতিকৃতি স্থান পায়। এরপর থেকে এটা বাংলা বর্ষবরণের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। ১৯৯৬ সাল থেকে চারুকলার এই আনন্দ শোভাযাত্রা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নাম লাভ করে।

পয়লা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) সকাল নয়টায় বেরুবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। উদ্বোধন করবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। বিভিন্ন লোকজ অনুষঙ্গ ও কাঠামোকে সঙ্গী করে শোভাযাত্রাটি চারুকলার সামনে থেকে বের হয়ে ইন্টারকন্টিন্টোল (সাবেক রূপসী বাংলা) সামনে ঘুরে চারুকলার সামনে এসে শেষ হবে।