October 7, 2022

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

নিষ্পত্তি না হলেও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ

ডেস্ক প্রতিবেদন : মহানগরীতে বসবাসরত নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে ডাটাবেইজ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে ‍ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।

তবে এ নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে কিছুটা সংশয় ও শঙ্কা বা ভীতিও রয়েছে। তাই দু-দু’বার উচ্চ আদালত পর্যন্ত বিষয়টি গড়িয়েছে। প্রথম দফায় হাইকোর্ট পুলিশের এই কার্যক্রমকে আইনসম্মত ঘোষণা করেন। দ্বিতীয়বার ডিএমপি বিধিমালা-২০০৬-এর যে ধারা অনুযায়ী পুলিশ তথ্য নিচ্ছে―সেই ধারাকে কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।

এই রুলের এখনো নিষ্পত্তি না হলেও নগরবাসীর কাছ থেকে পুলিশ তথ্য সংগ্রহ করছে বলে অভিযোগ করছেন আইনজীবীরা। ডিএমপির পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে যে, তারা তথ্য নেওয়ার কাজের প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছেন।

তবে আদালতে বিচারাধীন থাকা অবস্থায় তথ্য নেওয়াকে উচ্চ আদালতের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের শামিল বলে মনে করছেন আইনজীবীরা। অপরদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, তারা আদালতের নির্দেশনা মেনেই কাজ করছেন।

চলতি বছরের শুরুর দিকে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের এক পৃষ্ঠার ফরম ভাড়াটিয়াদের দেওয়া হয়। সেখানে ভাড়াটিয়ার ছবির পাশাপাশি তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, পাসপোর্ট নম্বর, ফোন নম্বর, জন্মতারিখসহ বাসার বাসিন্দা এবং গৃহকর্মী ও ড্রাইভারের তথ্য চাওয়া হয়েছে।

গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ১৫ মার্চের মধ্যে নগরবাসীকে ব্যক্তিগত তথ্য দিতে হবে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়ে গত ১ মার্চ আইন সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও ঢাকা মহানগর (ডিএমপি) কমিশনারকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। নোটিশের জবাব না পেয়ে পুলিশের এই উদ্যোগ স্থগিতের নির্দেশনা চেয়ে ৩ মার্চ হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন তিনি।

হাইকোর্টে ৭ ও ৮ মার্চ রিটের ওপর শুনানি শেষে ১৩ মার্চ ওই রিটটি খারিজ হয়ে যায়। রিট খারিজ করে আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, দেশে নাগরিকদের কাছ থেকে যে কোনো বিষয়ে পুলিশ পদক্ষেপ নিতে পারবে। ২০০৬ সালের বিধিমালায় এটি উল্লেখ আছে। তবে পুলিশ যদি এ তথ্যের অপব্যবহার করে, সে ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার ব্যক্তি আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবেন।

প্রথম দফায় আদালত ঢাকা মহানগর পুলিশ (নিয়ন্ত্রণ ও নির্দেশনা বিধিমালা ২০০৬)-এর বিধি ৩ এর উপবিধি ৪ (খ) অনুযায়ী এই উদ্যোগকে আইনসম্মত বলে উল্লেখ করেন। এ বিধি অনুযায়ী ঢাকা মহানগর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জরুরি ভিত্তিতে যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে।

পরে ডিএমপি বিধিমালার সেই অংশটিকে চ্যালেঞ্জ করে ২০ মার্চ হাইকোর্টে রিট আবেদন দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের তিন আইনজীবী আইনুন নাহার সিদ্দিকা, এস এম এনামুল হক ও অমিত দাস গুপ্ত।

আবেদনের বিষয়ে রিটের পক্ষের আইনজীবী অনিক আর হক বলেছিলেন, ডিএমপি বিধিমালার এ ধারা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জরুরি ভিত্তিতে যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে। সে হিসেবে পুলিশ রাজধানীর বাসার মালিক ও ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে তথ্য চেয়ে একটি ফরম বিতরণ করেছে। সেখানে পুলিশ অনেক ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য চেয়েছে। বিষয়টি সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই পুলিশকে এ বিধিমালা অনুযায়ী যে কোনো পদক্ষেপ নিতে সংবিধানের মৌলিক অধিকার-সংক্রান্ত বিষয়গুলো মানতে হবে। কিন্তু পুলিশ এ বিধিমালা প্রয়োগে অপব্যাখ্যা করছে। তাই এ ধারাটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ওই আবেদনের ভিত্তিতে ডিএমপি বিধিমালার সংশ্লিষ্ট ধারা ‘কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না’ -তা জানতে চেয়ে গত ২৭ মার্চ রুল জারি করেন হাইকোর্ট। সেই রুল স্থগিত চেয়ে চেম্বার আদালতে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। চেম্বার বিচারপতি বিষয়টি শুনানির জন্য আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন।

গত ৮ মার্চ প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন খারিজ করে আগামী ৩১ মের মধ্যে সেই রুল নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চকে এ রুল নিষ্পত্তি করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

রিটকারী তিন আইনজীবীর একজন আইনুন নাহার সিদ্দিকা অভিযোগ করেন যে, পুলিশ তথ্য নেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্নজনকে গ্রেপ্তারের ভয়ভীতি দেখায়। তবে নাগরিকরা স্বেচ্ছায় ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য না দিলে কোন আইন বলে গ্রেফতারের হুমকি দেখানো হচ্ছে―তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই আইনজীবী। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকার বাড়ির মালিকদের ভাড়াটিয়ার তথ্য দ্রুত প্রদানে চাপ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তথ্য সংগ্রহে শুধু চাপ দেওয়া হচ্ছে তা নয়, নগরবাসীকে নানাভাবে আশ্বস্ত করার চেষ্টাও করছে পুলিশ। তাই বিট পুলিশিং (অঞ্চলভিত্তিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কার্যক্রম) নিয়ে বিভিন্ন সভা সেমিনারেরও আয়োজন করা হচ্ছে ডিএমপির পক্ষ থেকে। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি জুমার নামাজের পর পুলিশের পক্ষ থেকে একটি লিফলেটও বিতরণ করা হয়। ডিএমপির পক্ষ থেকে বিতরণ করা সেই লিফলেটে উল্লেখ করা হয়, ‘নগরবাসীর সর্বাত্মক সহযোগিতা ছাড়া ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় পুলিশিং কাজে সফলতা লাভ করা সম্ভব নয়।’

নগরবাসীর কাছ থেকে তথ্য নেওয়ার কাজ কোন পর্যায়ে রয়েছে, জানতে চাইলে ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) মো. মারুফ হোসেন সরদার দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘এটা এখন শেষ পর্যায়ে, যেটুক বাকি আছে তা সম্পন্ন করা হচ্ছে।’

আদালতে বিষয়টি বিচারাধীন আছে উল্লেখ করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ হচ্ছে।’

তবে আদালতে একটি মামলা খারিজ হলেও, দ্বিতীয় মামলাটি চলমান রয়েছে। সেই মামলার বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা জানাতে পারেননি ডিএমপির এই কর্মকর্তা।

আদালতে বিষয়টি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকলেও নগরবাসীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম পরিচালনা করা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রথম রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া

তিনি বলেন, ‘আদালতের প্রতি এরা (পুলিশ) আসলে শ্রদ্ধা দেখায়নি। কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। সেটা বায়োমেট্রিকের ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো আদালতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রতি অবজ্ঞা করছে, এটা আমরা প্রতিনিয়তই দেখছি। আমরা বিষয়গুলো আদালতের নজরে আনারও চেষ্টা করছি। ওই মামলার আইনজীবীরাও পুলিশের বিরুদ্ধে কোন আদেশ চাইবেন এমনটা চিন্তা-ভাবনা করছেন।’

অনেকে বলছেন, ‘আদালত তো পুলিশের তথ্য সংগ্রহের কাজে স্থগিতাদেশ দেয়নি। তাহলে কীভাবে আদালতের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন হলো’―এমন প্রশ্নের জবাবে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘এগুলো অশিক্ষিত ও মূর্খের কথাবার্তা। কারণ, যে আইন অনুযায়ী কাজ করছেন, সেই আইনটাই যদি চ্যালেঞ্জ হয়, তবে কার্যক্রম স্থগিত চাইতে হয় না। যাদের কোর্ট-কাচারি সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা আছে, তারা জানেন, আইন চ্যালেঞ্জ করলে কোনো অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের প্রয়োজন পড়ে না। উভয়পক্ষের শুনানিতে নিষ্পত্তি করতে হয়। মাঝখানে কোনো অন্তর্বর্তী আদেশের প্রয়োজন হয় না।’

একদিকে ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য প্রদান নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে রয়েছে শঙ্কা। তার ওপর আইনজীবী ও পুলিশ ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন। এ অবস্থায় তথ্য সংগ্রহের কাজও প্রায় শেষ হয়ে গেছে। তবে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি। সেই সিদ্ধান্ত যদি ডিএমপির বিপক্ষে যায়, তখন তথ্য দেওয়া নাগরিকরা কীভাবে এর প্রতিকার পাবেন, সেই প্রশ্নই এখন থেকে যাচ্ছে।