September 30, 2022

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

‘জগন্নাথ হলের ঘাসে আমাদের রক্তমাখা , অথচ এখন ফল ভোগ করে অন্যরা’

ডেস্ক প্রতিবেদন :  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) জগন্নাথ হলের মাঠের ঘাস আমাদের রক্তেভেজা অথচ এখন ফল ভোগ করে অন্যরা।আমরা প্রাপ্য সম্মানটুকুও পাচ্ছি না। স্বাধীনতার পর অর্ধাহারে অনাহারের কাটিয়েছি। সন্তানদের মানুষ করেছি, কিন্তু কেউ আমাদের সহায়তা করেনি। এমন আক্ষেপ জগন্নাথ হলের অফিস সহকারী শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মনভরণ রায়ের স্ত্রী রাজকুমারী রায়ের।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের অন্যতম লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো।হানাদাররা টার্গেট করেছিল দেশের মেধাবী সন্তানদের।ওই রাতে জগন্নাথ হলে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল পাক বাহিনী।শিক্ষক, ছাত্র ও কর্মচারীসহ হত্যা করা হয়েছিল কয়েকশ’ মানুষকে। জগন্নাথ হলের তৎকালীন অফিস সহকারী মনভরণ রায়ও শহীদ হয়েছিলেন সেই রাতে। পাক সেনাদের ব্রাশ ফায়ারে ক্ষতবিক্ষত স্বামীর বুক থেকে বের হওয়া রক্তের স্রোতে সেদিন জগন্নাথ হলের মাঠের ঘাস চুইয়ে পড়তে দেখেছিলেন রাজকুমারী। ছোটছোট তিনসন্তান নিয়ে জীবনের সঙ্গে সংগ্রাম চালিয়েছেন এই নারী। জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময় প্রাপ্যসম্মানটুকু না পাওয়ার আক্ষেপ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মনভরণের স্ত্রীর মুখে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেদিনের সেই রক্তেমাখা ঘাসের কথা আজও ভুলেনি। অথচ তাদের সেই ত্যাগের কথা আমরা কি ঠিকভাবে মনে রেখেছি?  সেই প্রশ্নিই তিনি করেছেন। উত্তরও দিয়েছেন অনেক প্রশ্নের।

তিনি বলেন, ২৫ মার্চ রাতের ওই দিন সারাদিন ডিউটিতে ছিলেন। দেশে গন্ডগলের কারণে অফিসে ওইদিন কাজ কমছিল। তাই একটু আগেই তিনি বাসায় চলে আসেন। বাসার সামনে বসে রামায়ন শুনতেছিলেন। আমি তাকে বাজারে যেতে বলি। কিন্তু বাজারে যাওয়ার আর সময় হলো না। রাত সাড়ে ৯ টার দিকে আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। এরপর রাত ১২ টার দিকে হঠাৎ একটানা গুলি। ‍গুলির শব্দে ঘুম ভাঙ্গে। হলের চারদিকে আগুন দিয়ে দেয় পাকসেনারা। এরপর প্রাণের ভয়ে সবাই বাসা থেকে বের হই।

তিনি বলেন, সারা রাত হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় কলোনিতে। বেঁচে থাকা পুরুষদের ধরে ওরা। সব জায়গা থেকে লাশ বহন করে মাঠের মাঝখানে স্তূপ করতে বাধ্য করে তাকে দিয়ে। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিল। এরপর তাদেরও ভোরে লাইনে দাঁড় করানো হয়। তারপর ব্রাশফায়ার করে। এরপর পাকসেনারা চলে যায়। তখন লাশগুলোর মধ্য থেকে ‘জল জল’ বলে গোঙানির শব্দ কানে আসে। সামনে গিয়ে দেখি, ওদের বাবা তখনো বেঁচে আছেন। অনেক কষ্ট করে কলোনির দিকে মানুষটাকে নিয়ে এলাম। পানি খাওয়ালাম। এর একটু পর তিনি মারা যান। কিন্তু আশেপাশের মানুষগুলো ভয় পাচ্ছিল। তাকে সেখানে রেখে আসার জন্য তারা আমাকে চাপ দিচ্ছিল। কারণ লাশ বাসায় নিয়ে এসেছি এই কথা পাকসেনারা জানলে জীবীতদেরও মেরে ফেলতে পারে বলে একটা ধারণা ছিল। তাই তার লাশ আবার মাঠে রেখে আসি। তিনি ২০ মিনিট বেঁচেছিলেন তিনি। ছোট মেয়েটা তখন কাঁদছিল। ভয়, কখন মিলিটারিরা আসে। ওকে দূরে রেখে এসে দেখি সব শেষ।

তিনি আরো বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে জীবন যুদ্ধ শুরু হলো। জীবনে যে কষ্ট করেছি তা বলে বুঝাতে পারবো না। এসব বলতেও আর ভালো লাগে না। এক মূহুর্তের জন্যেও কোনও শান্তি পেলাম না। 

স্বাধীনতার পর আমরা কিছুই পাইনি। জগন্নাথ হলের এই জায়গাটুকু না পেলে আমাদের থাকারও জায়গা থাকত না। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দুই হাজার টাকা দিয়েছিল। আর কিছুই পাইনি। আমাদের রক্তেমাখা এই জগন্নাথ হলের ঘাস, অথচ আমাদের কেউ জিজ্ঞাস করেনি। কেউ বলতে পারবে না কেউ চারআনা পয়সা দিয়েছে। যে ক্ষমতায় আসে সে নিজেই ঘাট্টিবেধে দৌড়ায়। 

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ চলছে। আরও চলবে। এসব কথা আমাদের বলে কোনও লাভ নেই। কেউ কারো জন্য কিছু করবে না। নিজের বলই বড় বল।