September 19, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

সব আনন্দ ম্লান করে দিলো ট্রাফিক পুলিশের বাড়াবাড়ি!

আতাউর রহমান কাবুল : সিজারিয়ান সেকশন অপারেশনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে গত সোমবার ভুমিষ্ট হলো আমার প্রথম কন্যা সন্তান। সদ্যজাত কন্যা ও স্ত্রী আজ হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাচ্ছে। এজন্য গতরাত থেকেই একটা আলাদা আনন্দ বয়ে যাচ্ছিল মনে। তাদেরকে বাসায় আনতে এক বন্ধুর প্রাইভেট কারে সকালেই রওনা দিলাম বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের উদ্দেশ্যে। বাসা থেকে বেড় হয়ে হাতিরঝিল-এফডিসি মোড়ের ট্রাফিক পয়েন্টে গিয়ে যানজটে আটকে গেলাম।
দেখলাম, দুইজন ট্র্যাফিক পুলিশের সঙ্গে বাক-বিতন্ডায় জড়িয়ে পরেছে কেউ একজন। যেহেতু সিগনালে আটকে আছি তাই কি মনে করে পকেটে থাকা ক্যামেরা (নবজাতকের ছবি তুলবো বলে সঙ্গে নিয়েছিলাম) বের করে গাড়ি থেকেই ঘটনার দিকে একটা স্নাপ নেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু চালকের মাথা, গাড়ির স্টিয়ারিং ও বডির কারনে দৃশ্যটি ভালোভাবে আসছিলো না। কিন্তু আমার হাতে ক্যামেরা দেখেই আমাদের দিকে তেড়ে এলো বচসায় থাকা ওই দুই ট্রাফিক পুলিশ।
পাশে থাকা একজন নারী ট্রাফিক সার্জেন্ট আমাকে বললো, ‘এই আপনি ভিডিও করছেন কেন? চালককে গাড়ির কাগজপত্র বের করতে বললেন। আমিতো অবাক! এরপর দেখলাম তারা নাছোড় বান্দা। একপর্যায়ে আমার পরিচয় দিয়ে বিনয়ের সঙ্গে বললাম, ‘আপা আমি সাংবাদিক, আসলে কোন ভিডিও করিনি। বিতন্ডার ঘটনা দেখে ছবি তুলতে চাইছিলাম জাস্ট এই। ইচ্ছে হলে ক্যামেরাটা দেখতে পারেন-বলে ক্যামেরাটাও তার দিকে এগিয়ে দিলাম।
ওই নারী রেগে গিয়ে বললেন, সাংবাদিক হইছেন তে কী হইছে। ভিডিও করতে অনুমতি নিয়েছেন? এরপর তাদেরই একজনকে বললেন, ‘এই বাবুলকে আসতে বলো। উনি ক্যামেরা ট্যামেরা বোঝে। আমাদের গাড়িটি সাইড করতে বললেন।
আমার অবস্থা এই ভেবে খারাপ হলো যে, কালের কন্ঠ’র ডেপুটি এডিটর মুনির রানা ভাই বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন সেই ঘন্টাখানেক ধরে। আমি ওখানে পৌঁছলেই আমার স্ত্রী আর সদ্যজাত সন্তানকে নিয়ে দুটো গাড়িতে করে আমরা একযোগে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেব। অথচ এখানে আমাদের অযথাই আটকে দেয়া হলো।
গাড়ির চালক এক পর্যায়ে নেমে গেলেন। উনাদের রিকুয়েস্ট করলেন। কিন্তু না, কোন কাজ হচ্ছে না। অগত্যা আমি গাড়ি থেকে নামলাম। তাদেরকে বোঝানো চেষ্টা করলাম, আমাদের হাসপাতালে যাওয়াটা আসলে খুব জরুরী। কিন্তু তারা আমাদের কোন কথাই শুনল না।
ইতিমধ্যে বাবুল নামের পুলিশ এসে গেছে। বললো, আমাদের স্যারের রুমে চলেন। আমি গাড়ি থেকে নেমে সোজা তাদের স্যারের রুমে গেলাম। পাশেই পুলিশ বক্সে বসা এক ভদ্রলোক। নেমপ্লেটে লেখা ইউসুফ (পরে জানলাম তিনি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল ট্রাফিক জোনের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. আবু ইউসুফ)।
তাকে কালের কন্ঠ’র আমার একটা ভিজিটিং কার্ড দিয়ে বললাম, একটা ভুল বোঝাবোঝি হয়ে গেছে। আসলে আমি কোন ভিডিও করিনি, ক্যামেরাটা জাস্ট বের করে গাড়ির ভেতরেই ছিলাম। আমরা আসলে হাসপাতালে যাচ্ছি। ওখানে আমার স্ত্রী আর সন্তান ভর্তি।
উনি আমার সঙ্গে একটি কথাও বললেন না এমনকি সামনে খালি পরে থাকা ৪/৫টি চেয়ারে বসতে বলার সৌজন্যবোধটুকুও দেখালেন না। কাকে যেন ফোন করে আমার নাম ধরে জিজ্ঞেস করে বললেন, এই নামে কি আপনাদের ওখানে কোন সাংবাদিক আছে?
ওপাশের ভদ্রলোক সম্ভবত আমাকে চিনছিলেন না। এক পর্যায়ে আমি কথা বলে জানলাম, উনি আমাদের ক্রাইম রিপাের্টার ওমর ফারুক। আমি দাড়িয়েই আছি।
এরপর ফোন রেখে আমাকে মি. আবু ইউসুফ সাহেব আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কত বছর ধরে সাংবাদিকতা করেন? আমি বললাম, সব মিলিয়ে ১৫/২০ বছর তো হবেই। তিনি রেগে মেগে বললেন, আপনি জানেন না-অনুমতি ছাড়া পুলিশের ছবি তোলা যায় না। আমি তাকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম, ভাই এখন ফেসবুকের জমানা। আমরা অনেক কিছুই ফেসবুকে শেয়ার করি। আর আমিতো কোন ভিডিও-ই করিনি।
তাছাড়া প্রাইভেট কারের ভেতর থেকে কেউ বাইরের কোন ছবি তুলতে পারবে না এটা আমার জানা নেই।
উনি বললেন, আপনি জানেন আমি ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে কাজ করেছি। কালের কন্ঠ’র সম্পাদক থেকে শুরু করে ওখানকার সবাই আমাকে চেনেন। দেশের সব ক্রাইম রিপোর্টার আমাকে চেনে। আপনি ক্রাইম রিপোর্টার এসোসিয়েশনের সভাপতিকে ফোন দিয়ে বলেন আমার কথা।
আমি তাকে বোঝালাম, এসবতো আমার দরকার নেই। আমার হসপিটালে যাওয়াটা এখন খুব জরুরী। আপনি বরং একদিন আসেন আমাদের অফিসে। ক্যান্টিনে আপনাকে নিয়ে চা খেতে খেতে গল্প করবো। কিন্তু আমার এখন হসপিটাল যেতে হবে।
উনি বললেন, আপনি সিএনজি নিয়ে যান। ড্রাইভার ও গাড়ি এখানে থাকবে।
আমি বললাম, ক্যামেরাতো ছিল আমার হাতে। অপরাধ করলে আমি করেছি। ড্রাইভারের কী দোষ? সে তো কোন রং সাইডে গাড়ি চালানো বা পার্কিংয়ের মতো কোন ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করেননি। তাহলে তাকে আটকে দিচ্ছেন কেন?
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল ট্রাফিক জোনের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. আবু ইউসুফ সাহেব আমার কোন কথাই শুনলেন না। একজনকে নির্দেশ দিলেন, চালক অন্যায় করেছে এটার একটা লিখিত বা মুচলেকা নিয়ে রাখো।
এরপর আমার সামনেই ড্রাইভার সাহেবকে ইচ্ছে মতো গালিগালাজ শুরু করলেন। তার কাগজ পত্র আইডি কার্ডের ছবি তুলে রাখলেন মি: ইউসুফের সেলফোনে। সব মিলিয়ে আমাদের আরো কেটে গেল ঘন্টা খানেক।
নবজাতক সন্তানকে বাড়ীতে নিয়ে ফেরার যে আনন্দ তার বদলে বিষন্নতায় ভরে গেল মন। আমার জন্য বেচারি ড্রাইভার আজ হয়রানি ও অপমানিত হলো। অবশেষে প্রিয় সদ্যজাত সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে বিষন্ন মনে বাসায় এলাম দুপুরের দিকে।
আমি এখনো বুঝতে পারছি না আমি আসলে কি অপরাধ করলাম। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে আমরা কোথায় বসবাস করছি!!!
লেখক : সাংবাদিক, (লেখাটি লেখকের ফেসবুক পাতা থেকে নেয়া।)