September 17, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

কবির কাছে যেতে হবে

জাহিদ রেজা নূর : কবির কাছে যেতে হবে। যেতে হবে সেই বাড়িতে, যেখানে গত বছর ২৫ ডিসেম্বর গিয়েছিলাম। বসেছিলাম পাশে। বলেছিলাম কথা। অন্যরকম প্রশ্ন করে তাঁকে ভাসিয়েছিলাম স্মৃতির সাগরে।
যদিও সেই সাক্ষাৎকারের কিয়দাংশ ছাপা হয়েছিল প্রথম আলোয়, কিন্তু তাতেও তিনি খুশি হয়েছিলেন। বেঙ্গল গ্যালারিতে আনিসুজ্জামানকে নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্র দেখতে গিয়ে তাঁকে দেখলাম। কাছে ডাকলেন। বললেন, ‘ভালো লিখেছ।;
আমি বললাম, ‘পুরোটা কোনো একদিন বই–এ ছাপব।’
হাসলেন। কাঁধে হাত রেখে বললেন,‘আমার মৃত্যুর পর?’
আমিও বোকার মতো হাসলাম।
আমি জানতাম না, তাঁর কথা সত্য হবে। জানতাম না, তাঁর মৃত্যুর আগে ওই পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকারটি আর ছাপা হবে না। আমার ল্যাপটপে সেটা এখনও রয়ে গেছে।
পাঁচটা ছাব্বিশ মিনিটে কবি চলে গেছেন। ইউনাইটেড হাসপাতালে ছিল পিয়াস মজিদ। ওকে ফোন করার পর আমাদের মঞ্জু বাড়িতে যেতে বলল ও। একটু পরই লাশ নিয়ে সবাই চলে আসবে এখানে। সৈয়দ হকের বাড়িতে।
মনজুর কাদের জিয়ার বাইক সম্বল করে আমরা গুলশানে কবির বাড়ির দিকে রওনা হলাম।
পথে ছিল জ্যাম। প্রচণ্ড জ্যাম। ভাগ্যিস, গাড়ি নিয়ে বের হইনি। মনজুর কাদের তার অসাধারণ নৈপুণ্যে অতি অল্প সময়ে আমাকে নিয়ে এল মঞ্জুবাড়িতে।
বাড়ির কর্মীরা ছাড়া কেউ ছিল না সেখানে। ওরা লাশের অপেক্ষায়। উঠোনে গোল করে চেয়ার পাতা। যারা এই বাড়িতে কবিকে শেষ বিদায় জানাবেন, তাদের জন্য।
আমি মোবাইল ফোনে ভিডিও করলাম। সেই ঘরটির ছবি তুললাম, যেখানে থরে থরে তাঁর বই সাজানো। বঙ্গবন্ধুর একটি বড় ছবি সেখানে। সৈয়দ হকেরও অনেকগুলো পারিবারিক ছবি। একজন গৃহকর্মী সবগুলো ছবি নামিয়ে ফেলতে লাগলেন। মৃতকে বিদায় জানানোর সময় ছবি থাকতে হয় না।
চ্যানেল আইয়ের আমীরুল ভা্কেই ফোন করা হলো। তিনি বললেন, লাশ আরো কিছুটা সময় থাকবে হাসপাতালে। আমরা দ্রুত চলে গেলাম হাসপাতালে। আমার মনে তখন সৈয়দ হকের একটি পংক্তিই বাজছিল, ‘ইয়াজদানি মারা গেছে বিমান পতনে।’ শহীদ কাদরীর একটি সাক্ষাৎকারে সৈয়দ হকের এই পংক্তিটির দেখা পেয়েছিলাম। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন সুমনা শারমীন। শহীদ কাদরী সে কবিতা পড়ে চমকে উঠেছিলেন। এ ধরনের আধুনিক কবিতা নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলেন তিনি।
আমি ভাবছিলাম, আমি যখন লিখব, তখন এই বিষয়টিকে লেখার মধ্যে রাখার চেষ্টা করব।
জিয়ার মোটর সাইকেল চলেছে। আমি ভেসে চলেছি স্মৃতির ভেলায়। তাঁর একটি মঞ্চনাটক নিয়ে একবার একটি সাক্ষাৎকার নিতে চেয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, গুলশানের পর্যটনের হোটেলে আসতে। ঠিক সময়েই হাজির ছিলেন তিনি। অনেক কথা বললেন। তাঁর নাট্যভাবনা মেলে ধরলেন। ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’ নাটকটি নিয়ে কথা বললেন। কফি খাওয়ালেন আমাকে। নিউ ইয়র্কে আমার বড় ভাই ফাহীমের আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন, সে কথাও জানালেন।
সে সময় কিছু ছবি তুলেছিলাম, কিছু ভিডিও করেছিলাম। খুঁজলে পাব। বহু জায়গায় বহু সাক্ষাৎকার তিনি দিয়েছেন, সে দিক থেকে বিচার করলে হয়ত আমার এই ছোট্ট সাক্ষাৎকারের সে রকম কোনো মূল্য নেই। কিন্তু এটা তো আমার নেওয়া! এটার মূল্য আমার কাছে অন্যরকম।
এখন দেখছি, তাঁর আরো কিছু ছবি তুলেছিলাম শিল্পকলা একাডেমীতে। বেঙ্গলেও আনিসুজ্জামানের সঙ্গে তুলেছি। তাহলে তো আমার কাছে তাঁর বেশ কিছু স্মৃতি আছে।
ইউনাইটেড হাসপাতালে পৌঁছে দেখি, সেখানে কেউ কেউ আছেন। লাশ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। একজন সুহৃদ কানে কানে বললেন, অন্য পথ দিয়ে অ্যামবুলেন্স রওনা হয়ে গেছে।
আমরা দেরি না করে আবার রওনা হলাম তাঁর বাড়ির দিকে। এর মধ্যে হাসপাতালের কিছু ঘটনা ভিডিও করে নিয়েছি মোবাইলে।
পথে গুলশান এক নম্বরের কাছে এসে একটা লাশবাহী অ্যামবুলেন্স দেখলাম।
জিয়াকে বললাম, ‘এটাই হক ভাইকে নিয়ে যাচ্ছে না তো?’
তারপর মনে হলো, তা হবে না। এটা হক ভাইয়ের অ্যামবুলেন্স হলে আগে পিছে আরো কিছু গাড়ি থাকত।’
পাশাপাশি চলল দুই যান।
কিছুক্ষণ পর ভিড় ঠেলে আমরা এগিয়ে যাই। পৌঁছে যাই মঞ্জুবাড়িতে। তার ৩০ মিনিট পর অ্যামবুলেন্সটি আসে।
হ্যাঁ, এটা সেই অ্যামবুলেন্স, যেটাকে আমরা দেখে এসেছিলাম গুলশান এক–এর কাছাকাছি।
হ্যাঁ, ওই সময়টিতে আমরা হক ভাইয়ের খুব কাছাকাছি ছিলাম।
লেখক : সাংবাদিক, সদস্য প্রজন্ম ‘৭১।