September 17, 2021

দৈনিক প্রথম কথা

বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক

অপূর্বার সংগে।

অনল রায়হান: ‘এখানে নরবলি হতো…ওই যে, ওই বেদিটার ওপর…বুঝলি?’ বুঝলাম। আসলে শুনলাম। বোঝার তো বয়সই হয়নি। বারো চোদ্দ বছর বয়স তখন। কালী মন্দিরটা আমাদের পাড়ার সাথেই টালিগন্জ মেইন রাস্তার ওপর। পাড়ার নামটা সুন্দর, ইন্দ্রানী পার্ক। দেখতেও সুন্দর। একটা বড়সরো পুকুর। তার পাশ দিয়ে পাড়ার একমাত্র রাস্তা। রাস্তার একধার ধরে একের পর এক বাড়ি। নো ফ্ল্যাটস। দোতালা-চারতলা-একতলা বাড়ি। রাস্তাটা যেখানে গিয়ে বাঁ দিকে বেঁকে গেছে, তার উলটো দিকে ছোট একটা মাঠের মত। এক পাশে পুকুরপাড়। সেই একটা লং টেনিস কোর্টের সমান মাঠটায় প্রতি বছর পড়তো পূজার প্যান্ডেল। দূর্গা-স্বরসতী-লক্ষী। কিন্তু কালী পূজা হতো মেইন রাস্তার কালী মন্দিরটায়। আমার কাছে কালী পূজার আলাদা অ্যাটরাকশন ছিল। বোধহয় ছোটদের সবার কাছেই তাই। কারন কালী পূজায় পটকা ফাটানো হতো। অনেকটা আমাদের সবেবরাতের মত। তার ওপর ছিল নরবলীর ইতিহাস! তারও ওপর কালী ঠাকুরের ভয়ংকর মূর্তি। মন্দিরটায় আমার আর ঢোকাই হয়নি। কিন্তু দূর্গা পূজার প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরেছি কতবার। সেই কিশোর বয়সটায় মহা উত্তেজনায় চাঁদ রাত আসতো। তারপর রোযার ইদের ভোরসকালের গোসল। তারপর নামায। আর তারপরই শুরু হয়ে গেল ভোঁ ভাঁ…বন্ধু বন্ধু আবার বন্ধুর বাড়ি। আবারও বন্ধুর বাড়ি। তারপর রাত। আনন্দমেলায় ম্যাজিসিয়ান। ব্যাস। ইদ শেষ। এরপর দূর্গা পূজার দিন গোনো। যাওয়া হবে কলকাতা। কলকাতার আর্কষণ ছিল বিশাল। তার সাথে দূর্গা পূজা। পাড়ায় পাড়ায় প্যান্ডেল। ঢোল-কর্তালের বোল। সংগে বাহারি লাইটের কারুকাজ করা প্যান্ডেল আর রাস্তার সাজ। ছেলেমেয়ে মাঝবয়সি সবার গায়ে নতুন নতুন জামা। প্রতিদিন নিত্যনতুন খাবার। সেই খাবার খাও আর মাইকে জোরে জোরে বাজতে থাকা বাংলা হিন্দি ছবির গান শোনো। তবে সবচেয়ে কৌতূহলের ব্যাপার ছিল মা দূর্গা স্বয়ং। শয়ে শয়ে প্যান্ডেলের শয়ে শয়ে দূর্গা মূর্তি এক হয়েও যেন এক নয়। এই ব্যাপারটা খেয়াল করে দেখতে খুব আনন্দ হতো। আরেকটা রহস্যময় আনন্দ হতো। বয়স বাড়ার পরেও এটা ছিল। আমার মনে হতো একেকটা পূজার প্যান্ডেল একেকটা আলাদা জগৎ। প্যান্ডেলের সামনের যায়গাটায় যে ছেলেমেয়েরা বসে আছে, নাচছে তারাও অন্য প্যান্ডেল থেকে ভিন্ন। পাশাপাশি দুই রাস্তায় দুই পূজার প্যান্ডেল। কিন্তু আমার কাছে ছিল ভিন্ন দুই গ্রহের মত। মনে হতো দেশ ভ্রমণ করে বেড়াচ্ছি। অনেকবার নিজের মনে মনে পয়েন্ট দিয়েছি, ‘টালীগন্জের প্যান্ডেলের ছেলেমেয়েগুলি সুন্দর। ভবানীপুরেরগুলো পঁচা।’ কিন্তু দূর্গার প্রতিমা সবই প্রায় ভালো লাগতো। কৈশোরের রোমান্টিসিজম নিয়ে ভ্যা ভ্যা করে তাকিয়ে থাকতাম ওর চোখে। এর আরেকটা কারনও ছিল। থেকে থেকেই শোনা যেত, অমুক এলাকার দূর্গা নাকি প্রকাশ্যে কাঁদছে। চোখ দিয়ে স্পষ্ট জল গড়িয়ে পড়ছে। আমার অবশ্য তেমন কিছু দেখা হয়নি। তবু দূর্গার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে ভাবতাম, কদিন পরেই উনি চলে যাবেন? কোথায় যাবেন? যেখানে যাবেন সেখানে লুকিয়ে লুকিয়ে যাওয়া যায় না? এই ভাবঘোর নিয়ে বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়তাম। নিশ্চয়ই স্বপ্নে তাঁকে দেখতামও। আর ভাবতাম, ‘তাহলে কি হলো? কাল সপ্তমী না অষ্টমী?’ এই একটা মধুর গোলমাল সব বছরের পূজাতেই হতো। এখন বুঝি, আমি আসলে ওই শব্দগুলিকে প্রবল ভাবে ভালোবাসতাম। ষষ্ঠি-সপ্তমী-অষ্টমী-নবমী-দশমী। এ যেন রহস্যময় পাঁচ রাজকুমারী। অষ্টমীর দিন বসে ভেবেছি, ইস আজ যদি ষষ্টি হতো! তাহলে আবার সপ্তমীর দেখা পাওয়া যেত। তারপর আবার আসতো অষ্টমী।

durgapujaনাহ্। বহুদিন হয়েছে কলকাতায় দূর্গা পূজায় যাওয়া হয় না। আমি কবে বড় হয়ে ব্যাটা ছেলে হয়ে গেছি। দূর্গা তো দূর্গাই থেকে গেছে! নিশ্চয়ই নতুন নতুন কিশোরের চোখে তিনি এঁকে দিচ্ছেন ছেলেবেলার মায়াবী রূপকথা। একদিন এই ছেলেমেয়েগুলিও ব্যাটা ছেলে হবে। তারপর ভুলে যাবে টানা টানা চোখের সেই অপূর্বাকে? হয়ত অ্যান্জেলিনা জোলির চোখের সংগে মিশে যাবে সেই চোখ। যেতেই পারে। এ সময়ের রস। আমার বাবার কিশোর চোখ দিয়ে তো আর আমি কৈশোর দেখিনি। ওটা একান্ত আমার কিশোর চোখ। আমার সময়। আমার দূর্গা। এখনকার কিশোর তার চোখে দেখবে এই দেবীকে। ওই চোখে আমার মাথা ঘামানোর ইচ্ছে নেই। তবে, দুটো ব্যাপার বোধহয় কিশোরটির বেড়ে উঠতে থাকা কানে কানে বলে যেতে চাই। দূর্গা, তিনি দূর্গতিনাশিনী। অত্যাচারী-উপনিবেশবাদী বৃটিশদের বিরুদ্ধে বিশেষ করে বাঙালি হিন্দুদের প্রতিবাদী মানসিকতার অভিব্যক্তি নির্মাণে এই অপূর্বার অবদান আছে। দূর্গার অন্যায় দমনের ইতিহাসের সংগে মাতৃত্বভাবের যোগ এই এলাকার বহু মানুষের ভরসাস্থল হয়ে উঠেছিল সেই সময়। আর এই ভরসার যায়গা থেকে উথলে উঠেছিল বিদ্রোহ করার মানস। সেই দূর্গার চোখ কিন্তু কোনোভাবেই অ্যান্জেলিনার জোলির চোখ হতে পারবে না! সেই চোখ একান্তই আমার ইতিহাসের অংশ। আর আগামীর বিশ্বমানব সভ্যতার সম্পদ। সতরাং জোলিরও সম্পদ।
তোমার কানে আমার আর যেটা বলার ছিল…পূজোর সময় প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখার পাশাপাশি একটু লক্ষ্য করে দেখো তো, দূর্গার মত অমন মুখের কোনো কিশোরি কি তোমার চোখে পড়ছে?…আমার ফাটা কপাল…আমি পাইনি।
লেখক : সদস্য প্রজন্ম ’৭১।